জাদু (বা জাদুবিদ্যা) সত্য এবং বাস্তব। এর অস্তিত্ব আছে এবং তা সত্য। এটি আল্লাহর ইচ্ছায় এবং তাঁর নির্দেশে ঘটে, যখন তান্ত্রিক এবং জাদুকররা শয়তানদের আনুগত্য, দাসত্ব এবং উপাসনা করে, এবং এর বিপরীতে তারা (শয়তানরা) তাদের (জাদুকরদের) চাহিদা অনুযায়ী তাদেরকে সাহায্য করে।
সিহর এর অর্থ
(السحر) শব্দটি “জাদু” শব্দের সমার্থক যার অর্থ হলো:
عبارة عما خفي ولطف سببه
“এমন কথা বা কাজ যার কারণ, পদ্ধতি বা মাধ্যম অদৃশ্য এবং গোপন।”
সংক্ষেপে, এটি সেই গোপন, লুকায়িত, অদৃশ্য কারণগুলোকে বুঝায় যা দৃশ্যমান প্রভাবগুলোর পিছনে কাজ করে। এটি আভিধানিক অর্থ। এর শারঈ অর্থ হলো, যেমনটি শাইখ সালিহ আল-ফাওযান “কিতাব আত-তাওহীদ” গ্রন্থের ব্যাখ্যায় বলেছেন:
وهو عزائم ورقى ، وكلام يتكلم به ، وأدوية وتدخينات ، وله حقيقة . ومنه ما يؤثر في القلوب والأبدان فيُمرض ويقتُل ويفرق بين المرء وزوجه ، وتأثيره بإذن الله الكوني القَدَريّ ، وهو عمل شيطاني ، وكثير منه لا يتوصل إليه إلا بالشرك والتقرب إلى الأرواح الخبيثة بما تحب ، والتوصل إلى استخدامها بالإشراك بها
“এর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে লিখিত বা উচ্চারিত মন্ত্র, তরল ঔষধি (যা পান করানো হয় বা ঢেলে দেওয়া হয়) এবং ধোঁয়া যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা বস্তুকে প্রভাবিত করা হয়। এর সত্যতা আছে। এমন বিষয় এর অন্তর্ভুক্ত রয়েছে যা অন্তর এবং দেহকে প্রভাবিত করে, যার ফলে তারা (প্রভাবিত ব্যক্তিরা) অসুস্থ হয় অথবা মৃত্যুবরণ করে, এবং এটি স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদ তৈরি করে। আল্লাহর ইচ্ছায় এর প্রভাব কার্যকর হয় যা তাঁর মহাজাগতিক পূর্বনির্ধারণের অংশ। এবং এটি একটি শয়তানী কাজ। এর বেশিরভাগই বাস্তবায়িত হয় শিরকী কাজের দ্বারা, এবং খবীস জিনরা যা পছন্দ সেগুলো করার মাধ্যমে, এবং তাদের নৈকট্য অর্জন করার মাধ্যমে, এবং আল্লাহর সঙ্গে তাদেরকে শরীক করার মধ্য দিয়ে তাদেরকে ব্যবহার করার মাধ্যমে ।”
“চিকিৎসার” আড়ালে জাদুবিদ্যার চর্চা
এখানে “ঔষধি” এর কথা উল্লেখ করার উদ্দেশ্য হলো “রসায়ন” শাস্ত্রের সঙ্গে জাদুবিদ্যার যে ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে তা তুলে ধরা, যা আধ্যাত্মিকতা ও দর্শনকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে, এবং তা ঔষধির ব্যবহারকে জাদুবিদ্যা চর্চার অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছে। প্রায়শই জাদুকররা নিজেদেরকে “চিকিৎসক” এবং “আরোগ্যদানকারী” হিসেবে পরিচয় দেয়। এই বিষয়টি শাইখ সালিহ আল-ফাওযান পরবর্তীতে ব্যাখ্যা করেছেন:
ومما يجب التنبيه عليه والتنبه له : أن السحرة والكهان والعرافين يعبثون بعقائد الناس بحيث يظهرون بمظهر الأطباء ، فيأمرون المرضى بالذبح لغير الله ؛ بأن يذبحوا خروفًا صفته كذا وكذا ، أو دجاجة ، أو يكتبون لهم الطلاسم الشركية ، والتعاويذ الشيطانية بصفة حروز يعلقونها في رقابهم ، أو يضعونها في صناديقهم ، أو في بيوتهم
“আর যে বিষয়ে সচেতন থাকা এবং অন্যদের অবহিত করা ওয়াজিব তা হলো, জাদুকর, জ্যোতিষী এবং গণকরা ডাক্তার অথবা চিকিৎসক সেজে মানুষের আক্বীদাহ-বিশ্বাস নিয়ে ঠাট্টা করে। উদাহরণস্বরূপ তারা এমন মেষশাবক বা মুরগি জবাই করতে বলে যার এমন এমন বৈশিষ্ট্য আছে। এর মাধ্যমে তারা অসুস্থ ব্যক্তিকে গাইরুল্লাহর নামে জবাই করার নির্দেশ দেয়। অথবা তারা তাদের জন্য শিরকী জাদুমন্ত্র লিখে দেয়, এবং তারা শয়তানী জাদুমন্ত্র লিখে তাবিজ বানিয়ে তাদের গলায় ঝুলিয়ে দেয়, অথবা সেটি তাদের সিন্দুকে অথবা তাদের বাড়িতে রাখে।”
জাদুর প্রকারভেদ
জাদু দুই প্রকার, ক) সিহর হাক্বীক্বী এবং খ) সিহর তাখয়ীলী । জাদুর মাধ্যমে যে বাস্তব প্রভাব তৈরি হয় তাকে “সিহর হাক্বীক্বী” বলা হয়, যার মাধ্যমে কোনো ব্যক্তির সঙ্গে তার স্ত্রীর বিচ্ছেদ তৈরি হয়, কোনো ব্যক্তি অসুস্থ হয়, সে মৃত্যুবরণ করে ইত্যাদি। এগুলো সবই জাদুর বাস্তব প্রভাব। আর যখন কোনো ব্যক্তি এমন কাজ করেছে বলে কল্পনা করা যা সে বাস্তবে করেনি, অথবা যখন সে কোনো বস্তুকে এমনভাবে দেখে যা বাস্তবে তেমনটি নয় তাকে “সিহর তাখয়ীলী” বলা হয়, অর্থাৎ এটি তার চোখ (এবং মস্তিষ্কের) ভ্রম। এছাড়াও ছুরিকাঘাতের পরও রক্ত প্রবাহিত না হওয়া, এক বস্তুকে অন্য বস্তুতে পরিণত করা, গলায় তলোয়ার ঢুকানো, আগুনের মধ্য দিয়ে হাটা বা তা গিলে ফেলার মতো কার্যকলাপ আছে যা কিছু মানুষ করে। তন্মধ্যে কিছু হলো নিছক ভেল্কিবাজি যা চোখকে ধোঁকা দেয়, এবং অন্যান্যগুলোতে শয়তানদের ব্যবহার করা হয়।
জাদুর হুকুম
জাদু হারাম এবং কুফরী, কারণ আল্লাহ তাআলা ঘোষণা দিয়েছেন যে, আখিরাতে জাদুকরের (ডাইনি, তান্ত্রিক) কোনো অংশ থাকবে না এবং এই হুকুম একটি আয়াতের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা সূরা আল-বাক্বারার আয়াতে সুলাইমান (আলাইহিস সালাম), হারূত, মারূত এবং ব্যাবিলন (বাবিল) সম্পর্কে বলেছেন:
وَمَا كَفَرَ سُلَيْمَانُ وَلَكِنَّ الشَّيَاطِينَ كَفَرُوا
“এবং সুলাইমান কুফরী করেনি, বরং শয়তানরাই কুফরী করেছিল।”
إِنَّمَا نَحْنُ فِتْنَةٌ فَلا تَكْفُرْ
“আমরা (দুই ফেরেশতা, হারূত এবং মারূত) পরীক্ষাস্বরূপ সুতরাং কুফরী করো না…”
وَلَقَدْ عَلِمُوا لَمَنِ اشْتَرَاهُ مَا لَهُ فِي الآخِرَةِ مِنْ خَلاقٍ
“আর তারা নিশ্চিতভাবে জানত, যে ব্যক্তি এটি ক্রয় করবে, আখিরাতে তার কোনো অংশ থাকবে না।” [সূরা আল-বাক্বারাহ, ২:১০২]
জাদু সাতটি ধ্বংসাত্মক পাপের অন্তর্ভুক্ত
বুখারী, মুসলিম, নাসায়ী এবং আবূ দাঊদের হাদীসে বর্ণিত হয়েছে:
عن أبي هريرة أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال: اجتنبوا السبع الموبقات. قالوا: يا رسول الله وما هن؟ قال: الشرك بالله، والسحر، وقتل النفس التي حرم الله قتلها إلا بالحق، وأكل الربا، وأكل مال اليتيم، والتولي يوم الزحف، وقذف المحصنات الغافلات المؤمنات
আবূ হুরাইরা (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: “তোমরা সাতটি ধ্বংসাত্মক বিষয় থেকে বেঁচে থাকো।” তারা (সাহাবীরা) বললেন: ‘হে আল্লাহর রাসূল! সেগুলো কী?’ তিনি বললেন, “আল্লাহর সাথে শরীক করা, জাদু, বৈধ কারণ ব্যতীত এমন কাউকে হত্যা করা যাকে হত্যা করা আল্লাহ হারাম করেছেন, সুদ খাওয়া, ইয়াতীমের সম্পদ ভক্ষণ করা, যুদ্ধের ময়দান থেকে পলায়ন করা এবং সতী-সাধ্বী, সরলমনা ঈমানদার নারীদের উপর ব্যভিচারের অপবাদ দেওয়া।”’ [সহীহুল বুখারী নং (২৭৬৬)]
এই হাদীসে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জাদুকে শিরকের সঙ্গে তুলনা করেছেন, কারণ জাদুর জন্য শয়তানদের সাহায্যের প্রয়োজন হয় এবং এটি শুধু তাদের আনুগত্য ও ইবাদতের মাধ্যমেই ঘটে।
জাদু থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করা
জাদুর ভয়াবহতা এবং এর গোপন ও অদৃশ্য প্রভাব সম্পর্কে জানার পর, একজন মুমিনের উচিত এটি (জাদু) এবং এর (জাদুবিদ্যা) চর্চাকারীদের থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করা। জাদু, শয়তান এবং অন্যান্য অনিষ্ট থেকে সুরক্ষা লাভের জন্য আল-মুআওয়্যিযাতাইন অর্থাৎ কুরআনের শেষ দু’টি সূরা (সূরা আল-ফালাক্ব এবং সূরা আন-নাস) নাযিল হয়েছে। একইভাবে, কুরআনের সর্বশ্রেষ্ঠ আয়াত আয়াতুল কুরসি, এবং ঘরে কুরআন তিলাওয়াত, বিশেষ করে সূরা আল-বাক্বারাহ (তিলাওয়াত করা বিশেষভাবে প্রয়োজন)। এছাড়াও, বেশি বেশি যিকির এবং দুআ, যেমন সকাল ও সন্ধ্যার দুআ এবং সাধারণভাবে আল্লাহর যিকির শয়তান ও জাদু থেকে সুরক্ষা দেয়। এগুলো ব্যক্তিগত ফরয আমলের পাশাপাশি অতিরিক্ত আমল যা আল্লাহর আনুগত্যের নিয়তে অবশ্যই পালন করা উচিত।
Share this:
- Share on X (Opens in new window) X
- Share on Facebook (Opens in new window) Facebook
- Email a link to a friend (Opens in new window) Email
- Share on Pinterest (Opens in new window) Pinterest
- Share on Telegram (Opens in new window) Telegram
- Share on WhatsApp (Opens in new window) WhatsApp
- Print (Opens in new window) Print
- Share on LinkedIn (Opens in new window) LinkedIn
- Share on Tumblr (Opens in new window) Tumblr
- Share on Pocket (Opens in new window) Pocket

















