Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors
Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

‘আক্বীদাহ’ এর অর্থ ও গুরুত্ব

الحمد لله رب العالمين والصلاة والسلام على رسوله الأمين وبعد

‘আক্বীদাহ’ শব্দের অর্থ

‘আক্বীদাহ’ (عقيدة) শব্দটি ফা‘য়ীলাহ (فعيلة)-এর (বিন্যাসগত) রূপ যা মাফ‘ঊল (مفعول) অর্থে ব্যবহৃত হয় (যার উপর কর্তার ক্রিয়া বর্তায়), অর্থাৎ মা‘ক্বূদান ‘আলাইহি (معقودا عليه), যেটি বেঁধে রাখা হয়, যার সাথে গিঁট দেওয়া হয়, যার উপর দৃঢ়ভাবে স্থির করা হয়, যা অবলম্বন করা হয়। এটি ‘উক্বদ (عقد) ধাতু থেকে নির্গত, যার অর্থ বাঁধা, দৃঢ়ভাবে আবদ্ধ করা, যুক্ত করা, সংযুক্ত করা।

দীনি বিষয়াদি আখবার (খবর) ও আহকামে (ঐ সমস্ত হুকুম যেগুলোর জন্য আমলের প্রয়োজন) বিভক্ত, যেমন মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন:

وَتَمَّتْ كَلِمَتُ رَبِّكَ صِدْقًا وَعَدْلاً

“তোমার রবের বাণী সত্যতা ও ইনসাফের দিক দিয়ে পরিপূর্ণ…।” (আল-আন‘আম ৬:১১৫)

আল্লাহর বাণী এই দুইভাবে পরিপূর্ণ: তথ্যগতভাবে তা সত্যনিষ্ঠ এবং আদেশ নিষেধের (আহকামের) ক্ষেত্রে তা ইনসাফপূর্ণ।

যেমন কেউ ‘আরবীতে বলে “দড়িটি আক্বাদা করলো”, অর্থাৎ সে শক্তভাবে দড়িটি বাঁধলো, আর একইভাবে “বিক্রয়টি আক্বাদা করল”, অর্থাৎ সে কোনো বিক্রয়, চুক্তি বা শর্ত সম্পাদন বা সম্পন্ন করল। আর আল্লাহ এই ক্রিয়াপদটি অঙ্গীকার [রক্ষার্থে] (الَّذِیۡنَ عَقَدَتۡ اَیۡمَانُکُم, আন-নিসা ৪:৩৩), ও দৃঢ়সংকল্পে নেওয়া অঙ্গীকারের পরিপ্রেক্ষিতে উল্লেখ করেছেন (وَلَـكِن يُؤَاخِذُكُم بِمَا عَقَّدتُّمُ الأَيْمَانَ, আল-মায়িদাহ ৫:৮৯)। আর যখন কোনো ব্যক্তি বলে “আক্বাদতু এই এই” এর অর্থ দাঁড়ায়, আমার অন্তর এই এই বিষয়ের উপর দৃঢ়।

সুতরাং এই পর্যন্ত যা কিছু উল্লেখ করা হয়েছে, এত্থেকে ‘আক্বীদাহ’ শব্দটি এইভাবে সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে:

সেই দৃঢ় বিশ্বাস (ই’তিক্বাদ) যার সাথে কারও অন্তর দৃঢ়ভাবে সংযুক্ত থাকে, যা কোনো প্রকার সংশয় বা সন্দেহ ছাড়াই অন্তরের অভ্যন্তরে স্থির ও অনড় থাকে। এটি সকল প্রকার অনুমান, সন্দেহ ও সংশয়কে উপেক্ষা করে।

আর ফিক্বহী বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে, তবে সেগুলো ইমানেরই অংশ কেননা এটি একটি সর্বস্বীকৃত বিষয় যে পুরো শরীয়াহই ইমানের অন্তর্ভুক্ত, কিন্তু, এই [ফিক্বহী] বিষয়গুলো বাস্তবায়িত হয় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের দ্বারা, তাই এগুলো ‘আক্বীদাহ’ [সংক্রান্ত কোনো বিষয় বা পরিভাষার] অধীনে স্থান পায় না, বরং ইমানেরই অংশ হওয়ার কারণে সেগুলো “ইমান”, “সুন্নাহ” ও “শরীয়াহ” নামক পরিভাষার অধীনে স্থান পায়- সেই সাথে লক্ষ্য রাখা উচিত যে, উপরোল্লিখিত পরিভাষাগুলো [“ইমান”, “সুন্নাহ” ও “শরীয়াহ”] আক্বীদাহ-বিশ্বাসকে বুঝানোর জন্যও সমানভাবে ব্যবহৃত হয় (সামনে দেখুন)।

“আক্বীদাহ” এর কিছু সমার্থক শব্দ

এমন কিছু শব্দ আছে যা ব্যাবহারিক দিক দিয়ে ‘আক্বীদাহ’ ও ‘ই‘তিক্বাদ’ উভয়ের সমার্থক হিসেবে প্রযোজ্য, যেমন আত-তাওহীদ (التوحيد), আস-সুন্নাহ (السنة), এবং আশ-শারীয়াহ (الشريعة), আবার এই একই পরিভাষাগুলো হতে কিছু শব্দ আছে যেমন ‘আত-তাওহীদ’, যা নির্দিষ্ট করে ইমানের সাথে সম্পৃক্ত বিষয়াদিকে বুঝায়, আরও কিছু শব্দ আছে যেমন ‘আস-সুন্নাহ’ এবং ‘আশ-শারীয়াহ’ যা ইমান ও তার প্রাসঙ্গিক দিকগুলোকে বুঝায়। কতিপয় সালাফ ‘আল-ইমান’ (الإيمان) শিরোনাম দিয়ে বই লিখেছেন কেননা তাতে অন্তরের বিশ্বাসের সাথে জড়িত আলোচনাগুলো সমষ্টিগতভাবে ইমানের পুরো বিষয়টিকে অন্তর্ভুক্ত করেছে – যা অন্তরের বিশ্বাস (ইলম-ভিত্তিক বিষয়াদি), মৌখিক স্বীকারোক্তি ও বাহ্যিক আমল নিয়ে গঠিত।

আর সালাফদের লিখা বইগুলোতে এই বিষয়গুলোর প্রতি ইঙ্গিত রয়েছে। তাঁরা যেসব বই লিখেছেন সেগুলোর বিভিন্ন নামকরণ করেছেন যেমন “কিতাবুস সুন্নাহ”, সালাফদের অনেকেই এই শিরোনাম দিয়ে বই লিখেছেন, এবং “আশ-শরীয়াহ” যা ইমাম আল-আজুররির লিখা বই, এবং “কিতাবুত তাওহীদ”, যা ইমাম বুখারী (দেখুন তাঁর ‘সহীহুল বুখারী’) ও ইবনু খুযায়মাহ নামকরণ করেছেন। আর এই বইগুলো আক্বীদাহ সংক্রান্ত বিষয়াদি, যেমন আল্লাহর আসমা ওয়া-সিফাত, আল-ইমান, আল-ক্বাদর সহ আরও অনেক বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করেছে।

প্রাথমিক যুগের সালাফদের লিখা বইয়ের তালিকা

এই হলো সালাফদের লিখা বইয়ের একটি তালিকা যেগুলোতে উপরোল্লিখিত শব্দগুলো ব্যবহার করা হয়েছে:

● ইমাম ও মুজতাহিদ, আবূ ‘উবাইদ আল-ক্বাসিম ইবনু সালামের (মৃ. ২২৪হি) “কিতাব আল-ইমান’’।
● আল-ইমাম ইবনু আবি শাইবাহর (মৃ. ২৩৫হি) “কিতাব আল-ইমান’’।
● ইমাম আহমাদ বিন হাম্বালের (মৃ. ২৪১হি) “উসূল আস-সুন্নাহ”।
● ইমাম বুখারীর (মৃ. ২৫৬হি) তাঁর সহীহ (আল-বুখারীতে সংকলিত) “কিতাব আল-ইমান”।
● ইমাম বুখারীর (মৃ. ২৫৬হি) তাঁর সহীহ (আল-বুখারীতে সংকলিত) “কিতাব আত-তাওহীদ”।
● আবূ বাকর আল-আসরামের ছাত্রের (মৃ. ২৭৩হি) “আস-সুন্নাহ”।
● আল-ফাক্বীহ এবং আল-ইমাম আবূ দাঊদ আস-সিজিস্তানীর (মৃ. ২৭৫হি) “কিতাব আস-সুন্নাহ” (এতে সুনান বিষয়ক আলোচনা করা হয়েছে)।
● আল-হাফিয এবং আল-ইমাম, আবূ হাতিম আর-রাযীর (মৃ. ২৭৭হি) “আসল আস-সুন্নাহ”।
● আল-কাদ্বী এবং আল-হাফিয, ইবনু আবী ‘আসিমের (মৃ. ২৮৭হি) “আস-সুন্নাহ”।
● আল-হাফিয, ‘আব্দুল্লাহ ইবনু ইমাম আহমাদের (মৃ. ২৯০হি) “আস-সুন্নাহ”।
● আল-কাদ্বী এবং আল-মুহাদ্দিস আবূ বাকর আল-মাররুদীর (মৃ. ২৯২হি) “আস-সুন্নাহ”।
● ইমাম আহমাদের ছাত্র, আল-মারওয়াযীর (মৃ. ২৯২হি) “আস-সুন্নাহ”।
● আল-মুজতাহিদ, মুফাসসির এবং ইমাম, ইবনু জারীর আত-তাবারীর (মৃ. ৩২০হি) “সারীহ আস-সুন্নাহ”।
● আল-ফাক্বীহ এবং আল-ইমাম, ইবনু খুযায়মাহর (মৃ. ৩১১হি) “কিতাব আত-তাওহীদ”।
● আল-ইমাম আবূ জা’ফার আত-তাহাউইর (মৃ. ৩২১হি) “আক্বীদাহ আত-তাহাউইয়্যাহ”।
● ইমাম আল-বারবাহারীর (মৃ. ৩২৯হি) “শারহ আস-সুন্নাহ”।
● আল-কাদ্বী, আবূ আহমাদ আল-আসালের (মৃ. ৩৪৯হি) “কিতাব আস-সুন্নাহ”।
● আল-ফাক্বীহ এবং আল-ইমাম, আবূ বাকর আল-আজুররির (মৃ. ৩৬০হি) “আশ-শরীয়াহ”।
● আল-হাফিয এবং আল-ইমাম, ইবনু মানদাহের (মৃ. ৩৯৫হি) “কিতাব আত-তাওহীদ”।
● আল-হাফিয এবং ফাক্বীহ, ইমাম লালিকা‘ঈর (মৃ. ৪২৮হি) “শারহু উসুল আল-ই‘তিক্বাদ আহলুস-সুন্নাহ ওয়াল-জামা’আহ”।
● আবূ নু’আঈম আল-আসবাহানীর (মৃ. ৪৩০হি) “আল-ই‘তিক্বাদ”।
● আল-হাফিয এবং ইমাম, আবূ ‘উসমান আস-সাবূনীর (মৃ. ৪৪৯হি) “আক্বীদাহ আস-সালাফ আসহাবুল-হাদীস”।

আক্বীদাহগত বিচ্যুতি

এই বইগুলো বিদ‘আতী ফির্কাহ ও যে সকল বিদ‘আতীরা আবির্ভূত হয়েছিল তাদেরকে খণ্ডন করার উদ্দেশ্যে লিখা হয়েছিল, যেমন আল-খাওয়ারিজ, আর-রাফিদ্বাহ, আল-ক্বাদারিয়্যাহ, আল-মুরজিয়াহ অতঃপর বিদ‘আতের মূলহোতা তথা আল-জা‘দ বিন দিরহাম, জাহম বিন সাফওয়ান, ওয়াসিল বিন আতা, আমর বিন ‘উবাইদ সহ অন্যান্যরা।

শেষোক্ত ৪ জন জাহমিয়্যাহমু’তাযিলাহ ফির্কার উদ্ভাবনকারী, এবং এই দলগুলো একটি বুদ্ধিবৃত্তিক মূলনীতি উদ্ভাবন করে যা “হুদূসুল আজসাম” নামে পরিচিত, আর তা এমন একটি মূলনীতি যেটি দিয়ে তারা প্রমাণ করতে চেয়েছিল যে এই মহাবিশ্ব হলো হা-দিসাহ (তা অস্তিত্বে এসেছে) কারণ এটি বস্তু (আজসাম) দিয়ে তৈরি যেগুলোর গুণাবলি (সিফাত), নৈমিত্তিক বৈশিষ্ট্য (আ’রাদ), ফলাফল ও সংঘটনগত বৈশিষ্ট্য (হাওয়াদীস) রয়েছে সুতরাং এই মহাজাগতিক বস্তুগুলো (আজসাম) অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্বে এসেছে, যে কারণে এই মহাজাগতিক বস্তুগুলোকে তারা একেকটি সংঘটন/ঘটনা বলে মনে করে। আর যেহেতু মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তুই একক কোনো সংঘটন/ঘটনা, তাই প্রতিটি সংঘটন/ঘটনার পেছনে নিশ্চয়ই কোনো ঘটক আছেন, আর তিনিই হলেন আল্লাহ। যে নাস্তিকদের সাথে তারা তর্ক-বিতর্ক করছিল, তাদের কাছে উপরিউক্ত বিষয়টি (অর্থাৎ আল্লাহর অস্তিত্ব) প্রমাণ করার উদ্দেশ্যে, তারা অ্যারিস্টটলের (মৃ. ৩২২খ্রিষ্টপূর্ব) উদ্ভাবনকৃত পরিভাষা ও শ্রেণীবিন্যাস থেকে একটি নীতি তথা “আল-মাক্বূলাতুল আশর” (দশটি শ্রেণীর) সাহায্য নেয়, যা “আল-জাওহার ওয়াল-আ‘রাদ” (স্বত্ব ও নৈমিত্তিক বৈশিষ্ট্য) নামেও পরিচিত, এবং তারা এর পরিভাষা ও শ্রেণীভুক্তকরণকে (প্রমাণ হিসেবে) ব্যবহার করে, এবং এর সাথে তারা অন্যান্য মতাদর্শগুলোও যোগ করে যেগুলোর উৎস হলো তাদেরও বহু আগেকার গ্রিক দার্শনিকরা, যেমন ডেমোক্রিটাস ও তার পারমাণবিক তত্ত্ব (মৃ. ৩৭০খ্রিষ্টপূর্ব) এবং প্লোটিনাস (মৃ. ২৭০খ্রিষ্টাব্দ) ও তার “সেই অতীন্দ্রিয় মহীয়ান সত্তা যিনি বিভাজন ও সংখ্যাধিক্য থেকে মুক্ত” নামক দর্শন। আর এর পরিপ্রেক্ষিতে, তারা নাস্তিকদের কাছে তাদের রবের বর্ণনা দিতে যেয়ে উপরিউক্ত ভাষা ব্যবহার করতে বাধ্য হয়েছিল কারণ তারা ইতোমধ্যে [অ্যারিস্টটলের ভাষা ব্যবহার করে হুদূসুল আজসাম নামক] যেই [বুদ্ধিবৃত্তিক] মূলনীতি আবিষ্কার করেছিল তা নস্যাৎ হয়ে যাওয়ার ভয় করছিল। এই কারণে তারা কিতাব ও সুন্নাহতে বর্ণিত আল্লাহর প্রতি ইমান, বিশেষ করে তাঁর নাম, গুণাবলি ও আক্বীদাহ সংক্রান্ত অনেক কিছুকেই বর্জন ও অপব্যাখ্যা করতে লাগল, আর এভাবেই [কুরআন ও হাদীসের প্রমাণগুলো যা তাদের নিকট] “সমস্যাযুক্ত” বলে মনে হয়েছিল এবং যা তাদের নব উদ্ভাবিত মূলনীতির সাথে সাংঘর্ষিক ছিল, তা সমাধানের উদ্দেশ্যে “তাউইল” ও “তাফউইদের” জন্ম হলো।

এই ছিল সেই ইলমুল কালাম [দর্শন বা যুক্তিতর্ক ভিত্তিক ধর্মতত্ত্ব] যা [আল্লাহর] নাম ও গুণাবলি অস্বীকার করার ভিত্তি স্থাপন করে, যে ব্যাপারে চার ইমাম: আবূ হানিফা, মালিক, শাফি’ঈ এবং আহমাদ (রাহিমাহুমুল্লাহ) হুঁশিয়ার করেছিলেন। এই দলগুলো সামষ্টিকভাবে মুতাকাল্লিমূন (দর্শন বা যুক্তিবিদ্যা ভিত্তিক ধর্মতত্ত্ববিদ) নামে পরিচিত ছিল, আর তারা হলো জাহমিয়্যাহ, মু‘তাযিলাহ, কুল্লাবিয়্যাহ, আশ’আরিয়্যাহ ও মাতুরিদিয়্যাহ। সালাফদের মধ্য থেকে একজন ‘আলিমও এই বিদ‘আতীদের ইলমুল কালামের সাথে জড়িত ছিলেন না।

ইবনু সুরাইজ আশ-শাফি’ঈ (মৃ. ৩০৬হি) বলেছেন, যেভাবে তাঁর থেকে আবূ ইসমাঈল আল-হারাউই “যাম্মুল কালামে” বর্ণনা করেছেন এবং যেভাবে ইবনু তাইমিয়্যাহ তাঁর “বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ” গ্রন্থে বলেছেন:

توحيد اهل العلم وجماعة المسلمين أشهد أن لا اله الا الله وان محمدا رسول الله وتوحيد اهل الباطل الخوض في الأعراض والأجسام وانما بعث النبي صلى الله عليه وسلم بانكار ذلك

“আহলুল ইলম ওয়া জামা’আহ এর তাওহীদ হলো, ‘আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ব্যতীত ‘ইবাদতের প্রকৃত হকদার আর কোনো ইলাহ নেই আর মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল।’ আর আহলুল বাতিলের তাওহীদ হলো আল-আ‘রাদ এবং আল-আজসাম নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করা অথচ নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একে নাকচ করার জন্যই প্রেরিত হয়েছিলেন!”

ইমাম আশ-শাফি’ঈ (মৃ. ২০৪হি) বলেন, যা আস-সুয়ূতি সাওন আল-মানত্বিক্ব (১/৪৭-৪৮) গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন:

ماجهل الناس ولااختلفوا إلا لتركهم لسان العرب وميلهم إلى لسان ارسطوطاليس

“মানুষেরা এই কারণেই জাহিলে পরিণত হয়েছিল এবং (নিজেদের মধ্যে) মতপার্থক্য সৃষ্টি করেছিল কারণ তারা ‘আরবদের ভাষাকে বর্জন করেছিল এবং অ্যারিস্টটলের ভাষাকে গ্রহণ করেছিল।”

আশ-শাফি’ঈ (রাহিমাহুল্লাহ)-এর এই বক্তব্যটি আক্বীদাহ ও ফিক্বহ উভয় ক্ষেত্রে সত্য, কেননা অ্যারিস্টটলের দর্শনশাস্ত্র, ত্রুটিপূর্ণ যুক্তিবিদ্যা ও অন্যান্য যুক্তিপদ্ধতিগুলো এই উভয় শাস্ত্রকে কলুষিত করে ফেলেছিল (বিশেষ করে) তাদের জন্য যারা অ্যারিস্টটলের পরিভাষা, যুক্তি আর দর্শনশাস্ত্রের দিকে ঝুঁকে পড়েছিল।

তাই সালাফরা এই দলগুলোর (মূলনীতি) খণ্ডন করে বই লিখেছিলেন, একইসাথে তাঁরা উল্লেখ করেছিলেন যে, আশ‘আরীরা ইবনু কুল্লাবের (মৃ. ২৪০হি) ‘আক্বীদাহর অনুসারী ছিল, এবং তারা হিজরি পঞ্চম শতাব্দী পর্যন্ত পৃথক কোনো ফির্কাহ বা গোষ্ঠী হিসেবে বিবেচিত ছিল না। এই দলগুলো [দীনের] মৌলিক বিষয়ে আহলুস-সুন্নাহর বিরোধিতা করেছিল, তন্মধ্যে [উদাহরণস্বরূপ]:

● নাক্বলের উপর আক্বলকে [অর্থাৎ ওয়াহীর উপর বিবেকবুদ্ধিকে] নির্ধারক ও চূড়ান্ত বলে বিশ্বাস করা।
● আক্বীদাহর ক্ষেত্রে আহাদ হাদীসকে অস্বীকার করা।
● এই দাবি করা যে বান্দার উপর সর্বপ্রথম আবশ্যকতা হলো পর্যবেক্ষণ করা, নিরীক্ষা করা অতঃপর এই ধারণায় উপনীত হওয়া যে আল্লাহর অস্তিত্ব আছে।
● তাদের মতে ওয়াহীলব্ধ জ্ঞান যেহেতু তার বাহ্যিক অর্থে তাজসীম [আকার-আকৃতি নির্ধারণ] ও তাশবীহ [সৃষ্টির সাথে সদৃশতা স্থাপন] এই উভয়কে সাব্যস্ত করে তাই সেগুলোকে রূপক এবং আলংকারিক [যা আক্ষরিক নয় এমন] অর্থে গ্রহণ করতে হবে।
● আল্লাহর গুণাবলি ও কর্মগুলোকে “তানযীহ” (পবিত্রকরণের) মিথ্যা দাবির জেরে বিভিন্নভাবে অস্বীকার করা, অথচ বাস্তবে তাদের “হুদূসুল আজসাম” নামক যুক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তিক মূলনীতিটি বাতিল হয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করার জন্যই তারা এমনটি করেছিল যা তারা নাস্তিক্যবাদী দার্শনিকদের ভাষা, পরিভাষা ও শ্রেণীকরণকে ব্যবহার করে আবিষ্কার করেছিল। আর এভাবেই তাওহীদ ও আক্বীদাহ হয়ে গেল আল্লাহর সত্তা থেকে আজসাম ও (আজসামের) সংঘটনগত বৈশিষ্ট্য (আ’রাদ) ও সকল সংঘটন (হাওয়াদীস) নাকচ করার একটি ভাষা, আর এর দ্বারা তারা সেই ভাষাটি বর্জন করল, যে ভাষায় আল্লাহর কিতাবসমূহ ও রাসূলদেরকে প্রেরণ করা হয়েছিল, অথচ এর বিপরীতে তারা নাস্তিক্যবাদী দার্শনিকদের সেই ভাষাকে গ্রহণ করে নিলো যাদের খণ্ডন ও বিরুদ্ধাচরণ করছে বলে তারা (বিদ‘আতীরা) দাবি করছিল!

তাদের এই বিরুদ্ধাচরণ “হুদূসুল আজসাম” নামক বুদ্ধিবৃত্তিক মূলনীতির দ্বারা হয়েছিল যাকে তারা সেই চূড়ান্ত সত্য বলে মেনে নিয়েছিল যার উপর ইসলামের সত্যতা নির্ভর করে। এই বিষয়ে আরও জানতে চাইলে, দেখুন www.asharis.com যেখানে এই বিষয়টি নিয়ে মু’তাযিলাহ ও আশ’আরীদের মূল গ্রন্থগুলো থেকে বিশদভাবে আলোচনা করা হয়েছে।

এখানে মূল বিষয় হলো যে, এই লোকেরা আক্বীদাহ ও তাওহীদ উভয়ের মাঝে বিদ‘আতের সূচনা করেছিল, মুসলিমদের মাঝে বিভাজন সৃষ্টি করেছিল, তাদের বিদ‘আতগুলোকে প্রচার করার লক্ষ্যে তারা বদ্ধপরিকর ছিল, যতক্ষণ না সুন্নাহ পরিণত হয়েছিল বিদ‘আতে আর হক্ব পরিণত হয়েছিল বাতিলে। অতএব তারা মুসলিমদের ঐক্যকে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছিল, (এই বাতিল আক্বীদাহর মাধ্যমে) তাদের অন্তরসমূহকে বিভক্ত করে ফেলেছিল, এবং তাদের জামা’আহকে বিভিন্ন দল-উপদলে বিভক্ত করেছিল, আর এভাবেই রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের) কর্তৃক এই উম্মাহ ৭৩ দলে বিভক্ত হওয়ার বাণী সত্য বলে সাব্যস্ত হয়েছিল।

‘আকীদাহ’ এর গুরুত্ব

এই পর্যন্ত যা কিছু আলোচনা করা হয়েছে এত্থেকে যেকেউই বুঝতে পারবে যে, অন্তরস্থ জ্ঞানই হলো ব্যক্তির বিশ্বাস (ইমান) ও তার রবকে ‘ইবাদত করার ভিত্তি এবং তা তাওহীদের সাথে জড়িত, যে কারণে একজন মুসলিমের জন্য সঠিক ‘আক্বীদাহ, এর অনুসারী এবং এর উৎসগুলোর ব্যাপারে জ্ঞান অর্জন করা অপরিহার্য, এবং তাকে অবশ্যই তাদের থেকেই ‘ইলম ও দীনি হুকুম-আহকাম শিক্ষা করতে হবে যাদের ‘আক্বীদাহ সঠিক ও নির্ভরযোগ্য। আর বাতিল ‘আক্বীদাহ পোষণকারীদের নিকট দারস্থ হওয়ার ক্ষেত্রে, এমনকি যদি তা ফিক্বহ অথবা হুকুম-আহকামের জন্যেও হয়ে থাকে তবে তা ক্ষতিকারক হবে কেননা তাদের ‘আক্বীদাহ এমন কিছুর উপর প্রতিষ্ঠিত যার ভিত্তি ও গোড়াপত্তন উভয় ত্রুটিপূর্ণ, এবং সেটা তাদের ইলম ও আমলের ভিতর প্রভাব বিস্তার করবে, কারণ ফার’ (শাখাপ্রশাখা) তার আসল (মূল)-কেই অনুসরণ করে।

আর ‘আক্বীদাহর উৎস হলো আল্লাহর কিতাব, যা নববী সুন্নাহ দ্বারা ব্যাখ্যাকৃত এবং ইসলামের প্রথম তিন শতাব্দীর (৩০০হি পর্যন্ত) সালাফদের বুঝ, বক্তব্য, অবস্থান ও বিশদ আলোচনা দ্বারা একীভূত, এরপর হলেন তারা যারা সেই আক্বীদাহ স্পষ্টকরণ ও ব্যক্তকরণে তাঁদের আক্বীদাহ, মানহাজ ও বক্তব্যকে অনুসরণ করেছিলেন।

অধিকতর তথ্য ও রেফারেন্সের জন্য পড়ুন:

● শাইখ সালিহ আলুশ শাইখ কর্তৃক শারহুল ‘আক্বীদাতিত তাহাউইয়্যাহ
● আল-লালিকাঈ কর্তৃক শারহু উসূলিল ই‘তিক্বাদ
● ইবনু তাইমিয়্যাহ কর্তৃক বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ
● আবূ ইসমাঈল আল-হারাউই কর্তৃক যাম্মুল কালাম

Support The Da'wah In Bangladesh

Recent Posts

Recommended Readings

ইসলাম

ইসলাম হলো আদম (‘আলাইহিস সালাম) থেকে মুহাম্মাদ (ﷺ) পর্যন্ত সকল নবীর দীন। একজন মুসলিম হলেন সেই ব্যক্তি যিনি এই দীনকে কবুল করেন এবং এর উপর আমল করেন। মুসলিমরা একমাত্র সত্য মা'বূদ (আরবিতে আল-ইলাহ) আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য কারো ইবাদত করেন না। মুসলিমরা সকল প্রকার শিরক পরিত্যাগ করেন এবং তারা মানবজাতির প্রতি প্রেরিত সর্বশেষ রাসূল মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর প্রদর্শিত শিক্ষার অনুসরণ করেন। এটিই হলো সালাফিয়্যাহর ভিত্তি।

আমাদের দাওয়াহ
সুন্নাহ

সুন্নাহ হলো নবী (ﷺ) ও তাঁর সাহাবাদের পথ। যিনি এই পথের অনুসরণ করেন তাকে সুন্নী বলা হয় এবং তিনি আহলুস-সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ’র অন্তর্ভুক্ত। মাঝেমধ্যে, শিয়া সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত নয় এমন কাউকে বুঝানোর জন্যও সুন্নী শব্দটি সাধারণভাবে ব্যবহৃত হয়। তবে, শুধু শিয়া না হওয়াটা কোনো ব্যক্তিকে পথভ্রষ্টতায় নিপতিত হওয়া থেকে বাঁচানোর জন্য যথেষ্ট নয়।

আমাদের দাওয়াহ
আস-সালাফ আস-সালেহ

আস-সালাফ আস-সালেহ হলেন মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর সাহাবা ও তাঁদের পরবর্তী তিন প্রজন্ম। তাদেরকে আহলুস-সুন্নাহ ওয়াল-জামা’আহ, আস-সালাফ,আছহাবুল-হাদীস এবং আহলুল-হাদীসও বলা হয়। যে ব্যক্তি তাঁদের পথকে কবুল করেন এবং তাঁদের আক্বীদাহ, মানহাজ ও দীনকে অবিকল অনুসরণ করেন, তিনি প্রকৃত হিদায়াতের উপর প্রতিষ্ঠিত।

আমাদের দাওয়াহ
সালাফিয়্যাহ

সালাফিয়্যাহ হলো ইসলাম ও সুন্নাহ অনুসরণের প্রকৃত পথ। একজন সালাফী হচ্ছেন সেই ব্যক্তি, যিনি অবিকল কোনো পরিবর্তন ছাড়াই সালাফে-সালেহীনের পথকে অনুসরণ করেন।

আমাদের দাওয়াহ
সুন্নী

সুন্নী, আহলুস-সুন্নাহ ওয়াল-জামাআহ, আছহাবুল-হাদীস এবং আহলুল-হাদীস এই সবই সমার্থক উপাধি । এই উপাধিগুলো একই পথের অনুসারী একটি দলকে বুঝায়। যাইহোক, যারা এই উপাধিগুলোকে ব্যবহার করে, তাদের প্রত্যেকেই প্রকৃত অর্থে নিজ দাবির অনুগামী নন। প্রকৃত অর্থে, বেশিরভাগ মানুষ, যারা এই উপাধিগুলোর সাথে নিজেকে যুক্ত করে তারা সালাফে-সালেহীনের আক্বীদাহ ও মানহাজের বিরোধিতা করে। একজন নিছক দাবিদার ও একজন প্রকৃত অনুসারীর মাঝে পার্থক্য স্থাপন করাই এই অনুচ্ছেদের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।

আমাদের দাওয়াহ

Discover more from Markaz At-Tahawee

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading