কুফার শিয়ারা নবী মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পৌত্র আল-হুসাইনের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল, তাঁকে পরিত্যাগ করেছিল, তাঁর উপর অতর্কিত হামলা চালিয়ছিল এবং তাঁকে, তাঁর ভাইদেরকে এবং তাঁর সন্তানদেরকে হত্যা করেছিল; এবং তাঁদের নারীদেরকে বন্দি করেছিল।
এই প্রবন্ধে আমরা কিছু ঐতিহাসিক ঘটনা উপস্থাপন করব, যার অধিকাংশই শিয়া উৎস থেকে উদ্ধৃত করা হয়েছে। এখানে আল-হুসাইনের উপর সংঘটিত নির্মম ও অন্যায়সূচক হত্যাকাণ্ডের পূর্বাপর ঘটনাবলি তুলে ধরা হবে। তারপর আমরা এই শিয়া উৎসগুলো পর্যালোচনা করে দেখব যে, আল-হুসাইনকে সত্যিকার অর্থে কারা হত্যা করেছিল বলে সেখানে উল্লেখ রয়েছে। বইগুলোর তালিকা নিম্নে প্রদান করা হলো: আল-শিয়া ওয়াল-আশুরা, রিদা হুসাইন সুবহ আল-হুসনি; সীরাতুল আইম্মাহ আল-ইসনা আশার, হাশিম মারুফ আল-হুসনি; আল-মাজালিস আল-ফাখিরাহ, আব্দুল হুসাইন শারাফুদ্দীন আল-মাওসাওয়ী; মাকতাল হুসাইন, আব্দুর রাজ্জাক আল-মাওসাওয়ী আল-মুকরিম; মুনতাহাল আমাল, আব্বাস আল-কুম্মী; আলা খাত্তাই আল-হুসাইন, আহমাদ রাসিম আন-নাফীস; আল-ইহতিজাজ, আত-তাবারসি; এবং আরো অনেক বই এর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
পটভূমি
মুআবিয়া বিন আবী সুফিয়ান (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)-এর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র ইয়াযীদ বিন মুয়াবিয়া ক্ষমতা গ্রহণ করেছিল। সে রাজধানী শাম থেকে বিভিন্ন অঞ্চলে দূত পাঠিয়ে সেখানকার প্রভাবশালী ব্যক্তিদেরকে তার আনুগত্য স্বীকার এবং বায়আত গ্রহণ করার প্রতি আহ্বান জানিয়েছিল। প্রবীণ সাহাবীদের অনেকেই তাঁর আনুগত্য স্বীকার করলেও আল-হুসাইন বিন আলী (এবং আব্দুল্লাহ বিন আয-যুবাইরের মতো অন্যান্যরা) তাদের ব্যক্তিগত কারণে তা স্বীকার করেনি। কুফার শিয়াদের প্রতিশ্রুতি । কুফার শিয়ারা মক্কায় অবস্থানরত আল-হুসাইনকে চিঠি লিখে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল এবং তাঁর আনুগত্য করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কুফায় যাওয়ার পূর্বে বিষয়টি যাচাই করার জন্য আল-হুসাইন সেখানে মুসলিম বিন আকীলকে পাঠিয়েছিলেন। বায়াত গ্রহণ । কোনো কোনো বর্ণনা অনুযায়ী যখন মুসলিম বিন আকীল কুফায় পৌঁছালেন তখন ১৮,০০০ লোক এবং কোনো কোনো (শিয়া) সূত্র অনুযায়ী ৪০,০০০ লোক তার হাতে বায়াত গ্রহণ করেছিল। তিনি হানী বিন উরওয়ার আতিথ্য গ্রহণ করেছিলেন। মুসলিম বিন আকীল এই পুরো বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন, কারণ তিনি জানতেন যে এই সম্প্রদায়ের লোকেরা অতীতে আলী বিন আবী তালিব এবং আল-হাসান বিন আলীর সঙ্গেও বিশ্বাসঘাতকতা করেছে এবং তারা দ্রুত অবস্থান পরিবর্তন করতে অভ্যস্ত। সেই সময় আন-নু‘মান বিন বাশীর কুফার গভর্নর ছিলেন। তিনি মুআবিয়ার নিযুক্ত গভর্নর ছিলেন এবং ইয়াজিদও তাকে সেই পদে বহাল রেখেছিল। মুসলিমের উপস্থিতি সম্পর্কে জানার পরেও তিনি তাঁর কোনো ক্ষতি করেননি এবং বিভেদ সৃষ্টি করতে চাননি। আল-হুসাইনের কুফার উদ্দেশে যাত্রা । এ ঘটনাগুলো সংঘটিত হওয়ার পর মুসলিম বিন আকীল আল-হুসাইনকে চিঠির মাধ্যমে জানিয়েছিলেন যে কুফার লোকেরা তাঁর পক্ষে একত্রিত হয়েছে এবং তাঁর আগমনের অপেক্ষা করছে। চিঠিতে আরও উল্লেখ ছিল যে ৮০,০০০ লোক তাঁর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছে। এরপর আল-হুসাইন কুফার উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন। যদিও বহু প্রবীণ সাহাবী তাঁকে যেতে নিষেধ করেছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস, আব্দুল্লাহ বিন উমার, আব্দুল্লাহ বিন আয-যুবাইর, জাবির বিন আব্দিল্লাহ, আবূ সাঈদ আল-খুদরী, আব্দুল্লাহ বিন আল-আমর বিন আল-আস এমনকি তাঁর সৎভাই মুহাম্মাদ বিন আল-হানাফিয়্যাহ তাঁকে এবিষয়ে সতর্ক করেছিলেন যে কুফার শিয়ারা তাঁর পিতা ও ভাইয়ের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। যাত্রার ঠিক আগমুহূর্তেও বিন আব্বাস ও মুহাম্মাদ বিন আল-হানাফিয়্যাহ তাঁকে যেতে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু আল্লাহর ফয়সালা ছিল এবং তিনি নিজের সিদ্ধান্তের উপর অটল ছিলেন এবং কুফার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন। শিয়াদের ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাতকতা । অপরদিকে যখন উবাইদুল্লাহ বিন যিয়াদ কুফায় প্রবেশ করল তখন মুসলিম বিন আকীলের হাতে যারা বায়াত গ্রহণ করেছিল তারা একে একে তাকে পরিত্যাগ করতে লাগল। পরিশেষে মুসলিম প্রায় একাকী হয়ে পড়লেন। মুসলিম বিন আকীল আগে থেকেই এ আশঙ্কা করছিলেন, কারণ তিনি আহলুল বাইতের সঙ্গে এ জনগোষ্ঠীর অতীত আচরণ সম্পর্কে অবগত ছিলেন। মুসলিম বিন আকীল, হানী বিন উরওয়া এবং আব্দুল্লাহ বিন আল-ইয়াকতারকে পরিত্যাগ করা হয়েছিল এবং পরবর্তীতে তারা উবাইদুল্লাহ বিন যিয়াদের হাতে গ্রেপ্তার ও নিহত হয়েছিলেন। এই সংবাদ আল-হুসাইনের নিকট একটি চিঠির মাধ্যমে পৌঁছেছিল, যেখানে বলা হয়েছিল যে শিয়ারা তাঁদেরকে (মুসলিম ও হানী) পরিত্যাগ করেছে। ফলে আল-হুসাইনের সাথীরা তার থেকে পৃথক হতে লাগল এবং অবশেষে তাঁর নিকটতম সঙ্গী ও পরিবারের সদস্যরাই তাঁর নিকট অবশিষ্ট থাকল। কারবালায় আগমন । কুফার লোকদের এই ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাতকতার খবর শুনার পর আল-হুসাইন কুফার দিকে অগ্রসর না হয়ে শামের দিকে অগ্রসর হলেন। পরে তিনি কারবালায় পৌঁছালেন। মুহাররম মাসের শুরুতে (৬১ হিজরী) তিনি কারবালায় (ইরাক) পৌঁছালেন, আর তখনই কুফার শিয়ারা যারা ইতোমধ্যে তাকে পরিত্যাগ করেছিল, তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলো। আল-হুসাইন কারবালায় তাঁর সঙ্গী ও পরিবারবর্গকে একত্রিত করে একটি ভাষণ দিয়েছিলেন। সেই ভাষণে তিনি শিয়াদের ভর্ৎসনা করেছিলেন এবং তাদেরকে ‘তাগূত’, ‘আল্লাহর কিতাবকে পিছনে নিক্ষেপকারী’, ‘অপরাধী’, ‘সুন্নাহ ধ্বংসকারী’, ‘নবীদের বংশধরদের হত্যাকারী’, ‘যাদের উদর হারাম দিয়ে পূর্ণ’ ইত্যাদি বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। এ ভাষণটি শিয়া গ্রন্থসমূহে লিপিবদ্ধ রয়েছে এবং এর বর্ণনা ও শব্দচয়নের বিষয়ে ঐকমত্য রয়েছে। এটি আলী বিন মূসা বিন তাউস, আব্দুর রাজ্জাক আল-মুকরিম, ফাদিল আব্বাস আল-হায়াওয়ী, হাদী আন-নাজাফী, হাসান আস-সাফ্ফার, মুহসিন আল-আমীন, আব্বাস আল-কুম্মী সহ আরও বহু শিয়া লেখক উদ্ধৃত করেছেন। এখানেই আমরা অপরাধীদের হাতে আল-হুসাইন (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)-এর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এসে পৌঁছাই। অবরোধ ও হত্যা । কারবালায় অবস্থানকালে তাঁর এবং উমার বিন আস-সা‘দের (উবাইদুল্লাহ বিন যিয়াদের প্রতিনিধি) মাঝে আলোচনা হয়েছিল। আল-হুসাইন তার নিকট তিনটি প্রস্তাব দিয়েছিলেন এবং সেগুলোর মধ্য থেকে যে-কোনো একটি গ্রহণ করার অনুরোধ জানিয়েছিলেন, ক) তাঁকে ইয়াযীদের কাছে নিয়ে যাওয়া হোক (যার সম্পর্কে তিনি জানতেন যে সে তাঁকে হত্যা করবে না), অথবা খ) তাঁকে হিজাযে ফিরে যেতে দেওয়া হোক অথবা ৩) তাঁকে মুসলিমদের সীমান্তবর্তী কোনো অঞ্চলে পাঠিয়ে দেওয়া হোক, যেখানে তিনি অবস্থান করবেন। কিন্তু উবাইদুল্লাহ বিন যিয়াদ এই প্রস্তাবগুলো গ্রহণ করেনি এবং ফলস্বরূপ কারবালার যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। আমর বিন সা‘দ কুফা থেকে আগত বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছিল। তাঁর সঙ্গে ছিল শাম্মার বিন যিল-জাওশান এবং অন্যান্য ব্যক্তিরা (যারা সকলেই কুফার শিয়া ছিল)। তারা আল-হুসাইনকে ঘিরে ফেলেছিল। সংখ্যায় ও শক্তিতে বিপুলভাবে পিছিয়ে থাকার কারণে আল-হুসাইন এবং তাঁর সঙ্গীরা নিহত হয়েছিলেন। আল-হুসাইনের হত্যাকারী ছিল আলী (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)-এর শিয়া শাম্মার বিন যিল-জাওশান। হুসাইনের সঙ্গে আরও নিহত হয়েছিলেন আলী বিন আবী তালিবের অন্যান্য পুত্রগণ (যা বহু শিয়া আলেমের নিজেদের বর্ণনা অনুযায়ী প্রতিষ্ঠিত হয়েছে), যেমন আবূ বকর বিন আলী, উমার বিন আলী, উসমান বিন আলী এবং আল-হাসান থেকে আলী বিন আবী তালিবের পৌত্রদ্বয় আবূ বকর বিন আল-হাসান বিন আলী, উমার বিন আল-হাসান বিন আলী ।
নোট
আল-হুসাইনের সঙ্গে আহলুল বাইতের যে-সকল সদস্য নিহত হয়েছিলেন, আপনি কি তাদের নামগুলোর প্রতি লক্ষ্য করেছেন?! তাহলে আপনি বুঝতে পারবেন যে, কেন মিথ্যাবাদী শিয়ারা মিম্বারে দাঁড়িয়ে কারবালার ঘটনা বর্ণনা করার সময় অজ্ঞ শিয়া শ্রোতাদের সামনে এসব নাম উল্লেখ করে না! কারণ একজন সাধারণ শিয়া তখন বুঝতে পারবে যে আহলুল বাইত প্রথম তিন খলীফাকে এতটাই ভালোবাসতেন যে তারা তাঁদের নামে নিজেদের সন্তানদের নামকরণ করেছিলেন!
শিয়া আলেম ও ঐতিহাসিকদের দৃষ্টিতে আল-হুসাইনের হত্যাকারীরা
শিয়া আলেম, ঐতিহাসিক ও লেখকগণ স্বীকার করেছেন যে, কুফার শিয়ারাই আল-হুসাইনকে পরিত্যাগ করেছিল—এবং (তাঁর প্রতি) তাদের আনুগত্যের অঙ্গীকার বহাল থাকা সত্বেও তারা বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল—তারপর তাঁকে এবং তাঁর পরিবারকে হত্যা ও বন্দি করতে অগ্রসর হয়েছিল। নিম্নোক্ত তথ্যগুলো সবই শিয়া সূত্র থেকে উদ্ধৃত করা হয়েছে।
আল-হুসাইনের প্রতি তাঁর ভাই মুহাম্মাদ বিন আল-হানাফিয়্যার উপদেশ, তিনি বলেছিলেন:
হে আমার ভাই, আপনার পিতা ও ভাইয়ের সঙ্গে কুফাবাসীদের বিশ্বাসঘাতকতা সম্পর্কে আপনি জানেন। আমি আশঙ্কা করছি আপনার বিষয়টি তাঁদের মতোই হবে যারা ইতোমধ্যে মৃত্যুবরণ করেছেন। [আল-মালহূফ, বিন তাউস (পৃ. ৩৯); আশুরা, আল-ইহসাঈ (পৃ.১১৫); আল-মাজালিস আল-ফাখিরাহ, আব্দুল হুসাইন (পৃ. ৭৫); মুনতাহাল আল-আমাল, আব্বাস আল-কুম্মী (১/৪৫৪)]
কুফার শিয়াদের ব্যাপারে আল-হুসাইনের উক্তি:
হে আল্লাহ, আমাদের ও সেই জাতির মাঝে ফয়সালা করুন, যারা আমাদেরকে সাহায্যের জন্য আহ্বান করেছে, অথচ তারাই আমাদেরকে হত্যা করেছে। [মুনতাহা আল-আমাল, আব্বাস আল-কুম্মী (১/৫৩৫)]
শিয়া লেখক হুসাইন আল-কাওরানী লিখেছেন:
কুফাবাসীরা ইমাম আল-হুসাইন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েই ক্ষান্ত হয়নি; বরং তাদের দ্বিচারিতার ফলস্বরূপ তারা তৃতীয় একটি অবস্থান গ্রহণ করেছিল, আর তা হলো তারা ইমাম আল-হুসাইন (আলাইহিস সালাম)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য কারবালার উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়ার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছিল। আর তারা কারবালায় এমন অবস্থান গ্রহণে দ্রুততা ও প্রতিযোগিতা করছিল যা শয়তানকে সন্তুষ্ট করে এবং আর-রহমান (আল্লাহ)-কে অসন্তুষ্ট করে। উদাহরণস্বরূপ, আমরা দেখি, কিছুদিন আগেও যেই আমর বিন আল-হাজ্জাজ কুফায় আহলুল বাইতের মর্যাদার রক্ষক ও তাদের সমর্থক হিসেবে পরিচিত ছিল, এবং হানী বিন উরওয়াহকে উদ্ধার করার জন্য বাহিনী পরিচালনা করেছিল, সে-ই পরবর্তীতে আল-ইমাম আল-হুসাইনকে দীনদ্রোহিতার অভিযোগে অভিযুক্ত করার জন্য তার প্রকাশ্য অবস্থানগুলোকে বর্জন করেছিল। আসুন আমরা নিম্নোক্ত বক্তব্যের দিকে লক্ষ্য করি: “আর আমর বিন আল-হাজ্জাজ তার সঙ্গীদের বলত, ‘তোমরা সেই ব্যক্তির (অর্থাৎ আল-হুসাইন) বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো, যে দীন থেকে বেরিয়ে গিয়েছে এবং জামাআত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে…’।” [ফি রিহাব আল-কারবালা (পৃ. ৬০–৬১)]
আল-কাওরানী আরও লিখেছেন:
আমরা আব্দুল্লাহ বিন হাওযাহ আল-তামীমীর ঘটনায় কুফাবাসীর মুনাফিকির আরেকটি দৃষ্টান্ত খুঁজে পাই, যে আল-ইমাম আল-হুসাইনের নিকট এসে চিৎকার করে বলেছিল: ‘হুসাইন কি তোমাদের মাঝে আছে?’ অথচ কিছুদিন আগেও সে আলী (আলাইহিস সালাম)-এর শিয়ার (দল) অন্তর্ভুক্ত ছিল। আর সম্ভবত, সে তাদের দলভুক্ত ছিল যারা ইমাম (আল-হুসাইন)-কে উদ্দেশ্যে করে লিখেছিল অথবা সে শাবাস ও অন্যান্যদের দলভুক্ত ছিল যারা (কুফা থেকে আল-হুসাইনকে চিঠি লিখেছিল)… তারপর সে (বলেছিল) “হে হুসাইন, জাহান্নামের সুসংসবাদ গ্রহণ করো…”! [ফি রিহাব আল-কারবালা (পৃ. ৬১)]
আরেকজন শিয়া লেখক মুরতাযা মুতাহহিরী তার নিজের উত্থাপিত প্রশ্নের উত্তরে লিখেছেন: আল-হুসাইন (আলাইহিস সালাম)-এর প্রতি কুফাবাসীদের ভালোবাসা ও হৃদ্যতা থাকা সত্ত্বেও তারা কি করে তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হলো?:
এর উত্তর হলো সেই ভয় ও আতঙ্ক, যা যিয়াদ ও মুআবিয়ার যুগ থেকে কুফাবাসীদের অন্তরে গেঁথে গিয়েছিল যা উবাইদুল্লাহ [বিন যিয়াদ]-এর আগমনের পর আরও ভয়াবহ মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছিল। সে আসামাত্র মাইসাম আত-তিমার, রশীদ, মুসলিম এবং হানীকে হত্যা করেছিল… [আল-মালহামাহ আল-হুসাইনিয়্যাহ (৩/৪৭–৪৮)]
শিয়া, কাজিম আল-ইহসাঈ আন-নাজাফী বলেছেন:
যেই বাহিনী ইমাম হুসাইন (আলাইহিস সালাম)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে বের হয়েছিল, তাদের সংখ্যা ছিল ৩ লক্ষ এবং তারা সবাই কুফার বাসিন্দা ছিল। তাদের মধ্যে কোনো শামী, হিজাজী, ভারতীয়, পাকিস্তানি, সুদানি, মিসরীয় বা আফ্রিকান ছিল না। বরং তারা সবাই কুফার লোক ছিল এবং বিভিন্ন গোত্র থেকে একত্রিত হয়েছিল। [আশুরা (পৃ. ৮৯)]
শিয়া ঐতিহাসিক, হুসাইন বিন আহমাদ আল-বারাকী আন-নাজাফী বলেছেন:
আল-কাজওয়ীনী বলেছেন: আর যে-সব কারণে কুফাবাসীদের প্রতি ধিক্কার ও তাচ্ছিল্য প্রকাশ করা হয়েছিল, তার মধ্যে একটি ছিল যে, তারা হাসান বিন আলীকে (আলাইহিস সালাম) তিরস্কার করেছিল এবং হুসাইনকে (আলাইহিস সালাম) হত্যা করেছিল — অথচ তারা তাঁকে (তাদের নেতা হিসেবে) আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। [তারিখ আল-কুফাহ (পৃ. ১১৩)]
শিয়া বিশেষজ্ঞ, আয়াতুল্লাহ আল-উযমা মুহসিন আল-আমীন বলেছেন:
ইরাকের ২০,০০০ লোক, যারা হুসাইনের হাতে বায়াত গ্রহণ করেছিল, তাঁর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল, এবং তারা বায়াতের অঙ্গীকারে আবদ্ধ থাকা সত্বেও তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল ও তাঁকে হত্যা করেছিল।
এবং জাওয়াদ মুহদিসী বলেছেন:
ইমাম হাসান তাদের পক্ষ থেকে বিশ্বাসঘাতকতার সম্মুখীন হয়েছিলেন। মুসলিম বিন আকীল তাদের মধ্যেই অন্যায়ভাবে নিহত হয়েছিলেন আর হুসাইন কারবালার প্রান্তরে, কুফার নিকটে, কুফার বাহিনীর হাতে নির্মমভাবে নিহত হয়েছিলেন।
বহু শিয়া আলেম তাদের শাইখদের নিকট হতে আলী বিন আল-হুসাইন বিন আবী তালিব (যিনি যাইনুল আবিদীন নামেও পরিচিত) থেকে বর্ণনা করেছেন যে তিনি সেই শিয়াদের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, যারা তার পিতাকে পরিত্যাগ করেছিল এবং তাঁকে হত্যা করেছিল:
হে লোকসকল, আমরা তোমাদেরকে আল্লাহর দোহাই দিয়ে জিজ্ঞেস করছি, তোমরা কি জানো না যে তোমরাই আমার পিতাকে চিঠি লিখেছিলে, তাঁকে ধোঁকা দিয়েছিলে, তার হাতে বায়াত গ্রহণ করেছিলে, অঙ্গীকার করেছিলে, তারপর তাঁকে হত্যা করেছিলে ও পরিত্যাগ করেছিলে? তোমাদের কৃতকর্ম এবং মন্দ চিন্তার কারণে তোমাদের ধ্বংস হোক। তোমরা কোন চোখ দিয়ে রাসূলুল্লাহর দিকে তাকাবে, যখন তিনি বলবেন: “তোমরা আমার পরিবারকে হত্যা করেছ এবং আমার মর্যাদা লঙ্ঘন করেছ; সুতরাং তোমরা আমার দলভুক্ত নও।” [আল-ইহতিজাজ (২/৩২), আল-তাবারসী; আল-মালহূফ (পৃ. ৯২), বিন তাউস; আল-লাওয়াইজ আল-আশজান (পৃ. ১৫৮), আল-আমীন; মুনতাহাল আ’মাল (১/৫৭২), আব্বাস আল-কুম্মী; ফি রিহাব আল-কারবালা (পৃ. ১৮৩), হুসাইন কাওরানী; মাকতাল হুসাইন (পৃ. ৩১৭), আব্দুর রাজ্জাক আল-মুকরিম; মাকতাল হুসাইন (পৃ. ৮৭), মুরতাযা ইয়াদ্ব; তাযলীম আয-যাহরা (পৃ. ২৬২), রিদা আল-কাওযীনী; নাফস আল-মাহমূম (পৃ. ৩৬০), আব্বাস আল-কুম্মী]
আর যখন আলী বিন আল-হুসাইন যাইনুল আবিদীন কুফাবাসীদের বিলাপ ও মাতম করতে দেখলেন, তিনি তাদেরকে তিরস্কার করলেন এবং বললেন:
তোমরা আমাদের জন্য বিলাপ করছ ও কাঁদছ? তাহলে আমাদেরকে কারা হত্যা করল? [মাকতাল হুসাইন, মুরতাদা ইয়াদ (পৃ. ৮৩); তাযলিম আল-যাহরা (পৃ. ২৫৭); আল-মালহূফ (পৃ. ৮৬)]
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে, তিনি তাদের অতিক্রম করছিলেন এবং তিনি অসুস্থ ছিলেন এবং তিনি দুর্বল কণ্ঠে বলেছিলেন:
তোমরা কি আমাদের জন্য বিলাপ করছ ও কাঁদছ? তাহলে আমাদেরকে কারা হত্যা করল? [মুনতাহাল আ’মাল (১/৫৭০)]
তিনি অন্য এক বর্ণনায় বলেছিলেন:
এই লোকেরা আমাদের জন্য কাঁদছে, অথচ তারা ব্যতীত আর কারা আমাদেরকে হত্যা করেছে? [আল-ইহতিজাজ (২/২৯)]
শিয়া সূত্রে আরও বর্ণিত হয়েছে যে উম্মু কুলসুম বিনতে আলী বলেছিলেন:
হে কুফাবাসী, তোমাদের জন্য লাঞ্ছনা! তোমাদের কী হলো যে, তোমরা হুসাইনকে পরিত্যাগ করলে, তাঁকে হত্যা করলে, তাঁর সম্পদ লুট করে তা উত্তরাধিকার হিসেবে বণ্টন করে নিলে, তাঁর নারীদের বন্দী করলে এবং তাঁকে কষ্ট দিলে? তোমাদের ধ্বংস হোক… তোমরা এক ভয়ংকর বোঝা নিজেদের কাঁধে বহন করছ, এবং কার রক্ত ঝরিয়েছ! তোমরা নবীর পরে শ্রেষ্ঠ মানুষগুলোকে হত্যা করেছ, আর তোমাদের অন্তর থেকে রহমত কেড়ে নেওয়া হয়েছে। [নাফস আল-মাহমূম (পৃ. ২৬২); মাকতাল হুসাইন, আল-মুকরিম (পৃ. ৩১৬); লাওয়াইজ আল-আশজান (পৃ. ১৫৭)]
আর যায়নাব বিনতে আলী বিন আবী তালিবের নিকট হতে শিয়া লেখক আসাদ হায়দার বর্ণনা করেছেন—যা আল-তাবারসী তার আল-ইহতিজাজ (২/২৯–৩০) গ্রন্থেও উল্লেখ করেছেন:
أما بعد يا أهل الكوفة، يا أهل الختل والغدر والخذل .. إنما مثلكم كمثل التي نقضت غزلها من بعد قوة أنكاثاً، هل فيكم إلا الصلف والعجب والشنف والكذب .. أتبكون أخي؟! أجل والله فابكوا كثيراً واضحكوا قليلاً فقد ابليتم بعارها .. وانى ترخصون قتل سليل خاتم النبوة
অতঃপর, হে কুফাবাসী, হে প্রতারক, বিশ্বাসঘাতক ও পরিত্যাগকারী লোকেরা… তোমাদের উদাহরণ সেই নারীর মতো, যে নিজের সুতা মজবুতভাবে বুনে আবার তা খুলে টুকরো টুকরো করে ফেলে। তোমাদের ভিতরে কি অহংকার, আত্মম্ভরিতা, চরম বিদ্বেষ ও মিথ্যাচার ব্যতীত কিছু আছে? তোমরা কি আমার ভাইয়ের জন্য কাঁদছ?! হ্যাঁ, আল্লাহর কসম! তবে অনেক কাঁদো এবং অল্প হাসো; কারণ তোমরা এর লাঞ্ছনায় কলঙ্কিত হয়েছ… আর তোমরা কি করে নবুয়তের সিলমোহরের বংশধরকে হত্যা করাকে এত তুচ্ছ মনে করলে? [মা‘আল-হুসাইন ফি নাহদাতিহি (পৃ. ২৯৫)]
মুহসিন আল-আমীন আল-হুসাইনী আল-আমিলী তাঁর “ফি রিহাব আ’ইম্মাহ আহল আল-বাইত” (১/৯) গ্রন্থে বলেছেন:
যাহার বিন কায়স, তিনি আলী (আলাইহিস সালাম)-এর সঙ্গে জামাল ও সিফফীনের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল। এমনকি শাবাস বিন রুবঈ ও শিমর বিন যিল-জাওশান আদ-দিয়াবী তাঁর সঙ্গে সিফফীনের (যুদ্ধে) উপস্থিত ছিল। এরপর তারা কারবালার দিনে আল-হুসাইন (আলাইহিস সালাম)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। ফলে তাদের পরিণতি ছিল অত্যন্ত নিকৃষ্ট পরিণতি (সূ’ আল-খাতিমাহ)। আর আমরা আল্লাহর নিকট মন্দ পরিণতি থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করি।
এবং প্রসিদ্ধ শিয়া আলেম, আশ-শাইখ আল-মুফীদ তার আল-ইরশাদ গ্রন্থে (২/৯৫–৯৬ এবং পরবর্তী অংশে) তাদের সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন, যারা হুসাইনের বিরুদ্ধে লড়াই ও তাঁকে হত্যা করার জন্য বের হয়েছিল:
وأصبح عمر بن سعد في ذلك اليوم وهو يوم الجمعة وقيل يوم السبت، فعبأ أصحابه وخرج فيمن معه من الناس نحو الحسين عليه السلام وكان على ميمنته عمرو بن الحجاج، وعلى ميسرته شمر بن ذي الجوشن، وعلى الخيل عروة بن قيس، وعلى الرجالة شبث بن ربعي، وأعطى الراية دريدا مولاه
সেদিন সকালে উমার বিন সা‘দ জাগ্রত হয়েছিল—দিনটি ছিল জুমুআর দিন; আর বলা হয় দিনটি ছিল শনিবার এবং সে তার সাথিদের সংগঠিত করেছিল, তারপর সে তার সাথিদেরকে নিয়ে আল-হুসাইন (আলাইহিস সালাম)-এর দিকে অগ্রসর হয়েছিল, তার ডান পাশে ছিল আমর বিন আল-হাজ্জাজ, বাম পাশে ছিল শাম্মার বিন যিল-জাওশান, আর অশ্বারোহী বাহিনীর দায়িত্বে ছিল উরওয়াহ বিন কায়স এবং পদাতিক বাহিনীর দায়িত্বে ছিল শাবাস বিন রুবঈ এবং সে তার মুক্তদাস দুরাইদের হাতে পতাকা তুলে দিয়েছিল ।
এরপর পরবর্তী প্রায় বিশ পৃষ্ঠা জুড়ে তিনি লড়াইয়ের বিবরণ তুলে ধরেছেন, যার মধ্যে শাম্মার বিন যিল-জাওশানের হাতে আল-হুসাইন (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)-এর হত্যাকাণ্ডের ঘটনা বর্ণিত হয়েছে।
মন্তব্য:
আহলুল বাইতের এই উক্তি, “তোমরা আমাদের জন্য বিলাপ করছ ও কাঁদছ, অথচ তোমরাই তো আমাদেরকে হত্যা করেছ,” শিয়া ধর্মের অভ্যন্তরীণ প্রতারণা, ভণ্ডামি ও ভ্রান্তিকে প্রকাশ করে, যা এক হাস্যকর বিদ্বেষের উপর দাঁড়িয়ে আছে। এটি তাদের নির্বুদ্ধিতা ও বোকামির লক্ষণ (অথবা বিকৃত মানসিকতার লক্ষণ), যারা এটি স্পষ্টভাবে জানে যে তাদের শিয়া পূর্বসূরীরাই আল-হুসাইন (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)-কে হত্যা করেছে, তারপরও তারা তাদের প্রতি চরম ঘৃণা ও ঘোর বিদ্বেষ প্রকাশ করেছে যারা ইতিহাসের ব্যাপারে তাদের শিশুসুলভ ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত হয়নি এবং তাদের চরম হিংস্র মানসিকতায় অংশ নেয়নি যা মূলত আল-হুসাইনের রক্তের নামে লোকদেখানো প্রতিশোধের উপর দাঁড়িয়ে আছে, নিশ্চয়ই (শিয়াদের পূর্বসূরীরা) আল-হুসাইনকে পরিত্যাগ করেছে তারপর তাকে হত্যা করেছে। তারপর এই লোকদেখানো কান্না, বিলাপ ও শোক শিয়াদের ভিতর একটি বিদআতে পরিণত হয়েছে যা আজও বিদ্যমান। বিস্তারিত জানতে দেখুন: “মান কাতালা আল-হুসাইন” (কায়রো), লেখক আব্দুল্লাহ বিন আব্দিল আযীয।
Share this:
- Share on X (Opens in new window) X
- Share on Facebook (Opens in new window) Facebook
- Email a link to a friend (Opens in new window) Email
- Share on Pinterest (Opens in new window) Pinterest
- Share on Telegram (Opens in new window) Telegram
- Share on WhatsApp (Opens in new window) WhatsApp
- Print (Opens in new window) Print
- Share on LinkedIn (Opens in new window) LinkedIn
- Share on Tumblr (Opens in new window) Tumblr
















