মসজিদে জামাআতের সহিত সালাত আদায় করার হিকমত

আল-আল্লামাহ, শাইখ মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উসাইমীন (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন যে, মসজিদে জামাআতের সহিত সালাত পড়ার বিধানের মধ্যে যেসব হিকমত নিহিত আছে তা হলো:

১. মানুষের মাঝে মেলবন্ধন এবং ভালোবাসার বৃদ্ধি

কেননা লোকেরা যখন একে অপরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে এবং ইবাদাত সম্পন্ন করার জন্য এক ইমামের পিছনে একটি নির্দিষ্ট স্থানে মিলিত হয়, তখন এটি ঘনিষ্ঠতা, স্নেহ এবং ভালোবাসা বৃদ্ধি করে।

 

২. পরিচিতি 

এই কারণে আমরা দেখতে পাই যে যখন কোনো ব্যক্তি মসজিদে জামাআতের সহিত সালাত পড়ে আর সে যদি অপরিচিত হয়, তখন লোকেরা (স্বাভাবিকভাবেই) জিজ্ঞেস করে, “লোকটি কে? আমাদের সঙ্গে কে সালাত পড়েছে?”

এর মাধ্যমে পরিচিতি ঘটে এবং এতে যে ফায়দা রয়েছে তা হলো: সে যদি আপনার আত্মীয় হয় তাহলে আপনাদের আত্মীয়তার ভিত্তিতে আপনি তার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে পারেন, অথবা যদি সে অন্য শহর থেকে আগত কোনো আগন্তুক হয় তাহলে আপনি তার অধিকার আদায় করতে পারেন।

৩. ইসলামের নিদর্শনসমূহের বহিঃপ্রকাশ ঘটানো

এর মাধ্যমে ইসলামের নিদর্শনসমূহের অন্যতম একটি নিদর্শনের বহিঃপ্রকাশ ঘটে এবং সত্যিকার অর্থে, এটি ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন, আর তা হলো সালাত। যদি লোকেরা তাদের ঘরে সালাত আদায় করত, তাহলে কেউ জানত না যে এখানে (মসজিদে) সালাত (প্রতিষ্ঠিত) হচ্ছে।

৪. শক্তি ও সম্মানের বহিঃপ্রকাশ করা

যখন তারা একসঙ্গে মসজিদে প্রবেশ করে এবং জামাআতের পরে একসঙ্গে বের হয় (যা তাদের শক্তি, ঐক্য ও সম্মানের প্রতীক হিসেবে কাজ করে) তখন মুসলিমদের শক্তি ও সম্মানের বহিঃপ্রকাশ ঘটে।

৫. অজ্ঞদের শিক্ষা দেওয়া

জামাআতে সালাত পড়ার সময় বহু মানুষ তাদের পার্শবর্তী ব্যক্তি অথবা ইমামের অনুসরণ করে এবং এর মাধ্যমে তারা সালাতের নির্ধারিত বিধিনিষেধ শিখতে পারে এবং ফায়দা নিতে পারে।

৬. ঐক্য বজায় রাখা ও বিচ্ছিন্নতা পরিহারের জন্য উম্মতকে প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং এতে অভ্যস্ত করা

কেননা এই জামাআত হলো সমগ্র (মুসলিম) উম্মতের ঐক্যের প্রতীক । এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, এই উম্মত সাধারণত তাদের শাসক এবং তার সংশ্লিষ্ট আমীরের আনুগত্যের উপর ঐক্যবদ্ধ থাকে, যাতে মতবিরোধ এবং বিভক্তি পরিহার করা যায়। এই অর্থে জামাতের সালাত এই শাসনব্যবস্থার একটি ছোট প্রতীক হিসেবে কাজ করে: কারণ তারা একজন ইমামের পূর্ণ আনুগত্য করে, যা ইসলামের বৃহত্তর স্বার্থকে সমুন্নত করে।

৭. নফসকে শাসন করা

যখন কোনো ব্যক্তি ইমামের অনুসরণ করে এবং এতে অভ্যস্ত হয়, ইমাম যখন তাকবীর বলে তখন সেও তাকবীর (আল্লাহু আকবার) বলে, তার আগেপরে করে না, এবং সে ইমামের অনুকরণ করে না বরং তার অনুসরণ করে (অর্থাৎ ইমাম পরবর্তী অবস্থানে পৌঁছানোর পরপরই সে শুরু করে), তখন সে নিজেকে একটি নিয়মানুবর্তিতায় অভ্যস্ত করে তুলে।

৮. জিহাদের কাতারের কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া

[জামাআতের সালাতে কাতারবন্দি হয়ে] দাঁড়ানোর মাধ্যমে ইবাদতকারীরা জিহাদে কাতারবন্দি মুমিনদের অবস্থা সম্পর্কে ধারণা লাভ করে, আল্লাহ বলেছেন:

إِنَّ الله يُحِبُّ الَّذِينَ يُقَاتِلُونَ فِي سَبِيلِهِ صَفًّا كَأَنَّهُم بُنْيَانٌ مُرْصُوص

“নিশ্চয়ই, আল্লাহ তাদেরকে ভালোবাসেন যারা তাঁর পথে সারিবদ্ধভাবে লড়াই করে, যেন তারা একটি শক্তিশালী প্রাচীর।” [সূরা আস-সাফ, আয়াত নং ৪)

যারা এভাবে পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের  নিয়মানুবর্তিতায় অভ্যস্ত হয়, তারা জিহাদের সময় তাদের আমীরের অনুসরণ করার জন্য প্রস্তুত থাকে এবং তারা তার নির্দেশের আগেও করে না এবং বিলম্বও করে না।

৯. ফেরেশতাদের অনুকরণ করা

যারা (মসজিদে জামাতে) সালাত পড়ে তাদেরকে সেই ফেরেশতাদের ব্যাপারে স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয় যারা আল্লাহর সামনে সারিবদ্ধভাবে দণ্ডায়মান হন, এতে আল্লাহর প্রতি তাদের বিনয়ানুবতা ও শ্রদ্ধা বৃদ্ধি পায় এবং আল্লাহর ফেরেশতাদের প্রতি তাদের ভালোবাসা বৃদ্ধি পায়।

১০. ইবাদাতের ক্ষেত্রে সমতার বহিঃপ্রকাশ ঘটানো

আল্লাহর ইবাদাত করার ক্ষেত্রে সকল মুসলিম সমান, কারণ মসজিদে সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি সবচেয়ে দরিদ্র ব্যক্তির পাশে, নেতা নেতৃত্বাধীনের পাশে, শাসক শাসিতদের পাশে এবং যুবক বৃদ্ধের পাশে দাঁড়ায়। এইভাবে মানুষ বুঝতে পারে যে আল্লাহর ইবাদাতের ক্ষেত্রে সকলেই সমান। এই কারণে, তিনি কাতারগুলোকে সোজা এবং সারিবদ্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন, এমনকি তিনি বলেছেন: “(সোজা হয়ে দাঁড়াও), এবং বিচ্ছিন্ন হয়ে দাড়িও না, নয়তো তোমাদের অন্তরগুলোকে বিভক্ত করে দেওয়া হবে।” [সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৪৩২]

১১. মানুষের কল্যাণের প্রতি যত্নশীল হওয়া

মসজিদে জামাতে সালাত পড়ার ফলে  দরিদ্র, অসুস্থ এবং সালাতের প্রতি উদাসীন ব্যক্তিদের অবস্থা সম্পর্কে জানা যায়। কারণ যখন কোনো ব্যক্তিকে জীর্ণ পোশাক পরিহিত অবস্থায় দেখা যায়, অথবা তার মধ্যে ক্ষুধার চিহ্ন দেখা যায়, তখন অন্যরা দয়া, সহানুভূতি এবং দানশীলতার প্রতি অনুপ্রাণিত হয়।

একইভাবে, যদি কোনো ব্যক্তি জামাআতে অনুপস্থিত থাকে, তাহলে তারা জানতে পারে যে সেই ব্যক্তি অসুস্থ এবং তারা তার সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে। একইভাবে, যদি তারা জানতে পারে যে, সে কোনো বৈধ (শরঈ) অজুহাত ছাড়া সালাতের জন্য উপস্থিত হয়নি, তাহলে তারা তাকে ডেকে উপদেশ দিতে পারে।

১২. প্রধান কারণ

সেই প্রধান ভিত্তি, আর তা হলো এই জামাআতের মাধ্যমে আল্লাহ تبارك وتعالي -এর ইবাদাত এবং দাসত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।

১৩. শ্রেষ্ঠ প্রজন্মের কথা স্মরণ করা

এই উম্মতের পরবর্তী প্রজন্মগুলো তার প্রথম প্রজন্ম অর্থাৎ সাহাবীদের অবস্থা সম্পর্কে ধারণা লাভ করে। জামাআতে সালাত পড়ানোর সময় ইমাম মনে করেন তিনি ইমামতি করার ক্ষেত্রে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর অবস্থানে আছেন। অতএব তিনি তাঁর উদাহরণ অনুসরণ করেন এবং অনুরূপভাবে সালাতে ইমামতি করেন, এবং মুসল্লিগণ মনে করেন যে তারা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাহাবীদের স্থানে আছেন।

তাই কোনো বৈধ ওজর ব্যতীত জামাআতের সালাত ত্যাগ করা উচিত নয়, এবং ইমামের অনুসরণ করার ক্ষেত্রেও কমতি করা উচিত নয়।

এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, এই উম্মতের পরবর্তী প্রজন্ম এবং এর প্রথম প্রজন্মের মাঝে সংযোগ স্থাপন করা হলে তা মুসলিম উম্মতকে সালাফদের মানহাজ অনুসরণ ও তাদের নির্দেশনা মেনে চলার প্রতি পুনরায় শক্তি প্রদান করবে। আর কতই না উত্তম হবে, যদি আমরা ইবাদত করার সময় রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর অনুসরণ এবং তার ইত্তিবা করার বিষয়টি স্মরণ রাখতে পারি।

কারণ এতে কোনো সন্দেহ নেই যে এই (সজাগ) ব্যক্তি তার অন্তরে একটি শক্তিশালী অনুপ্রেরণা পাবে যা তাকে সালাফে সালেহীনের পথ অনুসরণ করতে উদ্ভুদ্ধ করবে, যতক্ষণ না সে তার আক্বীদাহ, আমল, আখলাক্ব এবং মানহাজের দিক দিয়ে সালাফী হয়ে যাবে।

উৎস: [আশ-শারহ আল-মুমতী আলা যাদ আল-মুসতাক্বনী, (খণ্ড.৪), (পৃ.১৩৪-১৩৫), মুদ্রণ: দার ইবন আল-জাওযী, ৮ম সংষ্করণ।]

Support The Da'wah In Bangladesh

The Messenger (ﷺ) said: “And save yourselves from the hell fire even if it be with the piece of a date.”

Recent Posts

Recommended Readings

ইসলাম

ইসলাম হলো আদম (‘আলাইহিস সালাম) থেকে মুহাম্মাদ (ﷺ) পর্যন্ত সকল নবীর দীন। একজন মুসলিম হলেন সেই ব্যক্তি যিনি এই দীনকে কবুল করেন এবং এর উপর আমল করেন। মুসলিমরা একমাত্র সত্য মা'বূদ (আরবিতে আল-ইলাহ) আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য কারো ইবাদত করেন না। মুসলিমরা সকল প্রকার শিরক পরিত্যাগ করেন এবং তারা মানবজাতির প্রতি প্রেরিত সর্বশেষ রাসূল মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর প্রদর্শিত শিক্ষার অনুসরণ করেন। এটিই হলো সালাফিয়্যাহর ভিত্তি।

আমাদের দাওয়াহ
সুন্নাহ

সুন্নাহ হলো নবী (ﷺ) ও তাঁর সাহাবাদের পথ। যিনি এই পথের অনুসরণ করেন তাকে সুন্নী বলা হয় এবং তিনি আহলুস-সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ’র অন্তর্ভুক্ত। মাঝেমধ্যে, শিয়া সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত নয় এমন কাউকে বুঝানোর জন্যও সুন্নী শব্দটি সাধারণভাবে ব্যবহৃত হয়। তবে, শুধু শিয়া না হওয়াটা কোনো ব্যক্তিকে পথভ্রষ্টতায় নিপতিত হওয়া থেকে বাঁচানোর জন্য যথেষ্ট নয়।

আমাদের দাওয়াহ
আস-সালাফ আস-সালেহ

আস-সালাফ আস-সালেহ হলেন মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর সাহাবা ও তাঁদের পরবর্তী তিন প্রজন্ম। তাদেরকে আহলুস-সুন্নাহ ওয়াল-জামা’আহ, আস-সালাফ,আছহাবুল-হাদীস এবং আহলুল-হাদীসও বলা হয়। যে ব্যক্তি তাঁদের পথকে কবুল করেন এবং তাঁদের আক্বীদাহ, মানহাজ ও দীনকে অবিকল অনুসরণ করেন, তিনি প্রকৃত হিদায়াতের উপর প্রতিষ্ঠিত।

আমাদের দাওয়াহ
সালাফিয়্যাহ

সালাফিয়্যাহ হলো ইসলাম ও সুন্নাহ অনুসরণের প্রকৃত পথ। একজন সালাফী হচ্ছেন সেই ব্যক্তি, যিনি অবিকল কোনো পরিবর্তন ছাড়াই সালাফে-সালেহীনের পথকে অনুসরণ করেন।

আমাদের দাওয়াহ
সুন্নী

সুন্নী, আহলুস-সুন্নাহ ওয়াল-জামাআহ, আছহাবুল-হাদীস এবং আহলুল-হাদীস এই সবই সমার্থক উপাধি । এই উপাধিগুলো একই পথের অনুসারী একটি দলকে বুঝায়। যাইহোক, যারা এই উপাধিগুলোকে ব্যবহার করে, তাদের প্রত্যেকেই প্রকৃত অর্থে নিজ দাবির অনুগামী নন। প্রকৃত অর্থে, বেশিরভাগ মানুষ, যারা এই উপাধিগুলোর সাথে নিজেকে যুক্ত করে তারা সালাফে-সালেহীনের আক্বীদাহ ও মানহাজের বিরোধিতা করে। একজন নিছক দাবিদার ও একজন প্রকৃত অনুসারীর মাঝে পার্থক্য স্থাপন করাই এই অনুচ্ছেদের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।

আমাদের দাওয়াহ

Discover more from Markaz Al-Imam At-Tahawee Foundation

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading

দাওয়াহর কাজে সহযোগিতা করুন (Support The Dawah)

জীবনী এবং ইতিহাস প্রবন্ধ (Articles) কার্ড (Cards) অডিও (Audios)
আমাদের ভিজিট করুন (Visit Us) মারকাযের ঠিকানা (Markaz Location) আমাদের সম্পর্কে (About Us) আমাদের দাওয়াহ (Our Dawah) যোগাযোগ করুন (Contact Us)