আল-মুহাদ্দিছ, আল-আল্লামাহ, আশ-শাইখ রাবী’ ইবনু হাদী আল-মাদখালী (হাফিযাহুল্লাহ) বলেছেন:
“আল-হাসান আল-বাসরী (মৃ. ১১০হি) (রাহিমাহুল্লাহ) ইসলামের কিবারুল উলামাদের (প্রবীণ ও নেতৃস্থানীয় আলেমদের) মধ্যে একজন জ্ঞানী ও সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন। কিন্তু ক্বাদারীরা (ক্বদর অস্বীকারকারীরা) তাকে ক্বদর অস্বীকারকারী বলে আখ্যায়িত করত। তারা তাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত বলে মনে করত এবং তিনি তাদের দলভুক্ত বলে তাঁর নামে গুজব ছড়াতো। এটি ছিল তাঁর বিরুদ্ধে তাদের মিথ্যাচার।
আহলুস-সুন্নাহর কেউ কেউ মনে করতেন যে, আল-হাসান (এই বিদআতে) লিপ্ত হয়েছিলেন ঠিকই কিন্তু এত্থেকে তাওবাহ করেছিলেন। তিনি এতে লিপ্ত হয়েছিলেন অতঃপর তাওবা করেছিলেন অথবা এতে লিপ্ত না হওয়া সত্ত্বেও ক্বাদারীরা তাঁর নামে সেটি ছড়িয়ে দিয়েছে – মোটকথা এটি বিদআতী ও ফিতনা সৃষ্টিকারীদের পদ্ধতি; প্রখ্যাত ব্যক্তিদের পেছনে তারা নিজেদেরকে আড়াল করবেই।
এ কারণে, ক্বাদারীরা আল-হাসান [আল-বাসরী]-এর পেছনে নিজেদেরকে আড়াল করত, তাঁর ব্যাপারে লেখালেখি করত ও গুজব ছড়াতো, তারা পুস্তিকা রচনা করত এবং মিথ্যাচার ও প্রতারণার মাধ্যমে ক্বদর অস্বীকার করার কথাকে আল-হাসানের সাথে সংযুক্ত করত, যদিও তিনি (কস্মিনকালে) তাদের দলভুক্ত ছিলেন না। হয়তো তারা আজও এটা দাবি করে যে, আল-হাসান আল-বাসরী তাদের একজন – আল্লাহ যেন তাদেরকে লাঞ্ছিত করেন এবং তাদের কবল থেকে তাকে মুক্ত করেন। [১]
খারিজীরা প্রখ্যাত ও বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের পেছনে লুকিয়ে থাকত। খারিজীরা আবুল-শা’ছা জাবির ইবনু যাইদ (রাহিমাহুল্লাহ) (মৃ. ৯৩হি)-এর পেছনে লুকিয়ে থাকত যিনি ইবনু ‘আব্বাস (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর একজন বিশিষ্ট ছাত্র ছিলেন ও কিবারুল ফক্বীহদের (প্রবীণ ও নেতৃস্থানীয় ফক্বীহদের) অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। খারিজীরা তাঁর পেছনে নিজেদেরকে আড়াল করত।
এগুলো বিদআতীদের চক্রান্ত ও প্রতারণা, কারণ ইসলামের ইমামদের পেছনে লুকিয়ে না থাকলে তাদের বিদআত প্রসার পায় না। আর আপনি নিজে আশআরীদের মাঝে এটি দেখতে পাবেন যে, তারা নিজেদেরকে ইমামদের সাথে সংযুক্ত করে। অর্থাৎ হতে পারে কোনো আশআরী (দীনের আনুষঙ্গিক বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে) মালিকী মাযহাব অনুসরণ করে; কিন্তু তার আশআরী আক্বীদাহকে সে ইমাম মালিকের সাথে সংযুক্ত করে ও তার সুফিবাদকে সে ইমাম মালিকের সাথে সংযুক্ত করে।
একইভাবে, মাতুরিদীরা; তারা নিজেদেরকে আবূ হানীফার সাথে সংযুক্ত করে যদিও তারা মাতুরিদী এবং তাদের মাযহাব আল-জাহম ইবনু সাফওয়ানের মাযহাব থেকে প্রাপ্ত।
এভাবেই বিপথগামী পথসমূহের লোকেরা ইসলামের ইমামদের পেছনে লুকিয়ে থাকে। যাইদীরা যাইদ [ইবনু ‘আলী ইবনু আল-হুসাইন]-এর পিছনে লুকিয়ে থাকে। রাফিযীরা জা’ফার আস-সাদিক্ব (মৃ. ১৪৮হি) এবং আহলুল বাইতের [আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পরিবারবর্গের] পেছনে লুকিয়ে থাকে। তাদের “মিলাল” (আক্বীদাহ-বিশ্বাস) প্রত্যাখ্যাত হয়েছে তাই প্রতারণার আশ্রয় নেওয়া ও ইমামদের পেছনে লুকানো ব্যতীত সেগুলো প্রসারিত হবে না।
আর এ ধরনের কাজ অনেকেই করে। যেমন ক্বুত্ববিয়্যাহ (সাইয়িদ ক্বুত্ববের ভ্রান্ত মতাদর্শ) প্রসার পেতো না যদি তারা ইবনু তাইমিয়্যাহ, ইবনুল ক্বাইয়িম, ইবনু বায, আল-আলবানী, ইবনু উসাইমীনের মতো বিশ্বের মানুষের নিকট সমাদৃত ও বরেণ্য ব্যক্তিদের আড়ালে লুকিয়ে না থাকত।
সুতরাং, তারা বলে: “আমরা ইবনু বাযের ছাত্র, আমরা সালাফদের মানহাজের উপরে আছি। আমরা আল-আলবানীর ছাত্র, আমরা ইবনু উসাইমীনের ছাত্র।” তারা মানুষকে এই বলে বিভ্রান্ত করে যে, এই ইমামরা তাদের সাথে আছেন। এভাবে তারা সেসকল যুবকদেরকে প্রতারিত করে ও বোকা বানায় যে যুবকেরা ইলম ভালোবাসে, আলেমদেরকে ভালোবাসে, ইসলামকে ভালোবাসে এবং তারা হক্ব (সত্যকে) ভালোবাসে। কিন্তু সে সমস্ত লোকদের চক্রান্ত ও প্রতারণার শিকার হয়ে অনেক মানুষ তাদের ফাঁদে পড়ে।”
উৎস: আশ-শাইখ আল-আল্লামাহ ডক্টর রাবী ইবনু হাদী আল-মাদখালী কর্তৃক ব্যাখ্যাকৃত আয-যারী‘আতু ইলা বায়ানি মাক্বাসিদি কিতাবিশ শারী‘আহ, (২/১০১-১০৩)।
[১] অনুবাদকের দ্রষ্টব্য: ইমাম আল-হাসান আল-বাসরী (রাহিমাহুল্লাহ) ক্বাদারীদের বিদআত থেকে মুক্ত ছিলেন। কিন্তু তারা তাঁর নিকট যেত এবং তাদের বিদআতকে প্রচার ও প্রসারের লক্ষ্যে সে বিদআতের স্বপক্ষে তাঁর বক্তব্য তালাশ করত, কারণ তিনি সুন্নাহর ইমাম ছিলেন এবং মানুষের কাছে তাঁর বিশেষ মর্যাদা ছিল। একইভাবে পাপিষ্ঠ লোকেরা আল-হাসানের প্রতি ঘৃণা ও বিরক্তি জ্ঞাপন করত কারণ মন্দ কাজ ও অনৈতিক আচরণ থেকে তিনি তাদেরকে বিরত রাখতেন; যে কারণে তারাও তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করত। আইয়্যূব আস-সাখতিয়ানী (মৃ. ১৩১হি) – রাহিমাহুল্লাহ – আরও বলেছেন: “দুই ধরনের লোক আল-হাসানের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করেছে: একটি সম্প্রদায় (অর্থাৎ ক্বাদারিয়্যাহ) যারা ক্বদর অস্বীকার করেছে এবং আল-হাসানের নামে এটিকে মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিয়েছে। (২) আর এমন এক সম্প্রদায় যাদের অন্তরে আল-হাসানের প্রতি বিদ্বেষ আছে। [সিয়ারু আ’লামিন নুবালা (৪/৫৭৯), সুনান আবী দাঊদ (নং. ৪৬২২) এবং শারহুস-সুন্নাহ (৪/৬৮১) আল-লালাকায়ী]।
ইবনু তাইমিয়্যাহ (মৃ. ৭২৮হি) – রাহিমাহুল্লাহ – মিনহাজুস-সুন্নাহ আন-নাবাউইয়্যাহ (৩/২৪-২৫) গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন: “আর এ কারণে অনেকেই ক্বাদারী না হওয়া সত্ত্বেও (ক্বদর) অস্বীকার করার মাযহাব (আক্বীদাহ) দ্বারা অভিযুক্ত ছিলেন, কারণ তারা ক্বদরকে প্রমাণ (অজুহাত) বানিয়ে গুনাহের কাজকে অনুমোদন দিতেন না। যেমন ইমাম আহমাদ – রাহিমাহুল্লাহকে – জিজ্ঞেস করা হয়েছিল: ‘ইবনু আবী যি‘ব কি ক্বাদারী ছিলেন?’ তিনি বললেন: ‘সাধারণ মানুষ, এমন প্রতিটি ব্যক্তি যে তাদের গুনাহ ও অবাধ্যতাকে কঠোরভাবে তিরস্কার করতো, তারা তার ব্যাপারে বলতো: ‘সে ক্বাদারী।’ আর কথিত আছে যে, এ কারণেই আল-হাসানকে ক্বাদারী (ক্বদর অস্বীকারকারী) বলা হতো, কারণ তিনি গুনাহের কাজকে কঠোরভাবে তিরস্কার করতেন ও মানুষকে সেগুলো থেকে নিষেধ করতেন।”
আইয়্যূব আস-সাখতিয়ানী (মৃ. ১৩১হি) – রাহিমাহুল্লাহ – বলেছেন: “আমি আল-হাসানের নিকট পৌঁছেছি এবং আল্লাহর কসম তিনি (ক্বাদারীদের আক্বীদাহ)-এর ভিত্তিতে কথা বলতেন না।” [শারহুস সুন্নাহ, আল-লালাকায়ী (১/১৩৩)]
ইমাম আয-যাহাবী – রাহিমাহুল্লাহ – সিয়ারু আ’লামিন নুবালা গ্রন্থে – আল-হাসান আল-বাসরী – রাহিমাহুল্লাহ – এর জীবনীর অধ্যায়ে উল্লেখ করেছেন: “আবূ সাঈদ বিন আল-আ’রাবী বলেছেন: ‘এবং তিনি (আল-হাসান) আল-ক্বদর (অস্বীকার করার) বিদআত ও অন্যান্য বিদআত থেকে মুক্ত ছিলেন।’ আমি (আয-যাহাবী) বলছি: আর নিশ্চয়ই যা কিছু ইতোমধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে এত্থেকে আল-হাসান (আল-বাসরী) যে ক্বদরে বিশ্বাসী ছিলেন তা একাধিক সূত্রে প্রমাণিত হয়েছে।” বরং, আমরা দেখতে পাই যে আল-হাসান আল-বাসরী ক্বাদারিয়্যাহ সম্প্রদায় থেকে সতর্ক করতেন ও তাদেরকে খণ্ডন করতেন। ‘আব্দুল ‘আযীয আল-আত্তার বলেন: আমি আমার বাবা ও চাচাকে বলতে শুনেছি যে, তারা উভয়েই আল-হাসানকে এই বলে মা’বাদ আল-জুহানীর সাথে বসতে নিষেধ করতে শুনেছেন: “তোমরা তার সাথে বসবে না, কারণ সত্যিই সে পথভ্রষ্ট অন্যকে পথভ্রষ্টকারী (দ্বল্লুন মুদ্বিল্লুন)।”
Share this:
- Share on X (Opens in new window) X
- Share on Facebook (Opens in new window) Facebook
- Email a link to a friend (Opens in new window) Email
- Share on Pinterest (Opens in new window) Pinterest
- Share on Telegram (Opens in new window) Telegram
- Share on WhatsApp (Opens in new window) WhatsApp
- Print (Opens in new window) Print
- Share on LinkedIn (Opens in new window) LinkedIn
- Share on Tumblr (Opens in new window) Tumblr

















