ইমাম আবূ হানীফা ও তাঁর ছাত্রগণ আহলুস সুন্নাহ এবং সালাফে সালেহীনের আক্বীদার উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন।
মুহাক্কিক আলেমগণ সকলেই একমত যে, ইমাম আবূ হানীফা (মৃ. ১৫০হি) এবং তার দুই সহচর আবূ ইউসুফ ইয়াক্বূব ইবনু ইবরাহীম আল-আনসারী (মৃ. ১৮২হি) এবং মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান আশ-শায়বানী (মৃ. ১৮৯হি) এবং অনুরূপভাবে আবূ জা‘ফার আত-তাহাওয়ী (মৃ. ৩২১হি) সকলেই সালাফী আক্বীদার উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। তাই ঐ সময়কার আহলুস সুন্নাহর অন্যান্য বিশিষ্ট উলামা ও ইমামদের মতো তারাও সাধারণভাবে এই উম্মতের সালাফদের অন্তর্ভুক্ত।
কিন্ত পরবর্তীতে, বিদআতী ফিরকার হানাফীরা দাবি করতো যে এই আলেমরা কুরআন মাখলূক্ব হওয়ার ব্যাপারে বা আল্লাহর উলূ অস্বীকার করার মতো বাতিল আক্বীদার উপর একমত ছিলেন, কিন্তু এসবই ছিল বিদআতী ও পথভ্রষ্ট সম্প্রদায় কর্তৃক ইসলামের আলেমদের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার যেন তাদের বিদআতকে তারা চাকচিক্যময় ও আকর্ষণীয় করে মানুষের কাছে প্রচার করতে পারে।
সুন্নাহ ও হাদীসের আলেমরা ইমাম আবূ হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ) সম্পর্কে বেশ কিছু বিষয় উল্লেখ করেছেন যার মধ্যে কুরআন সৃষ্ট বলার বিষয়টি ছিল অন্যতম। তবে তারা এটিও উল্লেখ করেছেন যে, তাকে এত্থেকে তাওবাহ করতে বলা হয়েছিল, এবং তাওবাহ করার পর তিনি বিশুদ্ধ আক্বীদার উপর অবিচল ছিলেন, যা এই ইমাম থেকে প্রত্যাশিত ছিল। একারণে আহলুস সুন্নাহর বহু আলেম তাকে (কুরআন সৃষ্ট বলার) আক্বীদাহ থেকে মুক্ত বলে ঘোষণা দিয়েছেন, তাদের অন্যতম ছিলেন ইমাম আহমাদ (রাহিমাহুল্লাহ)।
দেখুন: আব্দুল্লাহ বিন ইমাম আহমাদের কিতাবুস সুন্নাহ (১/১৯২-১৯৪), আল-খাতীবের তারীখ বাগদাদ (১৩/৩৮৩-৩৯৩) এবং (১৩/৩৮৪), এছাড়াও আল-মু’আল্লিমীর আত-তানকীল (১/৪৪৯), এবং ইবনু আবিল ইয্ এর শারহ আত-তাহাওয়িয়্যাহ (পৃ. ২৪৪) এবং মুখতাসার আল-উলূ (পৃ. ১৫৫-১৫৭)।
আর শাইখ আল-আলবানী মুখতাসার আল-উলূ গ্রন্থে বলেছেন যে, ইমাম আবূ হানীফা সম্পর্কে এ বিষয়ে অর্থাৎ কুরআন সৃষ্ট বলার ব্যাপারে যা কিছু বর্ণিত হয়েছে তার বেশিরভাগই সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়, আর যদি এই বিষয়ে কোনো সত্যতা থেকেও থাকে তবে তা সেই সময়ের ঘটনা যখন এই বিষয় নিয়ে তাঁর ছাত্র আবূ ইউসুফ তাঁর সাথে বিতর্ক করেনি, যার পর থেকে তিনি এই বিশ্বাস পোষণ করতেন যে কুরআন সৃষ্ট নয়।
আলী বিন আল-হাসান আল-কুরায়ী থেকে একটি জায়্যিদ সনদের মাধ্যমে আয-যাহাবী বর্ণনা করেছেন, যেমনটি মুখতাসার আল-উলূ (পৃ. ১৫৫) গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেছেন: আবূ ইউসুফ বলেছেন:
আমি আবূ হানীফার সাথে ছয় মাস বিতর্ক করেছি, অতঃপর আমরা এই বিষয়ে একমত হতে পেরেছি যে: যেই ব্যক্তি বলবে কুরআন সৃষ্ট, সে কাফির।
এবং আল-বায়হাক্বী এটি আব্দুল্লাহ ইবনু আহমাদ ইবনি আব্দির-রহমান ইবনি আব্দিল্লাহ আদ-দুশতাকী থেকে আল-আসমা ওয়াস-সিফাত গ্রন্থেও বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন: “আমি আবূ ইউসুফকে বলতে শুনেছি .. ”, তারপর তিনি এটি (উপরিউক্ত বিষয়টি) বর্ণনা করলেন অতঃপর তিনি (আল-বায়হাক্বী) বললেন: “আবূ আব্দিল্লাহ (অর্থাৎ আল-হাকিম) বলেছেন, “এর বর্ণনাকারীগণ সকলেই বিশ্বস্ত (সিক্বাহ)।”
এছাড়াও, ইমাম আবূ হানীফা এবং আবূ ইউসুফ থেকে অসংখ্য বর্ণনা পাওয়া যায় যা প্রমাণ করে যে আক্বীদাগত বিষয়ে তারা স্পষ্টতভাবে সালাফী মানহাজের অনুসারী ছিলেন। কেবল ইমানের বিষয়ে (তাঁর আক্বীদাহ) নিয়ে সংশয় থাকতে পারে, কারণ তাঁর থেকে এটি বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেছেন: “ইমান হলো অন্তরের “তাসদীক্ব” (সম্মতি, বিশ্বাস) এবং মুখের স্বীকারোক্তি কিন্তু আমল ইমানের গণ্ডির বাইরের বিষয়” – যা এক প্রকারের ইরজা [ইমান থেকে আমলকে বের করে দেওয়া]। তবে, দুই ইমাম অর্থাৎ আবূ হানীফা (মৃ. ১৫০হি) এবং হাম্মাদ বিন যাইদের (মৃ. ১৭৯হি) মাঝে একটি আলোচনা হয়েছিল যেটি আবূ জা‘ফার আত-তাহাওয়ী বর্ণনা করেছেন যা ইঙ্গিত করে যে তিনি (ইমাম আবূ হানীফা) উক্ত আক্বীদাহ থেকে ফিরে এসেছিলেন।
দেখুন: ইবনু আব্দিল বার কর্তৃক আত-তামহীদ (৯/২৪৭), ইবনু আবিল ইয্ কর্তৃক শারহ আত-তাহাওয়িয়্যাহ (পৃ. ৩৯৫)।
হানাফীদের বিভক্তি ও বিচ্যুতি
দুঃখজনক হলেও সত্য যে হানাফীদের মাঝে অনেকেই ইমাম আবূ হানীফা ও তাঁর ছাত্রদের মানহাজ অনুসরণ করে নি। প্রাথমিক পর্যায়েই তাদের ভিতরে বহু ভ্রান্ত আক্বীদাহ প্রবেশ করেছিল, যেগুলো এই ইমামের জীবদ্দশার কাছাকাছি সময়ে আবির্ভূত হয়েছিল, এবং তারা নিজেরাই ভ্রষ্টতা এবং বিচ্যুতির দিকে আহ্বানকারী হয়ে উঠেছিল এবং বিদআত ও প্রবৃত্তির অনুসারীদের প্রধান হয়ে উঠেছিল। তাদের মাঝে বেশ কিছু ফিরকার উদ্ভব হয়েছিল। নিম্নে তাদের ব্যাপারে সংক্ষিপ্তভাবে উল্লেখ করা হলো:
- হানাফিয়্যাহ জাহমিয়্যাহ
- হানাফিয়্যাহ মু‘তাযিলাহ
- হানাফিয়্যাহ মুরজিয়াহ
- হানাফিয়্যাহ শিয়া
- হানাফিয়্যাহ যাইদিয়্যাহ
- হানাফিয়্যাহ কাররামিয়্যাহ মুশাব্বিহাহ
- হানাফিয়্যাহ মারীসিয়্যাহ
- হানাফিয়্যাহ সুফিয়্যাহ বা মুতাসাওয়্যিফাহ এবং এর অধীনে চারটি তরিক্বাহ আছে:
- ক্বাদিরিয়্যাহ
- চিশ্তিয়্যাহ
- সোহরাওয়ার্দিয়্যাহ
- নাক্বশাবান্দিয়্যাহ
- এছাড়াও তাদের মাঝে হুলূল এবং ইত্তিহাদী আক্বীদার অনুসারীও আছে, যারা পথভ্রষ্ট চরমপন্থি যিন্দীক্ব।
- হানাফিয়্যাহ ক্বুবূরিয়্যাহ (কবর-পূজারী), যাদের মধ্যে বেরেলভী, কাওসারী এবং কিছু দেওবন্দী আছে।
- হানাফিয়্যাহ মাতুরীদিয়্যাহ
এবং সর্বশেষ তিনটি ফিরকার মাঝে একটি যোগসূত্র আছে কেননা উল্লিখিত বিষয়গুলোর পাশাপাশি, মাতুরীদী আক্বীদাহ, তাসাওউফ ও কবর-পূজা তাদের মাঝে সাধারণভাবে বিদ্যমান। তবে, উপরিউক্ত ছকটির মূল উদ্দেশ্য হলো বিভিন্ন ফিরকার পার্থক্যগুলোকে আলাদাভাবে তুলে ধরা।
আর এইভাবে ইমাম আবূ হানীফার (রাহিমাহুল্লাহ) সাথে নিজেদেরকে সংযুক্তকারী এবং তাঁর অনুসারী হওয়ার দাবিদারদের অনেকেই যেমন নির্দিষ্টভাবে তাঁর মানহাজ থেকে বিচ্যুত হয়েছে, তেমনিভাবে তারা সাধারণভাবে এই উম্মতের সালাফদের মানহাজ থেকে বিচ্যুত হয়েছে, এবং তারা বিভিন্ন দলে-উপদলে বিভক্ত হয়েছে, এমনকি যা হানাফী মাতুরীদী সহ খোদ কাওসারীরা (পথভ্রষ্ট যাহিদ আল-কাওসারী’র অনুসারীরা) এটি পূর্ণরূপে স্বীকার করেছে। যারা ইমাম আবূ হানীফা ও তাঁর সহচরদের মানহাজের অনুসরণ করেছেন তাদেরকে বলা হতো “হানাফিয়্যাহ সুন্নিয়্যাহ” বা “হানাফিয়্যাহ সালাফিয়্যাহ” বা “হানাফিয়্যাহ কামিলাহ” এবং এগুলো সবই ছিল আল-আল্লামাহ আব্দুল হাই আল-লাকনভীর (একজন হানাফী আলেম, মৃ. ১৩০৪হি) দেওয়া উপাধি।
দেখুন: আল-আল্লামাহ আব্দুল হাই আল-লাকনভীর “আর-রাফ ওয়াত-তাকমীল” (পৃ. ১৭৮-১৮০, তাহক্বীক্ব আবী গুদ্দাহ, ১ম সংস্করণ, ১৩৭৩হি) এবং তৃতীয় বৃহত্তর সংস্করণের (পৃ. ৩৮৫-৩৮৭) (তাহক্বীক্ব আবী গুদ্দাহ আল-কাওসারী, ১৪০৭হি)।
এই নিবন্ধটির জন্য দেখুন:
- সামান্য অভিযোজন সহকারে: শামসুদ্দীন আল-আফগানীর “আল-মাতুরীদিয়্যাহ” (১/১৯৩-১৯৯)।
গুরুত্বপূর্ণ দ্রষ্টব্য: আশআরী এবং মাতুরীদী আক্বীদার অনেক বিদআতী আছে যারা এমন লোকদের আক্বীদাগত বিচ্যুতিকে ব্যবহার করে আহলুস সুন্নাহ এবং সালাফে সালেহীনদের আক্রমণ করে, যেসব লোকেরা ইমাম আহমাদ বিন হাম্বালের পরে আবির্ভূত হয়েছে এবং ইমাম আহমাদ বিন হাম্বালের সাথে নিজেদেরকে সংযুক্ত করেছে। এই বাস্তবতাটি অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে, ইমাম আহমাদের পরবর্তীতে, হাম্বালীদের মাঝে সাধারণভাবে যেসব বিচ্যুতি প্রকাশ পেয়েছিল, তা আলহামদুলিল্লাহ, ঐসকল বিচ্যুতির তুলনায় খুবই সামান্য ও নগণ্য ছিল যেসব বিচ্যুতি ইমাম আবূ হানীফা, ইমাম মালিক এবং ইমাম আশ-শাফিয়ী (রাহিমাহুমুল্লাহ)-এর তথাকথিত অনুসারীদের মাঝে বিদ্যমান ছিল। এ বিষয়টি ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত। তবে, ঐ সকল লোক যারা ইমাম আহমাদ বিন হাম্বালের আক্বীদাহ থেকে বিচ্যুত হয়েছিল তাদেরকে ব্যবহার করে আশআরী এবং মাতুরীদী আক্বীদার অনুসারীরা সাধারণভাবে হাম্বালীদের উপরে এবং নির্দিষ্ট করে সালাফী আক্বীদার উপরে আক্রমণ করে। সত্যি বলতে, এই বিষয়টির জন্যে একটি পৃথক নিবন্ধের প্রয়োজন, কিন্তু এখানে এটি উল্লেখ করা বাঞ্চনীয় কেননা এই নিবন্ধের বিষয়বস্তুর সাথে তা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। উদাহরণস্বরূপ, আল-ক্বাদ্বী আবূ ইয়া’লা (মৃ. ৪৫৮হি), এবং আবূল হাসান ইবনু আল-যাগূনী (মৃ. ৫২৭হি) উভয় কুল্লাবী মতবাদ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন যেখানে আল্লাহর সিফাত ফি’লিয়্যাহ সংক্রান্ত কিছু বিষয়কে হাওয়াদীস বলে নাকচ করা হয়েছে যা তাদের বক্তব্যে তারা উল্লেখ করেছেন এবং তারা জিসম, জিহাহ ইত্যাদির ন্যায় তা’তীলের পরিভাষা দ্বারাও প্রভাবিত হয়েছিলেন। যদিও এটি সাধারণভাবে ইমাম আহমাদ ও হাম্বালী মাযহাবের মানহাজ না, তবে অজ্ঞ ও নিরীহ লোকদেরকে প্রতারিত করার উদ্দেশ্যে এবং তাদের নিজস্ব মতবাদগুলোকে শক্তিশালী ও প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে বিদআতীরা এই বিষয়গুলোকে ব্যবহার করেছে। তারা এই পদ্ধতিটি অনুসরণ করে কারণ তাদের মতবাদগুলো নিজ যোগ্যতায় প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না, তাই গুজব ছড়িয়ে তাদের মতবাদগুলোকে তারা প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করে। এর একটি চমৎকার উদাহরণ হলো ইবনুল জাওযী এবং তাঁর লেখার সাথে তাদের সংযুক্তি – আর সেটি পৃথক নিবন্ধের আলোচ্য বিষয়।
Share this:
- Share on X (Opens in new window) X
- Share on Facebook (Opens in new window) Facebook
- Email a link to a friend (Opens in new window) Email
- Share on Pinterest (Opens in new window) Pinterest
- Share on Telegram (Opens in new window) Telegram
- Share on WhatsApp (Opens in new window) WhatsApp
- Print (Opens in new window) Print
- Share on LinkedIn (Opens in new window) LinkedIn
- Share on Tumblr (Opens in new window) Tumblr

















