آثار لا إله إلا الله
লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর প্রভাব
এই কালিমাহ যখন সত্যবাদিতা ও ইখলাসের সাথে বলা হয় এবং এর দাবি অনুযায়ী প্রকাশ্যে ও গোপনে আমল করা হয় তখন ব্যক্তি ও সমাজের উপর এর প্রশংসনীয় প্রভাব পাওয়া যায়। তন্মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ হলো:
১) এর মাধ্যমে ঐকমত্য হওয়া যায় যার ফলস্বরূপ মুসলিমরা শক্তি অর্জন করতে পারে ও তাদের শত্রুদের উপর বিজয়ী হতে পারে ; কারণ তখন তারা একই দীন (অর্থাৎ ধর্ম) পালন করে ও একই ‘আক্বীদাহ পোষণ করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:
وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا ۚ
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:
هُوَ الَّذِیۡۤ اَیَّدَکَ بِنَصۡرِهٖ وَ بِالۡمُؤۡمِنِیۡنَ ﴿ۙ۶۲﴾ وَ اَلَّفَ بَیۡنَ قُلُوۡبِهِمۡ ؕ لَوۡ اَنۡفَقۡتَ مَا فِی الۡاَرۡضِ جَمِیۡعًا مَّاۤ اَلَّفۡتَ بَیۡنَ قُلُوۡبِهِمۡ
‘আক্বীদার ব্যাপারে মতানৈক্য হলে এর দ্বারা বিভক্তি, বিরোধ ও হানাহানির সৃষ্টি হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
اِنَّ الَّذِیۡنَ فَرَّقُوۡا دِیۡنَهُمۡ وَ کَانُوۡا شِیَعًا لَّسۡتَ مِنۡهُمۡ فِیۡ شَیۡءٍ
“নিশ্চয়ই যারা তাদের দীনকে ভাগ করেছে ও দলে দলে বিভক্ত হয়েছে তাদের সাথে আপনার কোনো সম্পর্ক নেই।’’[3]
এবং আল্লাহ তাআলা বলেন:
تَقَطَّعُوۡۤا اَمۡرَہُمۡ بَیۡنَہُمۡ زُبُرًا ؕ کُلُّ حِزۡبٍۭ بِمَا لَدَیۡہِمۡ فَرِحُوۡنَ ﴿۵۳﴾ـ
ঈমান ও তাওহীদের ‘আক্বীদাহ যা হলো লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর মর্মার্থ, এটা ব্যতীত কোনো কিছুই মানুষের মধ্যে ঐক্য তৈরি পারবে না। আরবদের মুসলিম হওয়ার আগের ও পরের অবস্থা লক্ষ্য করলে আপনি এই বিষয়টি দেখতে পাবেন।
২) তাওহীদের অনুসারী সমাজ যেখানে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর দাবি অনুযায়ী দীন পালন করা হয় সেই সমাজে নিরাপত্তা ও প্রশান্তি বিদ্যমান থাকে; কারণ সেই সমাজের প্রত্যেকটা সদস্য তাই গ্রহণ করে যা আল্লাহ তা‘আলা হালাল করেছেন এবং তা বর্জন করে যা আল্লাহ তা‘আলা হারাম করেছেন; এটা তাদের এই ‘আক্বীদার প্রভাবে হয়ে থাকে যে ‘আক্বীদাহ তাদের উপরে এই বিষয়গুলোকে অপরিহার্য করে দেয়, তাই সে আক্রমণ, অত্যাচার ও বাড়াবাড়ি করা থেকে দূরে থাকে; এর পরিবর্তে
إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ
“মুমিনরা একে অপরের ভাই’’[5]
আল্লাহর এই বাণী অনুযায়ী সেখানে পারস্পরিক সহযোগিতা, ভালোবাসা ও বন্ধুত্বের জায়গা পায়। এই কালিমার প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের আগে ও পরে আরবদের (অবস্থার দিকে দৃষ্টিপাত) করলে এটা স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়। তারা পূর্বে পরস্পরের শত্রু ছিল; তারা পরস্পর হানাহানি করত; হত্যা, লুটতরাজ ও ছিনতাই নিয়ে তারা গর্ব করত। আর যখন তারা ইসলাম গ্রহণ করল তখন তারা একে অপরের প্রিয় ভাই হয়ে গেল যেমনটা আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
مُحَمَّدٌ رَّسُوۡلُ اللّٰہِ ؕ وَ الَّذِیۡنَ مَعَہٗۤ اَشِدَّآءُ عَلَی الۡکُفَّارِ رُحَمَآءُ بَیۡنَہُم
“মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল; আর তাঁর সাথে যারা আছে তারা কাফিরদের প্রতি কঠোর; পরস্পরের প্রতি তারা দয়াশীল।’’[6]
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:
وَ اذۡکُرُوۡا نِعۡمَتَ اللّٰہِ عَلَیۡکُمۡ اِذۡ کُنۡتُمۡ اَعۡدَآءً فَاَلَّفَ بَیۡنَ قُلُوۡبِکُمۡ فَاَصۡبَحۡتُمۡ بِنِعۡمَتِہٖۤ اِخۡوَانًا ۚ
“তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহকে স্মরণ করো; তোমরা ছিলে পরস্পর শত্রু; আল্লাহ তোমাদের অন্তরসমূহকে জুড়ে দিয়েছেন। অতঃপর তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহে পরস্পর ভাই ভাই হয়ে গিয়েছ।’’[7]
৩) (এই কালিমাহ বাস্তবায়ন করলে) পৃথিবীতে নেতৃত্ব ও প্রতিনিধিত্ব পাওয়া যায়, দীন (ধর্ম) থাকে নিষ্কলুষ, বিভিন্ন (বাতিল) চিন্তাধারা ও মতাদর্শের প্রতি (মানুষের) ঝুঁকে যাওয়ার প্রবণতার সময় অবিচল থাকা যায়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
وَعَدَ اللّٰہُ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا مِنۡکُمۡ وَ عَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ لَیَسۡتَخۡلِفَنَّہُمۡ فِی الۡاَرۡضِ کَمَا اسۡتَخۡلَفَ الَّذِیۡنَ مِنۡ قَبۡلِہِمۡ ۪ وَ لَیُمَکِّنَنَّ لَہُمۡ دِیۡنَہُمُ الَّذِی ارۡتَضٰی لَہُمۡ وَ لَیُبَدِّلَنَّہُمۡ مِّنۡۢ بَعۡدِ خَوۡفِہِمۡ اَمۡنًا ؕ یَعۡبُدُوۡنَنِیۡ لَا یُشۡرِکُوۡنَ بِیۡ شَیۡئًا ؕ
“তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে তাদেরকে আল্লাহ ওয়াদা দিয়েছেন যে, অবশ্যই তিনি তাদেরকে জমিনে প্রতিনিধিত্ব দান করবেন; যেমনিভাবে তাদের পূর্ববর্তীদেরকে প্রতিনিধিত্ব দান করেছিলেন। তিনি অবশ্যই তাদের দীন (ধর্মকে) প্রতিষ্ঠিত করবেন যে দীনকে তিনি তাদের জন্য পছন্দ করেছেন; তাদের ভয়-ভীতির পরে তিনি তাদেরকে নিরাপত্তা দান করবেন এই শর্তে যে, তারা আমার ইবাদাত করবে (এবং) আমার সাথে কোনো কিছুকে শরীক করবে না।’’[8]
আল্লাহ তা‘আলা এই মহান দাবিসমূহ অর্জনের সাথে একমাত্র তাঁর ইবাদত করা ও তার সাথে কাউকে শরীক না করাকে যুক্ত করেছেন; যা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর অর্থ ও দাবি।
৪) যে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলে ও তার দাবি অনুযায়ী আমল করে সে আত্মিক ও মানসিক প্রশান্তি পায়। কারণ সে একজন রবের ইবাদাত করে; তিনি কি চান সে তা জানে; আর যেসব কাজে তিনি সন্তুষ্ট হন সে তা করে। আর সে জানে কিসে তিনি রাগান্বিত হন তা থেকে সে দূরে থাকে। আর যে বিভিন্ন (বাতিল) ইলাহের ইবাদত করে তার অবস্থা এর বিপরীত। এসকল ইলাহের উদ্দেশ্য হয় ভিন্ন ভিন্ন। তাদের পরিচালনাও হয় ভিন্ন ভিন্ন। যেমনটা আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
أَأَرْبَابٌ مُّتَفَرِّقُونَ خَيْرٌ أَمِ اللَّهُ الْوَاحِدُ الْقَهَّارُ
“বিভিন্ন রব উত্তম, না প্রতাপশালী এক আল্লাহ?’’[9]
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:
ضَرَبَ اللّٰہُ مَثَلًا رَّجُلًا فِیۡہِ شُرَکَآءُ مُتَشٰکِسُوۡنَ وَ رَجُلًا سَلَمًا لِّرَجُلٍ ؕ هلۡ یَسۡتَوِیٰنِ مَثَلًا ؕ
“আল্লাহ একটি দৃষ্টান্ত পেশ করছেন: একজন ব্যক্তির অনেক মালিক যারা পরস্পর বিরোধী আর অন্য এক ব্যক্তি যে একজন মালিকের অনুগত। এই দুজনের অবস্থা কি সমান?’’[10]
ইমাম ইবনুল ক্বাইয়িম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, আল্লাহ তা‘আলা এই দৃষ্টান্তটা মুশরিক ও মুওয়াহ্হিদের (তাওহীদের অনুসারী) জন্য দিয়েছেন। মুশরিকের অবস্থা সেই কৃতদাসের মতো যার মালিক অনেকজন যারা পরস্পর বিরোধী, বিবাদী ও প্রতিদ্বন্দ্বী। আর মুতাশাকিস বলতে তাকে বুঝায় যার চরিত্র খারাপ। মুশরিক যেহেতু বহু ইলাহের ইবাদাত করে তাই তাকে এমন দাসের সাথে তুলনা দেওয়া হয়েছে যার মালিক এমন একদল লোক যারা তার সেবা পাওয়ার জন্য প্রতিযোগিতা করে, তাই তাদের সকলের সন্তুষ্টি অর্জন করা তার জন্য সম্ভব নয়। আর তাওহীদের অনুসারী যেহেতু শুধু আল্লাহরই ইবাদাত করে তাই তার উদাহরণ হলো ঐ দাসের মতো যার একজনই মালিক; সে তার মালিকের আনুগত্য স্বীকার করেছে, তার উদ্দেশ্য সে জানে ও তাকে সন্তুষ্ট করার উপায়ও সে জানে। তাই সে তাকে নিয়ে বিবাদকারী মালিকদের ঝগড়া-বিবাদ থেকে রক্ষা পেয়েছে। বরং সে তার মালিকের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে, তাকে নিয়ে কোনো বিবাদ নেই। সেই সাথে তার মালিক তার প্রতি দয়া, সহানুভূতি ও অনুগ্রহ করে আর যে বিষয়গুলোতে তার কল্যাণ আছে সেদিকে মালিক লক্ষ্য রাখে। এ দুই দাসের অবস্থা কি সমান ?
৫) দুনিয়া ও আখিরাতে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর অনুসারীরা উঁচু মর্যাদার অধিকারী হবে । আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
حُنَفَاءَ لِلَّهِ غَيْرَ مُشْرِكِينَ بِهِ ۚ وَمَن يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَكَأَنَّمَا خَرَّ مِنَ السَّمَاءِ فَتَخْطَفُهُ الطَّيْرُ أَوْ تَهْوِي بِهِ الرِّيحُ فِي مَكَانٍ سَحِيقٍ
“’আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ হয়ে তার সাথে কাউকে তারা শরীক না করে। আর যে আল্লাহর সাথে শরীক করে সে যেন আকাশ থেকে পড়লো, অতঃপর পাখি তাকে ছোঁ মেরে নিয়ে গেল অথবা বাতাস তাকে দূরবর্তী কোনো স্থানে উড়িয়ে নিয়ে গেল।’’[11]
এই আয়াতটা প্রমাণ বহন করে যে তাওহীদ হলো উচ্চতা ও মহত্ত্বের বিষয় এবং শিরক হলো পতন ও নীচতা ।
আল্লামাহ ইবনুল ক্বাইয়িম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, আল্লাহ তা‘আলা ঈমান ও তাওহীদের উচ্চতা, প্রশস্ততার ও মর্যাদার সাদৃশ্য দিয়েছেন আকাশের সাথে যেটা হলো তার (ঈমান আমলের) ঊর্ধ্বে উঠা ও নিচে নামার স্থান। সেখান থেকেই তা জমিনে অবতরণ করেছে ও জমিন থেকেই তা আকাশে ফিরে যাবে। আর সংকটাপন্ন অবস্থা ও বিরতিহীন যন্ত্রণার দিক থেকে ঈমান ত্যাগকারীর তুলনা দিয়েছেন আকাশ থেকে অতি নিম্নে পতিত ব্যক্তির সাথে। আর ঐ পাখির তুলনা দিয়েছেন যা তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ছিনিয়ে নেয় এবং তা ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে, ঐ সকল শয়তানদের সাথে যাদেরকে আল্লাহ তা‘আলা প্রেরণ করেন এবং তারা তাকে প্ররোচিত, অশান্ত, উদ্বিগ্ন করে ও ধ্বংস করে । আর যে বাতাস তাকে দূরবর্তী স্থানে নিয়ে যায় তা হলো তার প্রবৃত্তি যা তাকে সর্বনিম্ন স্থানে নামিয়ে আনে ও আকাশ থেকে অনেক দূরের কোনো স্থানে নিজেকে নিক্ষেপ করতে প্ররোচিত করে।
৬) এই তাওহীদের মাধ্যমে জান, মাল ও সম্মান রক্ষা পায়। রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
“আমি মানুষের বিরুদ্ধে লড়াই করতে আদিষ্ট হয়েছি যতক্ষণ না তারা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলে। যদি তারা এটা বলে তাহলে তাদের জান ও মাল আমার থেকে রক্ষা করতে পারবে, তবে এর হক সংশ্লিষ্ট বিষয়ের কথা ভিন্ন।’’[12]
আর এখানে রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বাণী ‘এর হক সংশ্লিষ্ট বিষয়ের কথা ভিন্ন’ এর অর্থ : যদি তারা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলে কিন্তু এর হকগুলো আদায় না করে – আর হকগুলো হলো তাওহীদের দাবিগুলো পূরণ করা, শিরক থেকে দূরে থাকা ও ইসলামের স্তম্ভগুলোর অনুসরণ করা – (এগুলো না করলে শুধু) লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলা তাদের জান ও মালকে রক্ষা করবে না, বরং তাদেরকে হত্যা করা হবে। তাদের ধন-সম্পদকে মুসলিমদের জন্য গনিমত হিসাবে দখল করা হবে, যেমনটা নাবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও সাহাবীরা তাদের সাথে করেছেন।
এছাড়া ব্যক্তি ও সমাজে ইবাদাত, লেনদেন ও আদব-আখলাক্বের ক্ষেত্রে এই কালিমার বিরাট প্রভাব রয়েছে।
আল্লাহই তাওফীক্বদাতা। আমাদের নাবী মুহাম্মাদ, তাঁর পরিবারবর্গ ও তাঁর সকল সাহাবীদের উপর সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক।
الْحَمْدُ لِله الَّذِي بِنِعْمَتِهِ تَتِمُّ الصَّالِحَاتُ
“Praise is to Allāh by Whose grace good deeds are completed.”
গ্রন্থ : মা’না লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ওয়া মুকতাদাহা ওয়া আসারুহা ফিল ফারদি ওয়াল মুজতামা’, পৃষ্ঠা: ৫৬- ৬২
লেখক: শাইখ সালিহ বিন ফাওযান বিন আব্দুল্লাহ আল-ফাওযান
প্রকাশনী : মদিনা ইউনিভার্সিটি, মদিনা। তৃতীয় সংস্করণ (১৪২২ হিজরী, ২০০২ খৃষ্টাব্দ)
Share this:
- Share on X (Opens in new window) X
- Share on Facebook (Opens in new window) Facebook
- Email a link to a friend (Opens in new window) Email
- Share on Pinterest (Opens in new window) Pinterest
- Share on Telegram (Opens in new window) Telegram
- Share on WhatsApp (Opens in new window) WhatsApp
- Print (Opens in new window) Print
- Share on LinkedIn (Opens in new window) LinkedIn
- Share on Tumblr (Opens in new window) Tumblr
- Share on Pocket (Opens in new window) Pocket

















