“আমি কি তোমাকে একজন জান্নাতী নারী দেখাবো না?!” বিশেষ করে গ্রীষ্মকালীন সময়ে, আমাদের সম্মানিত বোনদের জন্য নসিহত।

আত্বা ইবনু আবী রাবাহ (রাহিমাহুল্লাহ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা ইবনু আব্বাস (রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা) আমাকে বললেন, ‘আমি কি তোমাকে একজন জান্নাতী নারী দেখাবো না?’ আমি বললাম, ‘হ্যাঁ!’ অতঃপর তিনি বললেন, ‘এই কালো বর্ণের মহিলাটি নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট এসেছিল। অতঃপর সে বলেছিল, ‘আমি মৃগীরোগে আক্রান্ত হই, আর সে কারণে আমার শরীর অনাবৃত হয়ে যায়। অতএব, আপনি মহান আল্লাহর নিকট আমার জন্য দোআ করুন।’ তিনি বললেন, ‘যদি তুমি চাও তবে ধৈর্যধারণ করতে পারো; এর বিনিময়ে তোমার জন্য রয়েছে জান্নাত। আর যদি তুমি চাও তবে আমি মহান আল্লাহর নিকট তোমার সুস্থতার জন্য দোআ করব।’ সে বলল, ‘আমি ধৈর্যধারণ করব।’ তারপর সে বলল, ‘তবে (রোগে আক্রান্ত হলে) আমি অনাবৃত হয়ে যাই, অতএব আপনি আল্লাহর কাছে দোআ করুন, যেন আমি অনাবৃত না হয়ে যাই।’ অতঃপর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার জন্য দোআ করলেন।”[১]

আসুন আমরা এই অসাধারণ নারী [রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা]-এর ঘটনাটি অনুধাবন করি। তিনি ছিলেন ঈমান, নিষ্ঠা, ইখলাস, বিশুদ্ধতা, ভক্তি ও বিনয়-নম্রতার অধিকারিণী। মৃগীরোগের মতো কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হওয়ার পরও, যেটি তার জন্য যন্ত্রণা, উদ্বেগ এবং অস্থিরতার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল, এবং এত্থেকে তিনি যে কষ্ট পাচ্ছিলেন তা থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য তিনি নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে দোআ করতে বলেছিলেন। প্রথমে তিনি যা চেয়েছিলেন তার বিপরীতে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে আরও উত্তম বিষয়ের দিকে পরিচালনা করেছিলেন। তিনি তাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন যে, তিনি যেন দুঃখ-কষ্ট, বালা-মুসিবত ও ফিতনার সম্মুখে ধৈর্যধারণ করেন এবং এর প্রেক্ষিতে তাকে নিশ্চয়তা দিয়েছিলেন যে, তার বাসস্থান হবে জান্নাত। অবশেষে, তিনি একটি কল্যাণকর মৃত্যু এবং সুখময় আবাসকে (জান্নাত) বেছে নিয়েছিলেন – তিনি জান্নাতের একজন বাসিন্দা হওয়াকে বেছে নিয়েছিলেন এই শর্তে যে, তিনি ধৈর্যধারণ করবেন আর (জান্নাত প্রাপ্তির ব্যাপারে) তিনি রাসূলুল্লাহ [সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম] কর্তৃক আশ্বস্ত হয়েছিলেন। ধৈর্যধারণ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া সত্ত্বেও, তিনি যখন মৃগীরোগে আক্রান্ত হতেন তখন দুর্ঘটনাক্রমে এবং তার অজান্তেই তার শরীরের নির্দিষ্ট কিছু স্থান প্রকাশ পেয়ে যেত এবং সে ব্যাপারে উদ্বিগ্ন হওয়া থেকে তিনি নিজেকে বিরত রাখতে পারতেন না। তার অসুস্থতা তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকার কারণে তাকে ক্ষমা করা হয়েছিল, কিন্তু শালীনতা বজায় রাখার গভীর অনুভূতি, অটুট ঈমান এবং একটি বিশুদ্ধ অন্তর তার অনাবৃত হওয়ার বিষয়টি নিয়ে তাকে উদ্বিগ্ন করেছিল। যদিও তিনি জান্নাত পাওয়ার উদ্দেশ্যে ধৈর্যধারণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, এরপরও তিনি নবীকে জানালেন, “তবে আমি অনাবৃত হয়ে যাই” – এটি ইঙ্গিত করে যে, তিনি এই পরিস্থিতি সহ্য করতে পারছিলেন না যদিও সেটি তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার জন্য দোআ করেছিলেন, এবং এর ফলে, যদিও তিনি মৃগীরোগ অনুভব করছিলেন, তাঁর দোআর উসিলায় তিনি আর কখনো অনাবৃত হননি।

মহৎ চরিত্র, সুন্দরতম বৈশিষ্ট্য, উৎকৃষ্ট মূল্যবোধ, শালীনতার সৌন্দর্য এবং অন্তরের পবিত্রতা নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে এই অসাধারণ নারীর ঘটনাটি তুলে ধরা হয়েছে। তিনি বলেছিলেন, “তবে আমি অনাবৃত হয়ে যাই, অতএব আপনি আল্লাহর কাছে আমার জন্য দোআ করুন যেন আমি অনাবৃত না হয়ে যাই।” এই অনাবৃত হয়ে যাওয়া, যা অনিচ্ছাকৃতভাবে এবং তার অজান্তেই হতো, অর্থাৎ তা এমন এক পরিস্থিতি ছিল যার জন্য তাকে জবাবদিহি করতে হতো না, তারপরও বিষয়টি তাকে উদ্বিগ্ন করছিল। এই ছিল তার অবস্থা – একটি সত্যিকারের মর্যাদাপূর্ণ অবস্থা, তাহলে সেই নারীর ক্ষেত্রে কী বলা যায় যে স্বেচ্ছায় এবং প্রকাশ্যে পরপুরুষের সামনে নিজ সৌন্দর্যকে প্রকাশ করে, কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব বা বিবেচনা ছাড়াই জাঁকালোভাবে তার কমনীয়তা প্রদর্শন করে এবং তার ঈমানের করুণ দশা নিয়ে কোনো চিন্তা বা উদ্বেগ প্রকাশ করে না?! কুরআনের আয়াত, নবীর শিক্ষা এবং নিজেকে প্রদর্শন করার মারাত্মক পরিণতি সম্পর্কে জানার পরও সেগুলোর ব্যাপারে সে উদাসীন এবং একগুঁয়ে। আর সেই জান্নাতি নারী, যাকে মৃগীরোগের কারণে ক্ষমা করা হয়েছিল, তিনি নিজেকে প্রদর্শন করাকে তীব্রভাবে ঘৃণা করতেন।

তবে, যখন নারীদের দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ প্রকাশ পাওয়া, উন্মোচিত হওয়া এবং কমনীয়তা প্রদর্শনের মতো কার্যকলাপ প্রসার পায় যা পুরুষদের আড়ালে থাকা বাঞ্ছনীয় ছিল, এর জন্য তাদেরকে ক্ষমা করা হয় না কারণ এটি এক অন্য রকম ফিতনা এবং এই ব্যাধি নফসের কুমন্ত্রণা থেকে উদ্ভূত যা দুর্বল ঈমান, দীন পালনের ক্ষেত্রে দুর্বলতা এবং শালীনতার অভাব থেকে প্রকাশ পায় যা মূলত হারাম আমোদ প্রমোদে মত্ত থাকার ফল। প্রকৃত অর্থে, তাদের কার্যকলাপ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করে নাকি অসন্তুষ্টি অর্জন করে এ নিয়ে তারা মোটেও চিন্তিত নয় বা এ ব্যাপারে তারা ভ্রূক্ষেপও করে না। এই ব্যাধি আজ মাত্রাতিরিক্ত হারে বেড়ে গেছে কারণ মানুষের জীবনে লোভ-লালসার ব্যাপ্তি, বিভিন্ন ধরনের প্রবৃত্তির তাড়না ও অভিলাষ বেড়ে গেছে। ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম [রাহিমাহুল্লাহ] তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘যাদুল মা‘আদ’-এ এই ব্যাধি সম্পর্কে আলোচনা করেছেন এবং তা কীভাবে ব্যক্তির উপর প্রভাব বিস্তার করেছে, এর ফলে তারা কীভাবে ফিতনায় নিপতিত হয়েছে এবং কীভাবে তা ঈমান, ইয়াক্বীন, সিদক্ব (সত্যবাদিতা) ও শালীনতাকে বিনষ্ট করেছে সে সম্পর্কেও আলোচনা করেছেন। তিনি তার সমসাময়িক যুগের মানুষ ও তাদের অবস্থা বর্ণনা করছিলেন, তাহলে (একবার ভেবে দেখুন) তিনি যদি পরবর্তী যুগের মানুষদেরকে বিভিন্ন ফিতনায় নিপতিত হতে দেখতেন তাহলে কী বলতেন?!

তিনি বলেছেন: “আল্লাহ যদি লুকায়িত বিষয়াদি প্রকাশ করে দিতেন, তাহলে যে কেউই দেখতে পেতো যে কত মানুষ দুষ্ট শয়তানদের কুমন্ত্রণার শিকার হয়ে তাদের ফাঁদে পড়ে আছে এবং তাদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে, তাদের প্রতিটি কুমন্ত্রণার দাসত্ব করছে, অথচ তাদের প্রভাব নিষ্ক্রিয় করার কোনো ক্ষমতা বা শক্তি তাদের নেই। এই ফিতনা থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হলো সুস্থ অন্তর নিয়ে রাসূলদের আহ্বানের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা – জান্নাত ও জাহান্নাম যে ধ্রুব সত্য তা অনুধাবন করা এবং এই দুটোকে অন্তরের মধ্যখানে স্থির করা, এই দুনিয়ার মানুষের অবস্থা সম্পর্কে এবং তাদের উপর আপতিত প্রতিশোধ ও বিপর্যয়গুলো নিয়ে চিন্তাভাবনা করা যেগুলো তাদের বাসস্থানের উপর অগণিত বৃষ্টির ফোটার ন্যায় (নেমে আসে), এটি এক ধরনের কঠিন পাকড়াও যার থেকে পলায়নের কোনো পথ নেই। এই ব্যাধি সত্যিই চরম পর্যায়ের, তবে যখন এর ব্যাপকতা এতটাই বৃদ্ধি পেয়ে যায় যে সবাই একে অপরকে এর দ্বারা আক্রান্ত হতে দেখে, তখন তা আশ্চর্যজনক বা অবাস্তব মনে হয় না। এমনকি, আক্রান্তদের সংখ্যা এতটাই বেশি হয় যে, একে অবাস্তব বলতেও ইতস্ততবোধ হয়। যদি আল্লাহ কারো কল্যাণ চেয়ে থাকেন, তিনি তাদেরকে অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করেন যার মাধ্যমে তারা এই ব্যাধির প্রকৃত অবস্থা দেখতে পারে। এর দ্বারা, সেই (বিচক্ষণ) ব্যক্তি তার চারপাশের ব্যাধিগ্রস্ত মানুষগুলোর আধিক্য দেখতে পারে, যারা প্রত্যেকেই ভিন্ন ভিন্ন ব্যাধিতে আক্রান্ত। তাদের মাঝে, এমন লোক আছে যে চিরকাল থেকে বিভ্রান্তির জালে আটকে আছে। অপরজন ক্ষণিকের জন্য সুস্থ হয়ে উঠে তবে পুনরায় বিভ্রান্তির অতল গহ্বরে ডুবে যায়। পরিশেষে, এমনও লোক আছে যে এক মুহূর্তের জন্য পরিত্রাণ লাভ করে তবে পুনরায় বিভ্রান্তির জগতে প্রত্যাবর্তন করে। তাদের সুস্থতার মুহূর্তগুলোতে, বুদ্ধিমান লোকদের ন্যায় তারাও সৎকর্ম করে। কিন্তু, সেই ব্যাধি পুনরায় ফিরে আসে এবং তারা বিপথে যায়।”

“মাও‘ইযাতুন নিসা” পৃ. ২৮-৩১ থেকে উদ্ধৃত।

উৎস: https://salaficentre.com/2024/05/20/shall-i-not-show-you-a-woman-of-paradise-reminder-for-our-noble-sisters-particularly-during-summer/

পাদটীকা:


১. সহীহুল বুখারী ৫৬৫২, সহীহ মুসলিম ২৫৭৬।

Support The Da'wah In Bangladesh

The Messenger (ﷺ) said: “And save yourselves from the hell fire even if it be with the piece of a date.”

Recent Posts

Recommended Readings

ইসলাম

ইসলাম হলো আদম (‘আলাইহিস সালাম) থেকে মুহাম্মাদ (ﷺ) পর্যন্ত সকল নবীর দীন। একজন মুসলিম হলেন সেই ব্যক্তি যিনি এই দীনকে কবুল করেন এবং এর উপর আমল করেন। মুসলিমরা একমাত্র সত্য মা'বূদ (আরবিতে আল-ইলাহ) আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য কারো ইবাদত করেন না। মুসলিমরা সকল প্রকার শিরক পরিত্যাগ করেন এবং তারা মানবজাতির প্রতি প্রেরিত সর্বশেষ রাসূল মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর প্রদর্শিত শিক্ষার অনুসরণ করেন। এটিই হলো সালাফিয়্যাহর ভিত্তি।

আমাদের দাওয়াহ
সুন্নাহ

সুন্নাহ হলো নবী (ﷺ) ও তাঁর সাহাবাদের পথ। যিনি এই পথের অনুসরণ করেন তাকে সুন্নী বলা হয় এবং তিনি আহলুস-সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ’র অন্তর্ভুক্ত। মাঝেমধ্যে, শিয়া সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত নয় এমন কাউকে বুঝানোর জন্যও সুন্নী শব্দটি সাধারণভাবে ব্যবহৃত হয়। তবে, শুধু শিয়া না হওয়াটা কোনো ব্যক্তিকে পথভ্রষ্টতায় নিপতিত হওয়া থেকে বাঁচানোর জন্য যথেষ্ট নয়।

আমাদের দাওয়াহ
আস-সালাফ আস-সালেহ

আস-সালাফ আস-সালেহ হলেন মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর সাহাবা ও তাঁদের পরবর্তী তিন প্রজন্ম। তাদেরকে আহলুস-সুন্নাহ ওয়াল-জামা’আহ, আস-সালাফ,আছহাবুল-হাদীস এবং আহলুল-হাদীসও বলা হয়। যে ব্যক্তি তাঁদের পথকে কবুল করেন এবং তাঁদের আক্বীদাহ, মানহাজ ও দীনকে অবিকল অনুসরণ করেন, তিনি প্রকৃত হিদায়াতের উপর প্রতিষ্ঠিত।

আমাদের দাওয়াহ
সালাফিয়্যাহ

সালাফিয়্যাহ হলো ইসলাম ও সুন্নাহ অনুসরণের প্রকৃত পথ। একজন সালাফী হচ্ছেন সেই ব্যক্তি, যিনি অবিকল কোনো পরিবর্তন ছাড়াই সালাফে-সালেহীনের পথকে অনুসরণ করেন।

আমাদের দাওয়াহ
সুন্নী

সুন্নী, আহলুস-সুন্নাহ ওয়াল-জামাআহ, আছহাবুল-হাদীস এবং আহলুল-হাদীস এই সবই সমার্থক উপাধি । এই উপাধিগুলো একই পথের অনুসারী একটি দলকে বুঝায়। যাইহোক, যারা এই উপাধিগুলোকে ব্যবহার করে, তাদের প্রত্যেকেই প্রকৃত অর্থে নিজ দাবির অনুগামী নন। প্রকৃত অর্থে, বেশিরভাগ মানুষ, যারা এই উপাধিগুলোর সাথে নিজেকে যুক্ত করে তারা সালাফে-সালেহীনের আক্বীদাহ ও মানহাজের বিরোধিতা করে। একজন নিছক দাবিদার ও একজন প্রকৃত অনুসারীর মাঝে পার্থক্য স্থাপন করাই এই অনুচ্ছেদের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।

আমাদের দাওয়াহ

Discover more from Markaz Al-Imam At-Tahawee Foundation

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading

দাওয়াহর কাজে সহযোগিতা করুন (Support The Dawah)