Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors
Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

যাকাতের ফিক্বহ: বাধ্যতামূলক দান – কীসের উপর যাকাত দিতে হবে? আপনি কীভাবে হিসাব করবেন এবং কাকে দিবেন?

বিত্তশালী মুসলিমদের সদিচ্ছায় দান করা উচিত যাতে এরকম করুণ দৃশ্য দেখতে না হয়।

(ইসলামের) তৃতীয় স্তম্ভ, যাকাহ (বা যাকাত), যা কেবল ঐ সকল ধনী মুসলিমদের জন্য একটি ফরজ আমল যাদের সম্পদ একটি ন্যূনতম “নিসাব পরিমাণে” পৌঁছেছে এবং যা এক বছর তাদের অধীনে রয়েছে। প্রতি বছর, তাদেরকে অবশ্যই তাদের মজুদকৃত স্বর্ণ, রৌপ্য ও সঞ্চয়ের ২.৫% সমাজের অভাবগ্রস্তদের দান করতে হবে। এভাবে, তারা তাদের সম্পদকে পবিত্র করবে। যাকাতের অর্থ হলো কারও হালাল (জায়েজ) উপার্জনকে “পরিশুদ্ধ করা” বা “পরিচ্ছন্ন করা”। অবৈধ উপার্জন আল্লাহর কাছে গৃহীত হয় না কারণ নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:

“আল্লাহ তিনি পবিত্র ও উত্তম এবং তিনি পবিত্র ও উত্তম জিনিসই পছন্দ করেন।”

কীসের উপর যাকাত দিতে হবে?

যাকাত তখনই দিতে হয় যখন কোনো ব্যক্তি (পুরুষ বা নারীর) সম্পদ একটি নির্দিষ্ট (নিসাব) পরিমাণে পৌঁছায় বা অতিক্রম করে যে পরিমাণ সম্পর্কে শরীয়তে উল্লেখ রয়েছে। যে নির্দিষ্ট সম্পদের উপর যাকাত দিতে হবে তা চার শ্রেণিতে বিভক্ত:

১. জমি থেকে উৎপাদিত ফল ও ফসল।
২. চারণকৃত গবাদি পশু।
৩. স্বর্ণ, রৌপ্য ও নগদ অর্থ।
৪. পণ্যদ্রব্য হিসেবে বিক্রয়যোগ্য মালামাল।

ইউরোপে বসবাসকারী লোকদের জন্য সবচেয়ে স্বাভাবিক হলো তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির যাকাত। যে (নিসাব) পরিমাণে পৌঁছালে যাকাত দেওয়া বাধ্যতামূলক তা হলো:

● স্বর্ণের ক্ষেত্রে, তা ৮৫ গ্রাম; (কোনো কোনো ‘আলিমের মতে ৯২ গ্রাম)
● রৌপ্যের ক্ষেত্রে, তা ৫৯৫ গ্রাম; (কোনো কোনো ‘আলিমের মতে ৬৪০ গ্রাম)
● নগদ অর্থের ক্ষেত্রে, তা ৫৯৫ গ্রাম রৌপ্যের সমমূল্য যা ২০২০ সালের রমাদ্বান অনুযায়ী £২৩৮ ব্রিটিশ পাউন্ড (বা $২৯৬ মার্কিন ডলার)।

বিত্তশালী মুসলিমদের সদিচ্ছায় দান করা উচিত যাতে এরকম করুণ দৃশ্য দেখতে না হয়।

“যাকাত হলো ধনীদের উপর গরিবদের একটি প্রাপ্য অধিকার।”

কুরআনে যাকাতের পরিমাণের বিষয়ে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু উল্লেখ নেই; তবে, এই পরিমাণগুলো প্রামাণিক হাদীসের মাধ্যমে সহীহ সুন্নাতে বিশদভাবে বর্ণিত হয়েছে – যা এই রুকনটির সুমহান গুরুত্বকে প্রমাণ করে। সুতরাং কারো সম্পদ যদি নিসাব পরিমাণের বেশি হয় এবং তা এক বছর ধরে মজুদ থাকে, তাহলে এর উপর ২.৫% যাকাত দিতে হবে। যার কাছে এই পরিমাণের চেয়ে কম সম্পদ আছে তাকে যাকাত দিতে হবে না। হীরা, প্ল্যাটিনাম বা অন্যান্য গহনার উপর যাকাত দিতে হয় না। এটি গাড়ি, বাড়ি বা সম্পত্তির উপর দিতে হয় না (তবে ভাড়া ও বিনিয়োগ থেকে যে লাভ অর্জিত হয় সেই অর্থের উপর যাকাত দিতে হয়)। সুতরাং যাকাত কতটুকু দিতে হবে তা নির্ধারণ করার জন্য, আপনার সারা বছরের জমানো নগদ সঞ্চয় এবং মজুদকৃত স্বর্ণ – যা নিসাব অতিক্রম করেছে, যোগ করুন, অতঃপর এর ২.৫% হিসাব করুন এবং এটি কুরআনে বর্ণিত আট শ্রেণীর (আত-তাওবাহ ৯:৬০) যে কোনোটিতে যাকাত হিসেবে ব্যয় করুন।

যারা যাকাতের হকদার তাদের তালিকা

১. গরীব (ফুক্বারা)।
২. অভাবী (মাসাকীন)।
৩. যারা এটি সংগ্রহের জন্য নিযুক্ত (তাদের প্রয়োজন মেটানোর জন্য)।
৪. ইসলামের প্রতি আগ্রহী অমুসলিমদের অন্তরকে আকৃষ্ট করার জন্য।
৫. ক্রীতদাস মুক্ত করার জন্য।
৬. প্রকৃত ঋণগ্রস্তদেরকে সাহায্যার্থে।
৭. একটি মুসলিম রাষ্ট্রের সরকারি সেনাবাহিনী।
৮. পথিককে তার গন্তব্যস্থলে পৌঁছাতে সাহায্য করার জন্য।

মহান আল্লাহ এই শ্রেণীগুলো সম্পর্কে বলেছেন:

“নিশ্চয়ই আস-সাদাক্বাত (এখানে এর অর্থ হলো যাকাত) শুধু ফকির, মিসকিন এবং তা (সংগ্রহের জন্য) নিযুক্ত কর্মচারীদের জন্য, আর যাদের অন্তর (ইসলামের প্রতি) আকৃষ্ট হয়ে আছে তাদের জন্য; এবং দাস আজাদ করার জন্য, এবং ঋণগ্রস্তদের জন্য; এবং আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করার জন্য (অর্থাৎ মুজাহিদূন, মুসলিম রাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর জন্য), এবং মুসাফিরের জন্য যে তার গন্তব্যে পৌঁছাতে অক্ষম; এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে ফরজ বিধান। আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়।” (৯:৬০)

নগদ টাকার উপর যাকাত কীভাবে হিসাব করতে হয়? এটি কি স্বর্ণ বা রৌপ্যের নিসাবের সাথে সম্পৃক্ত?

“এটি জানা কথা যে, বর্তমান সময়ে রৌপ্যের নিসাবের মূল্য স্বর্ণের নিসাবের মূল্যের চেয়ে কম। সুতরাং, যখন কোনো ব্যক্তির কাছে কাগজের মুদ্রা থাকবে যার মূল্য রৌপ্যের নিসাব পর্যন্ত পৌঁছেছে, তখন সে এর উপর যাকাত দিবে। রৌপ্যের নিসাব ৫৯৫ গ্রাম (বা এর খুব কাছাকাছি)। সুতরাং যার কাছে এর সমমূল্য (বা এর বেশি) নগদ অর্থ থাকবে, তাকে অবশ্যই এর পুরোটার উপর ২.৫% হিসেবে যাকাত দিতে হবে।

উলামাগণ বলেছেন যে, গরিবদের জন্য এটি অধিক উপকারী হবে যদি কাগজের টাকার পরিমাপ দুটি নিসাব হতে যেটি কম সে অনুসারে নির্ধারণ করা হয়। (দেখুন ফাতাওয়া ইবনি বায, ১৪/১২৫, ফাতাওয়া আল-লাজনাহ আদ-দাইমাহ, খণ্ড ৯/২৫৪, নং ১৮৮১, ‘আবদুল্লাহ ইবনু ক্ব‘ঊদ, ‘আবদুল্লাহ ইবনু গুদাইয়ান, ‘আব্দুর-রাজ্জাক্ব আল-‘আফীফী, ইবনু বায কর্তৃক স্বাক্ষরিত) এছাড়াও, আল-লাজনাহ আদ-দাইমাহ (উলামাদের একই কমিটি) বলেছে যে, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সময়ে রৌপ্যের নিসাব ছিল ২০০ রৌপ্য দিরহাম (যা ৫৯৫ গ্রাম রৌপ্যের সমতুল্য), সুতরাং যদি কোনো মুসলিমের কাছে এ সমমূল্যের কাগজের মুদ্রা থাকে, তাহলে তার জন্য যাকাত ফরজ হবে (ফাতাওয়া ইসলামিয়্যাহ, ৩/১৬৩)। শাইখ ইবনু বায এ বিষয়ে ফাতওয়া দিয়েছেন যে, কাগজের মুদ্রার উপর যাকাত তখন বাধ্যতামূলক হবে যখন এর মূল্য রৌপ্য ও স্বর্ণ এই দুই নিসাবের মাঝে যেটির মূল্য কম সেটির সমতুল্য হবে (ফাতাওয়া ইবনি বায, ১৪/১২৫) এবং আমাদের যুগে দুটি নিসাবের মাঝে সবচেয়ে কম হলো রৌপ্য।”

যাকাতের হিসাব: একটি উদাহরণ

● একজন ব্যক্তির কাছে ১১০ গ্রাম স্বর্ণ ছিল। রামাদান ২০১৮ অনুযায়ী (২২ ক্যারেট অনুপাতে) প্রতি গ্রাম-এর মূল্য £২৬ (আনুমানিক), অতএব এর আর্থিক মূল্য দাঁড়ায় = £২৮৬০
এই স্বর্ণটি ৮৫ গ্রাম নিসাব পরিমাণের চেয়ে বেশি, এবং মালিকের কাছে এটি এক বছর ধরে আছে, তাই এর যাকাত £২৮৬০ এর উপর ২.৫% (যদি তা নগদ অর্থে দিতে হয়), তবে £৭১.৫০ দাঁড়ায়।
● বাড়িতে নগদ অর্থ: £৩৫০ + ব্যাংকে সঞ্চয় £১৫৫০ = £১৯০০
এই নগদ অর্থ এক বছর যাবত একজন ব্যক্তির অধীনে রয়েছে। এর উপর যাকাত কত হবে তা রৌপ্য মূল্য অনুযায়ী হিসাব করতে হবে। রৌপ্যের নিসাব ৫৯৫ গ্রাম। ২০১৮ সালের রমাদ্বান অনুযায়ী প্রতি গ্রামের মূল্য (প্রায়) £০.৩৯। সুতরাং রৌপ্যের নিসাব মূল্য £২৩৮ - এই ব্যক্তির কাছে £১৯০০ আছে তাই এটি নিসাব পরিমাণের চেয়ে বেশি। তাকে অবশ্যই £১৯০০ এর উপর ২.৫% যাকাত দিতে হবে যার পরিমাণ £৪৭.৫০
মোট
● মোট প্রদেয় যাকাত হলো £৭১.৫০ + £৪৭.৫০ = £১১৯.০০

যারা মাসিক বেতন বা মাসিক ভাড়া পায় তাদের ক্ষেত্রে যাকাতের বিধান:

ইবনু ‘উসাইমীন ব্যাখ্যা করেছেন, যে ব্যক্তি মাসিক বেতন, ভাড়া বা এর অনুরূপ কিছু পায় – ঐ সম্পদটুকু অর্জন করে সে একটি বাক্স বা অন্য কোনো সঞ্চয়ের মাধ্যমে (যেমন কোনো ব্যাংকে) তা সংরক্ষণ করে। এবং পুরো বছরজুড়ে এত্থেকে সে নিজ প্রয়োজন অনুসারে টাকা তুলে আবার এতে টাকা যোগও করে। অতঃপর এক পর্যায়ে তার কাছে বছরজুড়ে কত টাকা ছিল ঐ ব্যাপারে সে সন্দিহান হয়ে পড়ে। আমরা বলি, যদি এই অবস্থায় সর্বমোট অর্থ ন্যূনতম নিসাবের পরিমাণ (৫৯৫ গ্রাম রৌপ্যের সমমূল্য) থেকে কম না হয়, সেক্ষেত্রে যখন তার নগদ অর্থের মূল্য নিসাবের সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছিল তখন থেকে বছর বিবেচনা করাই উত্তম হবে। অতঃপর বছর শেষে (মুসলিমরা এক বছরের চন্দ্রচক্রকে অনুসরণ করে, যেমন এক রামাদান থেকে আরেক রামাদান বা রজব থেকে পরবর্তী রজব ইত্যাদি) তার কাছে যা থাকবে এর উপর তাকে যাকাত দিতে হবে। এভাবে, একটি বছর পূর্ণ হওয়ার পর তার কাছে যে পরিমাণ অর্থ থাকবে এর উপর তার যাকাত দেওয়া হয়ে যাবে – আর যে পরিমাণ অর্থের উপর এখনও একটি বছর পূর্ণ হয়নি, এর উপরও তার অগ্রিম যাকাত দেওয়া হয়ে যাবে। আর অগ্রিম যাকাত দেওয়াতে কোনো ক্ষতি নেই। প্রতি মাসে সুনির্দিষ্টভাবে হিসাব করার পরিবর্তে এই পদ্ধতিটি অনুসরণ করা তার জন্য সহজ হবে কারণ অন্য পদ্ধতিটি (অর্থাৎ প্রতি মাসে হিসাব রাখা) তার জন্যে কঠিন হতে পারে। (ফাতাওয়া ইসলামিয়্যাহ ৩/১৬১-১৬২)

কীভাবে এবং কাকে দেওয়া উচিত?

কিছু মসজিদ আছে যারা তাদের জামা’আত থেকে যাকাত সংগ্রহ করে এবং কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী তা ব্যয় করে। আপনি আপনার যাকাত এখানে অনলাইনে পরিশোধ করতে পারেন: https://salafibookstore.com/zakat/

দাতব্য সংস্থাগুলোও (charity organizations) যাকাত সংগ্রহ করে – কিন্তু একজন ব্যক্তি নিজেই যাকাত বণ্টন করতে পারে। অনেক মুসলিম দেশে, সরকারিভাবে যাকাত সংগ্রহ করা হয় এবং সে অনুযায়ী বণ্টন করা হয়। যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপে (বসবাসরত) মুসলিমদেরকে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে যে, তারা যেন তাদের যাকাত বা অন্যান্য সাদাক্বাহ ঐ সমস্ত সংস্থাগুলোতে না দেয় যারা হামাস (ফিলিস্তিন), আইএসআইএস (সিরিয়া এবং ইরাক্ব), তালেবান (পাকিস্তান এবং আফগানিস্তান), আল-শাবাব (সোমালিয়া) ইত্যাদির মতো জঙ্গি সংগঠনগুলোকে সমর্থন করে। এক্ষেত্রে তাদের যাকাত বা সাদাক্বাহ শরীয়তসম্মত হবে না কারণ তারা (জঙ্গিরা) যাকাতের প্রকৃত হকদার নয়। রাজনৈতিক প্রচারণা বা সংসদে প্রার্থী নির্বাচনের জন্য যাকাত দেওয়া যাবে না। মসজিদ বা স্কুল নির্মাণের জন্য যাকাত দেওয়া যাবে না। যাকাতের বৈধ খাতগুলো সম্পর্কে জানতে উপরে দেখুন।

দরিদ্র ভাই, বোন, চাচা ও খালাকে যাকাত দেওয়া প্রসঙ্গে

শাইখ আব্দুল-‘আযীয বিন বায (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন: “যদি কোনো পুরুষ বা নারী স্বীয় যাকাত তার দরিদ্র আপন ভাই, বোন, চাচা বা খালা – অথবা কোনো দরিদ্র আত্মীয়কে দেয় তাতে কোনো ক্ষতি নেই কারণ দলিল-প্রমাণের সাধারণতার দরুন (বিষয়টি জায়েজ)। নিশ্চয়ই, তাদেরকে যাকাত দেওয়া সাদাক্বাহ হিসেবে গণ্য হবে এবং তা আত্মীয়তার সম্পর্ককে সমৃদ্ধ করবে কারণ রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: “মিসকীনকে দান করার মাঝে শুধু সাদাক্বার সওয়াব রয়েছে আর আত্মীয়-স্বজনকে দান করার মাঝে দুটি সওয়াব রয়েছে, দান করার সওয়াব এবং আত্মীয়তার
সম্পর্ক বজায় রাখার সওয়াব।”
(আহমাদ নং ১৫৭৯৪) সালমান ইবনু আমিরের হাদীস; আন-নাসাঈ নং ২৫৮২)

"কিন্তু, যাকাত দেওয়ার বিষয়টি পিতামাতা, দাদা-দাদি বা তাদের পূর্বপুরুষের কারও ক্ষেত্রে জায়েজ হবে না এবং তা সন্তান, নাতি-নাতনি বা তাদের বংশ পরম্পরার ক্ষেত্রেও জায়েজ হবে না। এদের মধ্যে কেউ গরীব হলেও এই শ্রেণীর আত্মীয়দেরকে যাকাত দেওয়া যাবে না। বরং ব্যক্তির উপর ফরজ হলো যে, তিনি তার সম্পদ থেকে তাদের ভরণপোষণের জন্য ব্যয় করবেন, যদি তিনি তাতে সক্ষম হন এবং তিনি ব্যতীত তাদের জন্য ব্যয় করার অন্য কেউ না থাকে।"

শাইখ আল-ফাওযানের কাছে নিজ সন্তানদেরকে যাকাত দেওয়ার বিষয়ে একটি প্রশ্ন করা হয়েছিল: “একজন তালাকপ্রাপ্তা নারী আছেন এবং যিনি তাকে তালাক দিয়েছেন সেই ব্যক্তি থেকে তার সন্তানও রয়েছে, কিন্তু তাদের পিতা তাদের ভরণপোষণ দেন না – তাই সে (নারী) উপার্জন করেন এবং তাদের (সন্তানদের) জন্য ব্যয় করেন। সে (নারী) কি তার যাকাত থেকে তাদের (সন্তানদের) ভরণপোষণ করাতে পারবেন?

উত্তর: “না। তাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব তাদের পিতার উপর অর্পিত। তাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব তাদের পিতাকে বহন করতে হবে।”

ব্যবসায়িক পণ্যদ্রব্যের উপর কি যাকাত দিতে হবে?

শাইখ আলবানী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, “স্বর্ণ ও রৌপ্য এই দুই মুদ্রার উপর যাকাত ফরজ। এই দু’টি ব্যতীত অন্যান্য ধাতুর উপর যাকাত দিতে হবে না। এক্ষেত্রে ব্যবসায়িক পণ্যের উপর যাকাতের বাধ্যবাধকতা সম্পর্কিত বিষয়টি ব্যতিক্রমধর্মী যে ব্যাপারে উলামাদের মাঝে একটি সুবিদিত মতপার্থক্য রয়েছে। তবে ধাতুর ক্ষেত্রে, (সরাসরি বা সুস্পষ্ট কোনো) শারঈ দলিল বা প্রমাণের অনুপস্থিতির দরুন এর উপর কোনো যাকাত আসবে না।

ব্যবসার উদ্দেশ্যে থাকা পণ্যদ্রব্য বলতে, একজন ব্যক্তির কাছে ব্যবসার উদ্দেশ্যে (অর্থাৎ বিক্রির উদ্দেশ্যে) থাকা সমস্ত কিছুকেই বুঝনো হয়েছে এবং এটি কোনও নির্দিষ্ট [প্রকারের] পণ্যের প্রতি নির্দেশ করে না।”

অর্থাৎ: যাকাত থেকে কোনো কিছুই বাদ যাবে না। সুতরাং তিনি (রাহিমাহুল্লাহ) শুধু স্বর্ণ ও রৌপ্যের উপর যাকাত আদায়ের ব্যাপারে যা বলেছেন এর প্রেক্ষিতে আমরা বলি যে, যেহেতু তা ব্যবসায়িক পণ্যের সাথে সম্পৃক্ত, তাই যাকাত আদায় করার বিষয়টি শুধু স্বর্ণ ও রৌপ্যের মাঝেই সীমাবদ্ধ থাকবে না বরং তা (ব্যবসার সাথে সম্পৃক্ত) সমস্ত কিছুর উপরই প্রযোজ্য হবে।

শাইখ আলবানী বলেছেন: “ব্যবসায়িক পণ্যদ্রব্যের (উপর যাকাত) হলো এমন এক শ্রেণীর যাকাত যে ব্যাপারে বহু আগে থেকেই উলামাদের মাঝে মতপার্থক্য রয়েছে। এই শ্রেণীর উপর যাকাত দেওয়ার বিষয়টিকে কিছু আলিম ফরজ বলেছেন আবার অন্যান্যরা তা ফরজ বলেননি।

সুতরাং যখন বলা হয়: ‘ব্যবসায়িক পণ্যের উপর কি যাকাত দিতে হবে?’ এই প্রশ্নে ‘যাকাত’ শব্দ দ্বারা এখানে উদ্দেশ্য হলো নির্ধারিত পরিমাণের যাকাত, যা নিসাব পূর্ণ হওয়ার শর্তে এবং এক বছর নিজের হেফাজতে থাকার পর আদায় করা হয়ে থাকে। সুতরাং (এক্ষেত্রে) যারা ‘যাকাত’ ওয়াজিব মনে করেন, তাদের বলার উদ্দেশ্য হলো যে, এক্ষেত্রে বাৎসরিক যাকাত আদায় করা ওয়াজিব – অর্থাৎ যদি পণ্যের মূল্য নিসাব পরিমাণে পৌঁছায় তবে এর উপর ২.৫% হারে যাকাত দিতে হবে যেমনিভাবে তা স্বর্ণ ও রৌপ্যের ক্ষেত্রেও দিতে হয়।

এই প্রকার যাকাত ওয়াজিব হওয়ার বিষয়টি সুন্নাহ ও আল্লাহর কিতাব থেকে সাব্যস্ত নয়

কিন্তু, একটি সাধারণ যাকাত আছে যেটি এমন ব্যক্তির উপর ফরজ যার কাছে [বিক্রয়ের জন্য] প্রচুর পরিমাণে ব্যবসায়িক পণ্য আছে। সেক্ষেত্রে তিনি একটি অনির্দিষ্ট পরিমাণে যাকাত দিয়ে থাকেন যা এক বছর অতিবাহিত হওয়ার শর্তসাপেক্ষ নয় – আর এটি [যাকাত ও দান] সম্পর্কিত অসংখ্য দলিল-প্রমাণের সাধারণতার আলোকে, যেমন মহান আল্লাহর বাণী: “হে ঈমানদারগণ! আমি তোমাদেরকে যে রিযিক দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করো।” [আল-বাক্বারাহ ২:২৫৪]

(এক্ষেত্রে যাকাতের জন্য) একটি সময় নির্ধারণ করে দেওয়া এবং তা ২.৫% নির্দিষ্ট করার [সমর্থনে] সহীহ সুন্নাতে কোনও প্রমাণ পাওয়া যায় না। আর আমি এ জন্য সহীহ সুন্নাহ বলছি কারণ ‘সুনান আবী দাঊদ’ সহ অন্যান্য গ্রন্থে এমন কিছু বর্ণনা রয়েছে, যদি সেগুলো সহীহ হতো, তবে তা ব্যবসায়িক পণ্যের উপর যাকাত দেওয়ার আবশ্যকতাকে প্রমাণ করত। (দেখুন আল-মাসাইল আল-ইলমিয়্যাহ ওয়াল-ফাতাওয়া আশ-শার‘ইয়্যাহ – ফাতাওয়া আশ-শাইখ আল-আল্লামাহ মুহাম্মাদ নাসিরুদ্দীন আলবানী ফিল-মাদীনাহ ওয়াল-ইমারাত।” পৃ. ১১৯)

এ সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানতে এই প্রবন্ধটি পড়ুন:

কুরআন এবং যাকাত

“আর তোমরা সালাত কায়েম করো, যাকাত প্রদান করো আর রুকূকারীদের সাথে রুকূ করো।” (২:৪৩)

“আর সালাত কায়েম করো এবং যাকাত প্রদান করো, আর তোমরা নিজেদের জন্য যে নেক আমলগুলো অগ্রিম প্রেরণ করবে তা আল্লাহর কাছেই পাবে। নিশ্চয়ই তোমরা যা করো আল্লাহ তা দেখেন।(২:১১০)

“আর অবশ্যই আল্লাহ বনী ইসরাঈলের অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলেন এবং আমরা তাদের মধ্য থেকে বারোজন দলনেতা পাঠিয়েছিলাম। আর আল্লাহ বলেছিলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি তোমাদের সঙ্গে আছি; যদি তোমরা সালাত কায়েম করো, যাকাত প্রদান করো, আমার রাসূলগণের প্রতি ঈমান আনো, তাদেরকে সহযোগিতা করো আর আল্লাহকে উত্তম ঋণ প্রদান করো, তবে আমি তোমাদের পাপ অবশ্যই মোচন করব এবং অবশ্যই তোমাদেরকে জান্নাতসমূহে প্রবেশ করাব, যার পাদদেশে নদীসমূহ প্রবাহিত…” (৫:১২)

“অতএব যদি তারা তাওবাহ করে, সালাত কায়েম করে ও যাকাত প্রদান করে, তবে তারা তোমাদের দীনি ভাই; আর আমরা জ্ঞানী সম্প্রদায়ের জন্য আয়াতসমূহ স্পষ্টভাবে বর্ণনা করি।।” (৯:১১)

যাকাতের গুরুত্ব:

  • এটি একটি ইবাদত, কুরআনে বর্ণিত মহান আল্লাহর নির্দেশ।
  • এটি দরিদ্র-অসহায়দের দুঃখ-কষ্ট কমায়।
  • এটি সমাজকে শক্তিশালী করে – প্রত্যেকে অভাবগ্রস্তের খোঁজ রাখা এবং তাদের যত্ন নেওয়ার বিষয়টিকে নিশ্চিত করে।
  • এটি সমাজের অর্থনীতি ও ব্যবসাকে শক্তিশালী করে কেননা এর মাধ্যমে আরও বেশি সংখ্যক মানুষের কাছে অর্থ পৌঁছে যায় যা তারা বিনিয়োগ করতে পারে।
  • এটি হালাল সম্পদকে পরিশুদ্ধ করে আর কাউকে সম্পদের মজুদকারী হওয়া থেকে বিরত রাখে
  • এটি ব্যক্তিকে উদার ও সহানুভূতিশীল করে তুলে ও দুনিয়ার মোহকে কমিয়ে আনে।
  • কুরআন ও সুন্নাহ স্পষ্ট করে বলে যে, যারা যাকাত প্রদান করে না তারা গুনাহগার যাদের জন্য পরকালে আল্লাহর শাস্তির হুমকি রয়েছে। যাকাত প্রদান করা হতে বিরত থাকা একটি কবীরা গুনাহ।
  • কুরআনে বর্ণিত সালাত ও যাকাতের মাঝে একটি সম্পর্ক রয়েছে। সালাতের মাধ্যমে, আপনি আল্লাহকে ডাকেন, তাঁর সাহায্য চান এবং ঈমানের শক্তি অনুভব করেন। যাকাত দেওয়ার মাধ্যমে আপনি সেই অনুভূতিগুলোকে কাজে লাগান এবং এই দায়িত্ব পালনের জন্য পুরস্কৃত হন।

এটি প্রত্যেক মুসলিমের কাছ থেকে প্রত্যাশিত যে, তারা উদার হবে এবং ভালো কাজে যথাসম্ভব ব্যয় করবে। যারা সম্পদের মাধ্যমে (আল্লাহ কর্তৃক) অনুগ্রহপ্রাপ্ত – যাকাত প্রদান করা তাদের জন্য একটি ফরজ আমল – প্রকৃত অর্থে এটি এমন কিছুই না যা তাদের থেকে চাওয়া হচ্ছে। দরিদ্র মুসলিমদের জন্যও
সাধারণভাবে দান-সাদাক্বাহমূলক কাজের প্রতি উদার হওয়া ওয়াজিব, তবে তাদের সম্পদ নিসাব পরিমাণে না পৌঁছালে তারা যাকাত দিতে বাধ্য নয়।

আপনার জ্ঞান যাচাই করুন:

১. যাকাত কোন শ্রেণীর লোকদেরকে দিতে হয়?
২. কোন ধরনের সম্পদের উপর যাকাত দিতে হয়?
৩. কোন ধরনের সম্পদের উপর যাকাত দিতে হয় না?
৪. নিসাব কী এবং স্বর্ণ, রৌপ্য ও নগদ টাকার ক্ষেত্রে এর পরিমাণ কত?
৫. “আমি অর্থের গুরুত্ব এবং এর ভালো প্রভাবগুলো দেখতে পাই যদি সেটি কোনো ধার্মিক ব্যক্তির নিকট থাকে।” এই বাক্যটি ব্যাখ্যা করুন।

Support The Da'wah In Bangladesh

The Messenger (ﷺ) said: “And save yourselves from the hell fire even if it be with the piece of a date.”

Recent Posts

Recommended Readings

ইসলাম

ইসলাম হলো আদম (‘আলাইহিস সালাম) থেকে মুহাম্মাদ (ﷺ) পর্যন্ত সকল নবীর দীন। একজন মুসলিম হলেন সেই ব্যক্তি যিনি এই দীনকে কবুল করেন এবং এর উপর আমল করেন। মুসলিমরা একমাত্র সত্য মা'বূদ (আরবিতে আল-ইলাহ) আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য কারো ইবাদত করেন না। মুসলিমরা সকল প্রকার শিরক পরিত্যাগ করেন এবং তারা মানবজাতির প্রতি প্রেরিত সর্বশেষ রাসূল মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর প্রদর্শিত শিক্ষার অনুসরণ করেন। এটিই হলো সালাফিয়্যাহর ভিত্তি।

আমাদের দাওয়াহ
সুন্নাহ

সুন্নাহ হলো নবী (ﷺ) ও তাঁর সাহাবাদের পথ। যিনি এই পথের অনুসরণ করেন তাকে সুন্নী বলা হয় এবং তিনি আহলুস-সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ’র অন্তর্ভুক্ত। মাঝেমধ্যে, শিয়া সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত নয় এমন কাউকে বুঝানোর জন্যও সুন্নী শব্দটি সাধারণভাবে ব্যবহৃত হয়। তবে, শুধু শিয়া না হওয়াটা কোনো ব্যক্তিকে পথভ্রষ্টতায় নিপতিত হওয়া থেকে বাঁচানোর জন্য যথেষ্ট নয়।

আমাদের দাওয়াহ
আস-সালাফ আস-সালেহ

আস-সালাফ আস-সালেহ হলেন মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর সাহাবা ও তাঁদের পরবর্তী তিন প্রজন্ম। তাদেরকে আহলুস-সুন্নাহ ওয়াল-জামা’আহ, আস-সালাফ,আছহাবুল-হাদীস এবং আহলুল-হাদীসও বলা হয়। যে ব্যক্তি তাঁদের পথকে কবুল করেন এবং তাঁদের আক্বীদাহ, মানহাজ ও দীনকে অবিকল অনুসরণ করেন, তিনি প্রকৃত হিদায়াতের উপর প্রতিষ্ঠিত।

আমাদের দাওয়াহ
সালাফিয়্যাহ

সালাফিয়্যাহ হলো ইসলাম ও সুন্নাহ অনুসরণের প্রকৃত পথ। একজন সালাফী হচ্ছেন সেই ব্যক্তি, যিনি অবিকল কোনো পরিবর্তন ছাড়াই সালাফে-সালেহীনের পথকে অনুসরণ করেন।

আমাদের দাওয়াহ
সুন্নী

সুন্নী, আহলুস-সুন্নাহ ওয়াল-জামাআহ, আছহাবুল-হাদীস এবং আহলুল-হাদীস এই সবই সমার্থক উপাধি । এই উপাধিগুলো একই পথের অনুসারী একটি দলকে বুঝায়। যাইহোক, যারা এই উপাধিগুলোকে ব্যবহার করে, তাদের প্রত্যেকেই প্রকৃত অর্থে নিজ দাবির অনুগামী নন। প্রকৃত অর্থে, বেশিরভাগ মানুষ, যারা এই উপাধিগুলোর সাথে নিজেকে যুক্ত করে তারা সালাফে-সালেহীনের আক্বীদাহ ও মানহাজের বিরোধিতা করে। একজন নিছক দাবিদার ও একজন প্রকৃত অনুসারীর মাঝে পার্থক্য স্থাপন করাই এই অনুচ্ছেদের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।

আমাদের দাওয়াহ

Discover more from Markaz Al-Imam At-Tahawee Foundation

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading