যিকিরের ফযীলত

ইলমী দৃষ্টিকোণ থেকে যিকিরের অর্থ হলো অন্তর দিয়ে আল্লাহর স্মরণ করা, অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ও জিহ্বা দিয়ে আমল করা, তাঁর আনুগত্যমূলক কাজ করা এবং তাঁর অবাধ্যতামূলক গর্হিত কাজ থেকে দূরে থাকা; এবং এটি জিহ্বা নাড়ানো পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়, যেমনটি কিছু লোকেরা মনে করে।

আল্লাহর যিকির হলো সেটিই যা শব্দ, বিন্যাস, ধরন এবং পদ্ধতিগতভাবে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বিশুদ্ধ সুন্নাহ, তাঁর সাহাবা এবং সালাফগণের বুঝ ও আমল দ্বারা সুনির্দিষ্ট। ইমাম ইবনুল ক্বাইয়্যিম আল-জাওযিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন: যিকিরের মধ্যে একশটিরও বেশি উপকারিতা রয়েছে; তন্মধ্যে:

[০১] — এটি শয়তানকে বিতাড়িত করে, তাকে বশীভূত করে এবং তাকে পরাস্ত করে।

[০২] — এটি আর-রহমানকে (তিনি পরাক্রমশালী এবং মহিমান্বিত) সন্তুষ্ট করে।

[০৩] — এটি ব্যক্তির অন্তর থেকে উদ্বেগ ও দুশ্চিন্তা দূর করে।

[০৪] — এটি অন্তরে প্রশান্তি, আনন্দ ও প্রফুল্লতা নিয়ে আসে।

[০৫] — এটি অন্তর ও শরীরকে শক্তিশালী করে।

[০৬] — এটি ব্যক্তির মুখমণ্ডল এবং অন্তরকে আলোকিত করে।

[০৭] — এটি ব্যক্তির রিযিক আনয়ন করে।

[০৮] — এটি সেই (যিকিরকারী) ব্যক্তিকে সম্মানের পোশাকে আবৃত করে এবং তাকে প্রফুল্ল ও সতেজ রাখে।

[০৯] — এটি আল্লাহর ভালোবাসা (আল-মাহাব্বাহ) পাওয়ার কারণ, যা ইসলামের চালিকাশক্তি এবং সেই ভিত্তি যার উপর পুরো দীন নির্ভরশীল, এবং এর উপর ব্যক্তির কল্যাণ এবং পরিত্রাণ নির্ভরশীল … কারণ আল্লাহ তাআলা প্রতিটি জিনিসের জন্য একটি কারণ সৃষ্টি করেছেন, এবং তাঁর সার্বক্ষণিক স্মরণই হলো সেই কারণ, যার মাধ্যমে তাঁর ভালোবাসা অর্জিত হয়। সুতরাং যে ব্যক্তি মহান আল্লাহর ভালোবাসা পেতে চায়, সে যেন আল্লাহর স্মরণে নিবেদিত হয়। সুতরাং লেখাপড়া করা এবং তা অনুশীলন করা যেমন ইলম অর্জনের দরজা, তেমনিভাবে আল্লাহর স্মরণ হলো আল্লাহর ভালোবাসা (মাহাব্বাহ) পাওয়ার দরজা এবং এটিই হলো শ্রেষ্ঠ ও সরলতম পথ যা সেদিকে পরিচালিত করে।

[১০] — যিকিরের মাধ্যমে ব্যক্তি তার রবের ব্যাপারে এতটাই সজাগ ও সচেতন হয়ে ওঠে যে, সেটি তাকে আল-ইহসানের (ইসলাম ও ইমানের পরে কোনো ব্যক্তির দ্বারা যেই সর্বোচ্চ স্তরটিতে পৌঁছানো সম্ভব – সর্বোত্তম উপায়ে আল্লাহর ইবাদত করা) স্তরে পৌঁছে দেয়। সে এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করে যেন সে তাঁকে দেখছে। আর গাফেল ব্যক্তি যে আল্লাহর স্মরণে অবহেলা করে সে কখনো আল-ইহসানের স্তরে পৌঁছাতে পারে না, যেমনিভাবে বসা অবস্থায় কোনো ব্যক্তি তার গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে না।

[১১] — এটি ব্যক্তিকে আল্লাহর দিকে ইনাবাহ করার (অনুশোচনাভরে আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়ার) প্রেরণা দেয়। যখনই কোনো ব্যক্তি আল্লাহর স্মরণের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত আল্লাহর কাছে ফিরে যায়, তখন সে সত্যিকার অর্থে পূর্ণ আন্তরিকতার সহিত আল্লাহর কাছে ফিরে যায়, এমনকি (জীবনের) প্রতিটি ক্ষেত্রে সে এক আল্লাহর কাছে আশ্রয় ও পরিত্রাণ চাইতে থাকে। এমনকি বিপদ থেকে উদ্ধার চাওয়া ও নিরাপত্তা লাভের জন্য সে এক আল্লাহরই কাছে দ্বারস্থ হয়। তার অন্তর এক আল্লাহর দিকেই ধাবিত হয় এবং যে কোনো দুর্যোগ বা বিপদাপদের সময় সে এক আল্লাহর কাছেই পলায়ন করে।

[১২] — এটি তাঁর নৈকট্য লাভের মাধ্যম, তাই বান্দা যত বেশি মহান আল্লাহর স্মরণ করবে সে তত বেশি তাঁর নিকটবর্তী হবে। পক্ষান্তরে, বান্দা যত বেশি আল্লাহর স্মরণে গাফেল ও উদাসীন হবে, সে তাঁর থেকে তত বেশি দূরে থাকবে।

[১৩] — এটি (আল্লাহর স্মরণ) তার জন্য ইলম ও মা‘আরিফাতের দরজাসমূহ হতে একটি বিশাল দরজা উন্মুক্ত করে দেয়। সে যত বেশি আল্লাহর স্মরণ করে, তার ইলম ও মা’আরিফাত তত বৃদ্ধি পায়।

[১৪] — এটি ব্যক্তির ভিতরে আল-হাইবাহ (তার সুমহান রব সম্পর্কে ভয় ও বিস্ময়বোধ) সঞ্চার করে যা তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মানবোধ জাগ্রত করে। এর কারণ হলো আল্লাহর স্মরণ তার অন্তরে পরিপূর্ণ আধিপত্য বিস্তার করে যার ফলে সে মহান আল্লাহর উপস্থিতি সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠে যা গাফেল ব্যক্তির বিপরীত, কারণ তার অন্তরে শ্রদ্ধা ও সম্মানের পর্দা হয় অত্যন্ত ক্ষীণ (অর্থাৎ তার রবের প্রতি তার বিস্ময় ও শ্রদ্ধাবোধ খুবই কম হয়)।

[১৫] — বান্দা যখন মহান আল্লাহর স্মরণ করে তখন মহান আল্লাহ তাঁর বান্দার স্মরণ করেন, যেমন মহান আল্লাহ বলেছেন:

فَٱذْكُرُونِىٓ ‬أَذْكُرْكُمْ

অর্থ: “অতএব তোমরা আমার স্মরণ করো, আমিও তোমাদের স্মরণ করব।” — সূরা আল-বাক্বারাহ (২:১৫২)

যদি এই ফায়দা ব্যতীত যিকিরের অন্য কোনো ফায়দা নাও থাকত, তবে আল্লাহকে স্মরণ করার শ্রেষ্ঠত্ব ও মাহাত্ম্য বর্ণনায় এটুকুই যথেষ্ট হতো। যেমনটি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর মহান রব থেকে বর্ণনা করেছেন, আল্লাহ বলেছেন: “যে ব্যক্তি তার নাফসে আমার স্মরণ করবে, আমি আমার নাফসে তার স্মরণ করব আর যে ব্যক্তি কোনো মজলিসে আমার স্মরণ করবে আমি তার চেয়েও উত্তম মজলিসে তার স্মরণ করব।”[১]

[১৬] — আল্লাহর স্মরণ অন্তরকে প্রাণবন্ত করে এবং আমি শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহকে (রাহিমাহুল্লাহ) বলতে শুনেছি: ‘অন্তরের জন্য (আল্লাহর) স্মরণ হলো মাছের জন্য পানির মতো, অতএব মাছকে পানি থেকে বের করা হলে তার অবস্থা কী হয়?’

[১৭] — আল্লাহর স্মরণ হলো অন্তর ও রুহের খোরাক, তাই কোনো বান্দা যদি আল্লাহকে স্মরণ করতে ভুলে যায়, তাহলে সে এমন একটি দেহে পরিণত হয় যাকে খাদ্য থেকে বিরত রাখা হয়েছে।

একদিন ফজরের নামাযের পরে আমি[২] শাইখ ইবনু তাইমিয়্যার নিকটে উপস্থিত ছিলাম। তিনি প্রায় দুপুর পর্যন্ত মহান আল্লাহর স্মরণে মশগুল ছিলেন; অতঃপর তিনি (যিকির শেষ করে) আমার দিকে ফিরলেন এবং বললেন: “এটি ছিল আমার সকালের খাবার; আমি যদি সকালের খাবার গ্রহণ না করি, তাহলে আমি দুর্বল হয়ে পড়ব” (বা এর খুব কাছাকাছি শব্দে বর্ণিত হয়েছে)। একবার তিনি (শাইখ ইবনু তাইমিয়্যাহ) আমাকে বললেন: “একাগ্রতা ও বিশ্রামের উদ্দেশ্য ব্যতীত আমি কখনই আল্লাহর স্মরণ থেকে বিমুখ হই না; কারণ বিশ্রামের দ্বারা আমি আল্লাহর স্মরণের জন্য আরও প্রস্তুতি নিতে পারি” (বা এর খুব কাছাকাছি শব্দে বর্ণিত হয়েছে)।

[১৮] — এটি অন্তরের মরিচা বা দাগ দূর করে একে মসৃণ করে তুলে, আর অন্তরের দাগ (অর্থাৎ গুনাহের কারণে অন্তরে যে দাগ পড়ে) পরিচ্ছন্ন করার বিষয়টি আত-তিরমিযীর হাদীসে ইতঃপূর্বে বর্ণিত হয়েছে, কারণ সবকিছুর উপরেই মরিচা পড়ে বা তা বিবর্ণ হয় আর অন্তরের মরিচা হলো আল-গাফলাহ (অবহেলা ও গাফিলতি) এবং আল-হাওয়া (প্রবৃত্তি)। এবং অন্তরকে পরিষ্কার ও মসৃণ রাখার উপায় হলো আয-যিকির (আল্লাহর স্মরণ) এবং আত-তাওবাহ (তাঁর কাছে অনুতপ্ত হওয়া) এবং ইস্তিগফার (তাঁর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করা)।

[১৯] — আল্লাহর স্মরণ পাপ মোচন করে এবং পাপ থেকে মুক্তি দেয় কারণ এটি সবচেয়ে উত্তম নেক আমলগুলোর অন্যতম; আর ভালো কাজ মন্দ কাজগুলোকে মিটিয়ে দেয়।

[২০] — এটি বান্দা এবং তার সুমহান রবের মাঝে বিচ্ছিন্নতা দূর করে, কারণ গাফেল এবং উদাসীন ব্যক্তি এমনই হয় যে তার এবং মহান আল্লাহর মাঝে বিচ্ছিন্নতা আছে। আর এটি আল্লাহর স্মরণ ব্যতীত দূর করা সম্ভব নয়।

[২১] — বান্দা তার মহান প্রতিপালকের প্রতি সম্মান, শ্রদ্ধা ও বিস্ময় প্রদর্শনের নিয়তে যা কিছু উচ্চারণ করে বা বলে যেমন, যদি সে বলে: ‘সুবহানাল্লাহ’ (আল্লাহ পূতপবিত্র। তিনি সকল ত্রুটি থেকে মুক্ত), এবং: ‘আলহামদুলিল্লাহ’ (সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য); এই আমলগুলোর কারণে ব্যক্তিকে তার কষ্টের সময়ে স্মরণ রাখা হয়। সে পূর্বে যেসব যিকির করেছে, সেজন্য তার কষ্টের সময়ে তাকে স্মরণ রাখা হবে।

[২২] — বান্দা যদি স্বাচ্ছন্দ্যের সময়ে আল্লাহকে চেনে, তাঁর ব্যাপারে সচেতন হয় এবং তাঁকে স্মরণ করে, তবে আল্লাহ তার কষ্টের সময় তাকে চিনবেন এবং স্মরণ করবেন।

[২৩] — মহান আল্লাহর স্মরণ আল্লাহর শাস্তি থেকে উদ্ধার পাওয়ার কারণ। যেমনটি মুআয (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) বলেছেন। এটি নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকেও বর্ণিত হয়েছে: “আল্লাহর যিকির অপেক্ষা এমন কোনো আমল নেই যা আল্লাহর আযাব থেকে অধিক মুক্তিদানকারী।”[৩]

[২৪] — এটি আস-সাকীনাহ (প্রশান্তি) এবং আর-রাহমাহ (আল্লাহর রহমত) দ্বারা আবৃত হওয়ার কারণ, এবং সেই ব্যক্তির ফেরেশতাদের দ্বারা পরিবেষ্টিত হওয়ারও কারণ যে তার রবের যিকির রত অবস্থায় আছে, ঠিক যেমনটি মুসলিমের বর্ণিত হাদীসে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের জানিয়েছেন।[৪]

[২৫] — এটি বান্দাকে এমন কিছুতে ব্যস্ত রাখে যা তাকে গীবত, পরনিন্দা, মন্দ, অশ্লীল এবং অনর্থক কথাবার্তা থেকে বিরত রাখে কারণ এটি জানা কথা যে বান্দাকে অবশ্যই কথা বলতে হবে, তাই সে যদি আল্লাহর স্মরণে ব্যস্ত না থাকে এবং তিনি যা আদেশ করেছেন সে অনুযায়ী কথা না বলে, তাহলে এর পরিবর্তে সে অবশ্যই হারাম কথাবার্তা বলবে। মহান আল্লাহর স্মরণ ও তাঁর সুমহান নাম নেওয়া ব্যতীত এত্থেকে নিরাপদে থাকার কোনো উপায় নেই। আর আমরা যা দেখেছি এবং উপলব্ধি করেছি সেসবই এর সত্যতার সাক্ষী, কারণ যে ব্যক্তি তার জিহ্বাকে আল্লাহর স্মরণে অভ্যস্ত করে, তার জিহ্বা অসার, অনর্থক ও অশ্লীল কথাবার্তা থেকে রক্ষা পায়।

আর যে ব্যক্তির জিহ্বা মহান আল্লাহর স্মরণে অভ্যস্ত না থাকার কারণে শুকিয়ে যায় — তাহলে তা সব ধরনের অনর্থক, অসার ও মন্দ কথাবার্তায় লিপ্ত হয়; আল্লাহ ব্যতীত কোনো শক্তি বা ক্ষমতার উৎস নেই।

[২৬] — যে মজলিসে আল্লাহর নাম উচ্চারিত হয় এবং তাঁকে স্মরণ করা হয় তা হলো ফেরেশতাদের মজলিস, আর অনর্থক কথাবার্তা ও গাফিলতির মজলিস হলো শয়তানদের মজলিস। তাই এই দু’য়ের মাঝে বান্দা সেটিই বেছে নিক যা তার নিকট সর্বাধিক প্রিয় এবং যেটির হক তার উপর সবচাইতে বেশি। এবং এরই ভিত্তিতে সে দুনিয়া ও আখেরাতে সেই লোকদের দলভুক্ত হবে।

[২৭] — যে ব্যক্তি আল্লাহর স্মরণ করে, এটি তার আনন্দ ও কল্যাণের কারণ হয় এবং একইভাবে তার সাহচর্যে থাকা ব্যক্তিদের আনন্দ ও কল্যাণের কারণ হয়। সুতরাং, সেই ব্যক্তি যেখানেই থাকে সে বরকতের অধিকারী হয়; অথচ যে ব্যক্তি উদাসীন ও গাফেল এবং যে অনর্থক কথাবার্তায় লিপ্ত হয় সে হয় হতভাগা এবং তার সাহচর্যে থাকা লোকদের উপর সে দুঃখ-কষ্ট নিয়ে আসে।

[২৮] — এটি কিয়ামতের দিন বান্দাকে অনুশোচনা থেকে রক্ষা করবে কারণ বান্দা যদি কোনো মজলিসে তার মহান রবের স্মরণ না করে তবে সেই মজলিসটি কিয়ামতের দিন তার অনুশোচনা ও দুঃখের কারণ হবে।

[২৯] — আল্লাহর স্মরণের পাশাপাশি গোপনে কাঁদা, সেদিন মহান আল্লাহর (আরশের নিচে) স্থান পাওয়ার কারণ হবে যেদিন (সূর্যের) তাপ সবচেয়ে বেশি হবে। যে ব্যক্তি আল্লাহর স্মরণ করবে তাকে আল্লাহর আরশের ছায়ায় স্থান দেওয়া হবে; যেখানে বাকি মানুষেরা সূর্যের তাপের মধ্যে থাকবে, যা তাদের দাঁড়ানোর স্থানে তাদেরকে ঝলসে দেবে সেখানে আল্লাহর স্মরণকারী ব্যক্তি আর-রহমানের (তিনি পরাক্রমশালী ও মহিমান্বিত) আরশের ছায়ায় স্থান পাবে।

[৩০] — আল্লাহর স্মরণে নিজেকে ব্যস্ত রাখা এমন একটি কারণ যার মাধ্যমে আল্লাহ ঐ ব্যক্তিকে সর্বোত্তম নেয়ামতগুলো দান করেন যা তিনি তাদেরকে দেন যারা তাঁর নিকট প্রার্থনা করে।

[৩১] — অন্যান্য ইবাদতের তুলনায় সহজ হওয়ার পাশাপাশি এটি সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বোত্তম ইবাদত, কারণ অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের চেয়ে জিহ্বা নড়াচড়া করা অনেক সহজ। যদি ব্যক্তিকে তার শরীরের অন্যান্য অঙ্গগুলোকে জিহ্বা নাড়ানোর মতো সার্বক্ষণিক নাড়াতে হতো, তবে সেটি তার জন্য অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ হতো; বরং, সেটি তার পক্ষে সম্ভবই হতো না।

[৩২] — মহান আল্লাহকে স্মরণ করার কারণে তার জন্য জান্নাতে গাছ রোপণ করা হয়। আত-তিরমিযী (রাহিমাহুল্লাহ) তাঁর “সুনান আল-জামি’’ গ্রন্থে আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) থেকে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন: আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:

“ইসরা ওয়াল মি‘রাজের রাতে আমি ইবরাহীম: আল-খালীলের (আল্লাহর অন্তরঙ্গ বন্ধু) সাথে সাক্ষাৎ করেছি। তিনি বলেছেন: হে মুহাম্মাদ! আপনার উম্মতের কাছে আমার সালাম পৌঁছিয়ে দিন এবং তাদেরকে জানিয়ে দিন যে, নিশ্চয়ই জান্নাতের মাটি পবিত্র ও উৎকৃষ্ট এবং সেখানকার পানি অত্যন্ত সুস্বাদু, এবং সেটি একটি সমতল ভূমি এবং [সুবহানাল্লাহ, ওয়াল-হামদুলিল্লাহ, ওয়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াল্লাহু আকবার] বাক্যগুলোর দ্বারা তার গাছপালা উদগত হয়।”[৫]

জাবির থেকে বর্ণিত হাদীসে আবূ যুবায়ের বলেছেন, যেভাবে আস-সুনান আত-তিরমিযীতে বর্ণিত আছে যে, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: “যে ব্যক্তি বলে:

سُبْحَانَ ‬ﷲِ ‬الْعَظِيمِ ‬وَبِحَمْدِ

‘আল্লাহ কতই না পূতপবিত্র, তিনি সুমহান, তাঁর জন্যই সকল প্রশংসা।’ তার জন্য জান্নাতে একটি খেজুর গাছ রোপণ করা হয়।”[৬]

[৩৩] — আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর স্মরণকারী ব্যক্তিকে যেসব পুরস্কার ও অনুগ্রহ প্রদান করা হয়, সেগুলো আল্লাহর স্মরণ ব্যতীত অন্য কোনো আমলের জন্য প্রদান করা হয় না, যেমনটি আবূ হুরাইরা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বুখারী ও মুসলিমের হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: “যে ব্যক্তি ১০০ বার বলে:

لاَ ‬إِلَهَ ‬إِلاَّ ‬اللَّهُ ‬وَحْدَهُ ‬لاَ ‬شَرِيكَ ‬لَهُ‏‏، ‬لَهُ ‬الْمُلْكُ ‬وَلَهُ ‬الْحَمْدُ ‬وَهُوَعَلَى ‬كُلِّ ‬شَىْءٍ ‬قَدِيرٌ

‘আল্লাহ ব্যতীত ইবাদতের উপযুক্ত সত্য কোনো মা’বূদ নেই, তিনি এক, তাঁর কোনো শরীক নেই। রাজত্ব তাঁর, এবং সমস্ত প্রশংসাও তাঁর, এবং তিনি সবকিছুর উপরে পূর্ণ ক্ষমতাবান’ – তার জন্য দশটি ক্রীতদাস মুক্ত করার সাওয়াব লেখা হয়, তার জন্য ১০০টি নেকী লেখা হয় এবং তার ১০০টি মন্দ কাজ মুছে ফেলা হয় এবং সেদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত সে শয়তানের কবল থেকে সুরক্ষিত থাকে এবং সেদিন তার চেয়ে উত্তম আমল আর কেউ করতে পারে না, তবে সেই ব্যক্তির কথা ভিন্ন যে তার চেয়েও বেশি আমল করে।”

এবং যে ব্যক্তি বলে:

سُبْحَانَ ‬ﷲِ ‬وَبِحَمْدِهِ

‘আল্লাহ পূতপবিত্র এবং তাঁর জন্যই সকল প্রশংসা।’ দিনে ১০০ বার তাহলে তার পাপসমূহ মুছে ফেলা হয়, যদিও তা সমুদ্রের ফেনারাশির সমপরিমাণও হয়।”[৭]

এবং ‘সহীহ মুসলিম’ গ্রন্থে আবূ হুরাইরা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেছেন: আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: আমার নিকট ‘সুবহানাল্লাহ’ (আল্লাহ পূতপবিত্র। তিনি সকল ত্রুটি থেকে মুক্ত), ‘আলহামদুলিল্লাহ’ (সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য), ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ (আল্লাহ ব্যতীত ইবাদতের উপযুক্ত সত্য কোনো মা‘বূদ নেই), এবং ‘আল্লাহু আকবার’ (আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ) বলা ঐসবের চেয়েও অধিক প্রিয় যেসবের উপর সূর্য উদিত হয়।”[৮]

এবং আস-সাওবান থেকে আত-তিরমিযী বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: “যে ব্যক্তি সকালে এবং সন্ধ্যায় বলবে:

رَضِيتُ ‬بِاﷲِ ‬رَبّاً، ‬وَبِالإِسْلَامِ ‬دِيناًّ، ‬وَبِمُحَمَّدٍ ‬نَبِيّاً

‘আমি আল্লাহকে আমার রব, ইসলামকে আমার দীন এবং মুহাম্মাদকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমার নবী হিসেবে সন্তুষ্ট চিত্তে গ্রহণ করেছি।’ তাহলে তাকে সন্তুষ্ট করা আল্লাহর পক্ষ থেকে অবধারিত হয়ে যাবে।”[৯]

উৎস:

ইমাম ইবনুল ক্বাইয়্যিম কর্তৃক আল-ওয়াবিল আস-সায়্যিব মিন আল-কালিম আত-তাইয়্যিব

পাদটীকা:


১. আবূ হুরাইরা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত হাদীস। দেখুন: বুখারী (নং ৭৪০৫) এবং মুসলিম (নং ২৬৭৫)।
২. অর্থাৎ: ইমাম ইবনুল ক্বাইয়্যিম (রাহিমাহুল্লাহ)।
৩. [প্রকাশক]: আত-তিরমিযী বর্ণনা করেছেন (নং ৩৩৭৭) এবং শাইখ আল-আলবানী সহীহ বলেছেন।
৪. [প্রকাশক]: দেখুন মুসলিম (নং ২৭০০)।
৫. ইবনু মাসঊদের একটি হাদীসের ভিত্তিতে আত-তিরমিযী (নং ৩৪৬২) বলেছেন এই হাদীসটি ‘হাসান গারীব’ । শাইখ আল-আলবানী ‘হাসান’ বলেছেন: দেখুন: ‘আস-সাহীহাহ’ (নং ১০৫)।
৬. আত-তিরমিযী (৫/৫১১) বলেছেন এই হাদীসটি ‘হাসান সহীহ’। শাইখ আল-আলবানী বলেছেন এই হাদীসটি ‘হাসান’। দেখুন ‘আস-সাহীহাহ’ (নং ৬৪)।
৭. বুখারী (নং ৩২৯৩) এবং মুসলিম (নং ২৬৯১) বর্ণনা করেছেন।
৮. মুসলিম (নং ২৬৯১) বর্ণনা করেছেন।
৯. আত-তিরমিযী (নং ৩৩৮৯) বর্ণনা করেছেন। [প্রকাশক]: হাদীসটি যঈফ, দেখুন শাইখ আল-আলবানীর ‘যঈফ আল-জামি’ (নং ৫৭৩৫); তবে আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)-এর হাদীসের সূত্রে সহীহ এবং শেষে একটি অতিরিক্ত বাক্য আছে: ‘…তার জন্য জান্নাত অবধারিত হয়ে যাবে।’ দেখুন আবূ দাঊদ (নং ১৫২৯) এবং ‘আস-সাহীহাহ’ (নং ৩৩৪)।

Support The Da'wah In Bangladesh

The Messenger (ﷺ) said: “And save yourselves from the hell fire even if it be with the piece of a date.”

Recent Posts

Recommended Readings

ইসলাম

ইসলাম হলো আদম (‘আলাইহিস সালাম) থেকে মুহাম্মাদ (ﷺ) পর্যন্ত সকল নবীর দীন। একজন মুসলিম হলেন সেই ব্যক্তি যিনি এই দীনকে কবুল করেন এবং এর উপর আমল করেন। মুসলিমরা একমাত্র সত্য মা'বূদ (আরবিতে আল-ইলাহ) আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য কারো ইবাদত করেন না। মুসলিমরা সকল প্রকার শিরক পরিত্যাগ করেন এবং তারা মানবজাতির প্রতি প্রেরিত সর্বশেষ রাসূল মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর প্রদর্শিত শিক্ষার অনুসরণ করেন। এটিই হলো সালাফিয়্যাহর ভিত্তি।

আমাদের দাওয়াহ
সুন্নাহ

সুন্নাহ হলো নবী (ﷺ) ও তাঁর সাহাবাদের পথ। যিনি এই পথের অনুসরণ করেন তাকে সুন্নী বলা হয় এবং তিনি আহলুস-সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ’র অন্তর্ভুক্ত। মাঝেমধ্যে, শিয়া সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত নয় এমন কাউকে বুঝানোর জন্যও সুন্নী শব্দটি সাধারণভাবে ব্যবহৃত হয়। তবে, শুধু শিয়া না হওয়াটা কোনো ব্যক্তিকে পথভ্রষ্টতায় নিপতিত হওয়া থেকে বাঁচানোর জন্য যথেষ্ট নয়।

আমাদের দাওয়াহ
আস-সালাফ আস-সালেহ

আস-সালাফ আস-সালেহ হলেন মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর সাহাবা ও তাঁদের পরবর্তী তিন প্রজন্ম। তাদেরকে আহলুস-সুন্নাহ ওয়াল-জামা’আহ, আস-সালাফ,আছহাবুল-হাদীস এবং আহলুল-হাদীসও বলা হয়। যে ব্যক্তি তাঁদের পথকে কবুল করেন এবং তাঁদের আক্বীদাহ, মানহাজ ও দীনকে অবিকল অনুসরণ করেন, তিনি প্রকৃত হিদায়াতের উপর প্রতিষ্ঠিত।

আমাদের দাওয়াহ
সালাফিয়্যাহ

সালাফিয়্যাহ হলো ইসলাম ও সুন্নাহ অনুসরণের প্রকৃত পথ। একজন সালাফী হচ্ছেন সেই ব্যক্তি, যিনি অবিকল কোনো পরিবর্তন ছাড়াই সালাফে-সালেহীনের পথকে অনুসরণ করেন।

আমাদের দাওয়াহ
সুন্নী

সুন্নী, আহলুস-সুন্নাহ ওয়াল-জামাআহ, আছহাবুল-হাদীস এবং আহলুল-হাদীস এই সবই সমার্থক উপাধি । এই উপাধিগুলো একই পথের অনুসারী একটি দলকে বুঝায়। যাইহোক, যারা এই উপাধিগুলোকে ব্যবহার করে, তাদের প্রত্যেকেই প্রকৃত অর্থে নিজ দাবির অনুগামী নন। প্রকৃত অর্থে, বেশিরভাগ মানুষ, যারা এই উপাধিগুলোর সাথে নিজেকে যুক্ত করে তারা সালাফে-সালেহীনের আক্বীদাহ ও মানহাজের বিরোধিতা করে। একজন নিছক দাবিদার ও একজন প্রকৃত অনুসারীর মাঝে পার্থক্য স্থাপন করাই এই অনুচ্ছেদের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।

আমাদের দাওয়াহ

Discover more from Markaz Al-Imam At-Tahawee Foundation

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading