Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors
Generic selectors
Exact matches only
Search in title
Search in content
Post Type Selectors

তামঈ এবং মুমায়্যিআদের মানহাজের খণ্ডনে সালাফগণের অবস্থান সম্পর্কিত আলোচনা

বিদআতী ও পথভ্রষ্ট সম্প্রদায়ের প্রতি সালাফগণের আপসহীন দৃষ্টিভঙ্গি এবং কঠোর অবস্থান সম্পর্কিত কিছু বাছাইকৃত বর্ণনা।

১. ভূমিকা

এখানে বিদআতী ও পথভ্রষ্ট সম্প্রদায়ের প্রতি সালাফগণের আপসহীন দৃষ্টিভঙ্গি এবং কঠোর অবস্থান সম্পর্কে কিছু বাছাইকৃত বর্ণনা দেওয়া হলো, যারা আল্লাহর পথে দুর্বৃত্তদের মতো ওত পেতে থাকে, আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে বিচ্যুত করে, তাদেরকে বিভ্রান্ত ও প্রতারিত করে এবং তাদের রব, তাঁর  দীন অথবা সালাফী আক্বীদাহ অথবা এর নির্ভুল মানহাজ সম্পর্কে তাদের অন্তরে সন্দেহ তৈরি করে। এটি [অর্থাৎ বিদআতীদের বিরুদ্ধে সালাফগণের আপসহীন দৃষ্টিভঙ্গি] তামঈ এবং মুমায়্যিআদের মানহাজের বিপরীত।

তামঈ অর্থ হলো “নরম হওয়া, গলে যাওয়া।” এটি সেই শিথিল, নরম, মাখনের মতো মানহাজকে বুঝায় – যা সামান্য তাপেই গলতে শুরু করে – যা বর্তমান যুগে সালাফিয়্যাহ সম্পর্কে সন্দেহ পোষণকারী ও মিথ্যা দাবিদারেরা হিযবী এবং বিদআতীদের প্রতি সমর্থনের উদ্দেশ্যে গ্রহণ করেছে।

এটি এক প্রকার শিথিলতা ও নমনীয়তার (মানহাজ) যা আহলুস সুন্নাহ এবং আহলুল বিদআহর মাঝে যে সামাজিক ও মানহাজগত পার্থক্য রয়েছে সেগুলো ভেঙে দেওয়াকে অন্তর্ভুক্ত করে। এটি আহলুল বিদআহ অথবা তাদের মধ্যে কিছু ব্যাক্তির প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করা, তাদেরকে প্রশ্রয় দেওয়া এবং প্রশংসা করা এবং এর পাশাপাশি আহলুস সুন্নাহর প্রতি শত্রুতা ও বিদ্বেষ পোষণ করা বা তাদের ব্যাপারে সন্দেহ তৈরি করাকেও অন্তর্ভুক্ত করে।

এই মানহাজ বেশ কিছু বছর ধরে মানুষের আচরণে বিদ্যমান ছিল এবং তা সক্রিয় ভূমিকা পালন করে এসেছে, কিন্তু এরপরও অধিকাংশ মানুষই তা চিনতে বা শনাক্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে, তবে অবশ্যই সেই আলেমগণ  এর ব্যতিক্রম যারা এই বিষয়ে গভীর জ্ঞান রাখেন।

তবে, আজ আবূ আল-হাসান আল-মিসরী আল-মা‘রিবীর ফিতনার মধ্য দিয়ে সালাফীদের নিকট এই ধ্বংসাত্মক আচরণের ধরনটি স্পষ্ট হয়েছে, এবং তারা বিগত বছরগুলোর দিকে তাকিয়ে এই বিষয়টি অনুধাবন করতে পেরেছে, এবং তারা সত্যিকারার্থে অসংখ্য ফিতনার মধ্য দিয়ে তামঈর এই ধরনটি চিনতে এবং স্মরণ করতে সক্ষম হয়েছে যা সালাফিয়্যার দাবিদার অনেকের আচরণের মধ্যে প্রকাশ পেয়েছিল।

২. খণ্ডন ও সতর্ক করাকে দীনী নসীহত ও রহমত হিসেবে বিবেচনা করা হয়

খণ্ডন ও সতর্ক করাকে সমালোচিত ব্যক্তির প্রতি এবং সাধারণভাবে মুসলিম উম্মাহর প্রতি নসীহত (উপদেশ) ও রহমত (দয়া) হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

 

সুন্নাহর অনুসারীদের মাঝে এমন ব্যক্তিবর্গ থাকতে পারেন যাদের ইলম ও বিশেষ মর্যাদা আছে, কিন্তু তারা ভুলে পতিত হতে পারেন, এমনকি তারা বিভ্রান্তিতেও পড়তে পারেন, এবং সুন্নাহর উপর দৃঢ় ও সুপ্রতিষ্ঠিত আলেমগণ  তাদেরকে সংশোধন করতে পারেন ও উপদেশ দিতে পারেন, এবং যখন ও যেখানে প্রয়োজন তাদেরকে খণ্ডন করতে পারেন ও তাদের বিরুদ্ধে সতর্ক করতে পারেন।

 

মুমায়্যিআহ – যারা মানহাজকে শিথিল করে, যারা সামান্যতেই অস্থির ও স্পর্শকাতর স্বভাবের হয় – তাদের এই বিষয়গুলোর প্রতি বিতৃষ্ণা থাকে, বিশেষ করে যখন সুন্নাহর অনুসারী হিসেবে সুপরিচিত কোনো ব্যক্তি আহলুস সুন্নাহর বিরোধিতা করে, তাদেরকে প্রত্যাখান করে, ভুল করে ও পথভ্রষ্ট হয় এবং (সে কারণে) তাকে প্রমাণসহ খণ্ডন করা হয়।

ইমাম আহমাদ (رحمه الله) সম্পর্কে ইবন আল-জাওযী বলেছেন: [১]

আর ইমাম আবূ আব্দুল্লাহ আহমাদ বিন হাম্বাল, তার কঠোরভাবে সুন্নাহর অনুসরণ এবং বিদআত থেকে সাবধান করার কারণে একদল সম্মানিত আলেমের ব্যাপারেও সতর্ক করতেন যখন তাদের মাঝে সুন্নাহ বিরোধী কিছু প্রকাশ পেত।  এবং (তাদের বিরুদ্ধে) তাঁর এই বক্তব্য দীনী নসীহত (النصيحة للدين) হিসেবে বিবেচনা করা হতো।

অর্থাৎ, আহলুস  সুন্নাহর সম্মানিত ও মর্যাদাসম্পন্ন অনুসারীদের মাঝে সুন্নাহ বিরোধি কিছু প্রকাশ পেলে গভীর  জ্ঞানসম্পন্ন, বিচক্ষণ এবং সুন্নাহর উপর অবিচল ও শ্রদ্ধাশীল আলেমদের নিকট হতে তাদের ব্যাপারে সমালোচনা আসতে পারে।

এ বিষয়টিকে আক্রমণ, নিন্দা, গীবত ইত্যাদি হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়, বরং তা দীনী বিষয়ে উম্মতকে উদ্দেশ্য করে দেওয়া সাধারণ নসীহতের পর্যায়ভুক্ত।

আবূ সালিহ আল-ফাররা বলেছেন: [২]

আমি ওয়াকী থেকে ইউসুফ বিন আসবাতের নিকট ফিতনা সম্পর্কিত কিছু ঘটনা বর্ণনা করছিলাম, অতঃপর তিনি (ইউসুফ) বললেন, ‘এই ব্যক্তি (অর্থাৎ আল-হাসান বিন হাই) তার শিক্ষকের মতো।’ তাই আমি ইউসুফকে বললাম, ‘এটি গীবত হওয়ার ব্যাপারে কি আপনি ভয় করছেন না?’ তিনি বললেন, “কেন, হে বোকা! আমি তো তাদের জন্য তাদের পিতা-মাতার চেয়েও উত্তম। তারা যে বিদআত করেছে তার উপর আমল করা থেকে আমি মানুষকে নিষেধ করি যেন (তাদের মাধ্যমে যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে) তাদের বোঝা তাদের উপর না বর্তায়, আর যারা তাদের প্রশংসা করে তারা তো তাদের জন্য আরও ক্ষতিকর।

আল-হাসান বিন সালিহ বিন হাই (মৃ. ১৬৯ হি) একজন জ্ঞানী এবং সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন, যিনি হিজরী দ্বিতীয় শতাব্দীর প্রখ্যাত সালাফগণের উপর শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করেছিলেন। অথচ, কেবল শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করাকে (যদিও তিনি নিজে তা করেননি, বা এর দিকে আহ্বানও করেননি) বৈধ মনে করার কারণে সালাফরা তাকে বিদআতী হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন ও তার বিরুদ্ধে কঠোরভাবে সতর্ক করেছিলেন, এবং তারা বলেছিলেন যে তিনি জন্মগ্রহণ না করলেই ভালো হতো।

৩. উমার  বিন আল-খাত্তাব এবং সুবাইগের ঘটনা

বিদআতী ও পথভ্রষ্ট সম্প্রদায়ের বিষয়টি যেহেতু দীন ইসলামকে পরিবর্তন (তাবদীল) ও বিকৃত (তাহরীফ) করার সাথে সম্পর্কিত, যা পূর্ববর্তী কিতাবধারী ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের দীনের সাথে যা ঘটেছিল সেদিকে পরিচালিত করে, এবং দীনের নিদর্শনগুলোকে বিলুপ্তির দিকে নিয়ে যায়, আর যেহেতু সালাফগণ এটি অত্যন্ত দূরদর্শিতার সাথে উপলব্ধি করেছিলেন, তাই তারা এই বিচ্যুতির পরিধিকে সীমিত করার জন্য বিদআতী ও পথভ্রষ্ট সম্প্রদায়ের প্রতি রুক্ষতা ও কঠোরতা অবলম্বন করেছিলেন। এবং এটি বিচ্যুতির দিকে আহ্ববানকারী ও পথভ্রষ্ট ফিরকাহগুলোর আবির্ভাবের পরে উম্মতের বিভক্তি সম্পর্কে তারা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে যা জেনেছিলেন সেই জ্ঞানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাই বলতে গেলে, তারা ক্বদর দিয়ে ক্বদরকে প্রতিহত করেছেন।

“ইজমা উলামা আল-উম্মাহ” গ্রন্থের লেখক শাইখ খালিদ আয-যুফাইরী  (حفظه الله) বলেছেন:[৩]

কিন্তু, আল্লাহুল মুস্তা‘আন, হিসাব পাল্টে গিয়েছে এবং এই বুঝগুলোও পরিবর্তিত হয়েছে, এবং এর মাধ্যমে, বিদআতীদের প্রতি শিথিলতা এবং ঘনিষ্ঠতা কাঙ্ক্ষিত (বিষয়ে) পরিণত হয়েছে। বরং তা বাধ্যতামূলক ও প্রশংসনীয় হয়ে উঠেছে। এবং বিদ’আতীদের প্রতি রুক্ষ এবং কঠোর (শিদ্দাহ) হওয়া অল্পসংখ্যক, নির্দিষ্ট কিছু ব্যক্তিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে গিয়েছে এবং তারা বর্তমানে আমাদের মাঝে আর বিদ্যমান নেই।

অর্থাৎ, এসব বিষয়ে সালাফগণের রেখে যাওয়া অন্তর্দৃষ্টি এবং প্রজ্ঞা বিলুপ্ত হয়েছে আর যারা তা ধরে রেখেছেন এবং যারা সঠিক প্রেক্ষাপট এবং প্রত্যাশিত পদ্ধতি অনুযায়ী এর উপর আমল করেন, তাদেরকে এই শেষ জামানায় খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে গিয়েছে।

আহলুল ইলমদের মাঝে কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ যারা এই কাজটি সম্পাদন করেন তাদেরকে উম্মাহর বিভক্তিকারী এবং মুসলিমদের ক্ষতির কারণ হিসেবে দেখা হয়! আর যারা তাঁদের পথ অনুসরণ করেন এবং আল্লাহর দীনের প্রতি নিষ্ঠা প্রদর্শন করেন, তাদেরকে “মুকাল্লিদ” (অন্ধ অনুসারী) এবং “চরমপন্থি” বলা হয় – আর এই সবকিছুই “ভারসাম্য”, “মধ্যমপন্থা”, “মধ্যমপন্থা গ্রহণ করা” এবং “মুসলিমদের মধ্যে ঐক্য ও সহযোগিতা” ইত্যাদি স্লোগানের আড়ালে নিন্দনীয় ও অবাঞ্ছিত করে তোলা হয় – যেমনটি আলেমগণ  ব্যাখ্যা করেছেন। 

এ কারণেই, আপনি মাঝেমধ্যে দেখবেন ও শুনবেন, যাদের উল্লিখিত বিষয় সম্পর্কে কোনো উপলব্ধি বা বাস্তব অভিজ্ঞতা নেই বা যাদেরকে পূর্বে কোনো পরীক্ষা বা ফিতনার সম্মুখীন হতে হয়নি এবং যারা আহলুস সুন্নাহর পেছনে নিজেদেরকে লুকিয়ে রাখত তারা “মধ্যপন্থা”, “ভারসাম্যপূর্ণ পন্থা” বা “ভারসাম্যপূর্ণ মানহাজ” ইত্যাদি স্লোগান দিয়ে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।

আব্দুল্লাহ বিন সুবাইগের ঘটনা

আল-লালাকায়ী তার সনদে সুলাইমান বিন ইয়াসার থেকে বর্ণনা করেছেন:[৪]

সুবাইগ বিন আসল নামের বনী গুনায়েমের এক ব্যক্তি মদীনায় পৌঁছালো এবং তার সাথে কিছু কিতাব ছিল। এক পর্যায়ে সে কুরআনের মুতাশাবিহ (অস্পষ্ট আয়াত) সম্পর্কে প্রশ্ন করতে শুরু করল। যখন বিষয়টি উমারের কানে পৌঁছালো তখন তিনি তার জন্য খেজুর গাছের কিছু ডাল একত্রিত করলেন। তারপর তিনি তার কাছে গিয়ে বললেন, ‘তুমি কে?’ সে বলল, ‘আমি আব্দুল্লাহ বিন সুবাইগ।’ উমার বললেন, ‘আর আমি আব্দুল্লাহ (আল্লাহর বান্দা), উমার।’ তারপর তিনি তার নিকটবর্তী হলেন এবং তাকে বেত্রাঘাত করতে লাগলেন। এক পর্যায়ে তার মাথা ফেটে গেল এবং তার মুখমণ্ডল রক্তাক্ত হয়ে গেল। তখন সে বলল, ‘যথেষ্ট হয়েছে, হে আমিরুল মু‘মিনীন, কারণ আল্লাহর কসম, আমার মাথায় যা ঘুরপাক খাচ্ছিল তা দূর হয়েছে।

যদি আমাদের সময়ে উমার বিন আল-খাত্তাবের (رضي الله عنه) মতো কেউ জীবিত থাকতেন, যিনি ইউসুফ আল-ক্বারাদ্বাওয়ী , মুহাম্মাদ আল-গাযালী , মুহাম্মাদ সাঈদ রামাদান আল-বুতী, হাসান আত-তুরাবী এবং তাদের মতো লোকদেরকে দৃষ্টান্তমূলক শিক্ষা দিতেন, তাহলে তাদের দেশে এত ফিতনা-ফাসাদ থাকত না।

৪. বিদআতী ও পথভ্রষ্ট লোকদের বিরুদ্ধে আহলুস সুন্নাহর কঠোরতা

বিদআতীদের বিরুদ্ধে সালাফগণের কঠোরতা

আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে যে এই কঠোরতা প্রাসঙ্গিক এবং তার নিজস্ব স্থান আছে এবং সালাফী মানহাজের অনুসারী নয় এমন সবার ক্ষেত্রে তা সমানভাবে প্রযোজ্য নয়। বিদআতীদের মাঝে যারা অজ্ঞ, সাধারণ এবং শিক্ষিত আমাদেরকে অবশ্যই তাদের মধ্যে পার্থক্য করতে হবে। একইভাবে, যারা তাদের বিদআতের ব্যাপারে নীরব থাকে বা এর প্রতি আহ্বান করে না এবং যারা তাদের বিদআতের ব্যাপারে সরব এবং সক্রিয় ভূমিকা পালন করে, আমাদেরকে তাদের মাঝেও পার্থক্য করতে হবে।

একইভাবে, নম্রতা – যদিও এটি আল্লাহর দিকে আহ্বান করার একটি ভিত্তি – তবুও এটি প্রেক্ষাপটভিত্তিক এবং এর নিজস্ব স্থান রয়েছে। সুতরাং, নম্রতা সকল পরিস্থিতিতে উপযুক্ত নয় এবং একইভাবে, কঠোরতাও সকল পরিস্থিতিতে উপযুক্ত নয়, প্রতিটিরই নিজস্ব স্থান রয়েছে। কোনটি উপযুক্ত (মাসলাহা) তা নির্ধারিত হয় শরীয়ত এবং সালাফগণের আমলের ভিত্তিতে, কোনো ব্যক্তিবিশেষের নিজস্ব মতামত, যুক্তি বা অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নয়।

০১ হাম্মাদ বিন সালামার (মৃ. ১৬৭ হি) জীবনীতে আয-যাহাবী বলেছেন:

শাইখুল ইসলাম (আবূ ইসমাঈল আল-আনসারী) বলেছেন: ‘ইমাম আহমাদ বলেছেন: ‘তোমরা যদি হাম্মাদ বিন সালামার ব্যাপারে কোনো ব্যক্তিকে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করতে দেখো, তখন তার ইসলাম নিয়ে সন্দেহ করো, কারণ তিনি বিদআতীদের প্রতি কর্কশ ও কঠোর ছিলেন।

০২ শারীক বিন আব্দুল্লাহ আন-নাখাঈ (মৃ. ১৭৭হি) সম্পর্কে আল-হাফিয ইবন হাজার বলেছেন: [৫]

তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ, ন্যায়পরায়ণ, একজন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি, বিদআতীদের প্রতি কর্কশ, কঠোর।

০৩ আর মুআবিয়া বিন সালিহ আল-আশআরী বলেছেন: [৬]

আমি আহমাদ বিন হাম্বালকে শারীক সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তিনি বলেছেন: “তিনি ছিলেন বুদ্ধিমান, সত্যবাদী, একজন মুহাদ্দিস। এবং তিনি সংশয়বাদী ও বিদআতীদের প্রতি কর্কশ, কঠোর ছিলেন।

০৪ ইমাম মালিক বিন আনাস (মৃ. ১৭৯হি) বলেছেন[৭]:

প্রবৃত্তির অনুসারীদেরকে সালাম দিও না এবং তাদের সঙ্গে বসো না যদি না তাদের উপর কঠোর হওয়ার ইচ্ছা থাকে, এবং তাদের অসুস্থদের দেখতে যেও না এবং তাদের নিকট হতে কোনো হাদীস বর্ণনা করো না।

০৫ ইমাম আশ-শাফিয়ী (মৃ. ২০৪হি) সম্পর্কে আল-বায়হাক্বী বলেছেন: [৮]

আশ-শাফিয়ী—রাহিমাহুল্লাহ—মুলহিদ (ভ্রষ্ট, দীনদ্রোহী) ও বিদআতীদের প্রতি কর্কশ, কঠোর ছিলেন এবং তাদেরকে প্রকাশ্যে ঘৃণা করা এবং বর্জন করার ব্যাপারে সোচ্চার ছিলেন।

০৬ আল-শাফিয়ীর সহচর ইমাম আবূ ইয়াক্বূব ইউসুফ বিন ইয়াহইয়া আল-বুওয়াইতী (মৃ. ২৩১হি)-এর, জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে: [৯]

নিশ্চয়ই, তিনি বিদআতীদের প্রতি কঠোর ও কর্কশ ছিলেন।

০৭ আব্দুল্লাহ ইবন আবী হাসান আল-ইয়াহসাবীর (মৃ. ২২৬ হি) জীবনীতে ইবন ফারহুন বলেছেন: [১০]

তিনি ছিলেন উদার, স্পষ্টবাদী এবং যুক্তিতর্কে সুদক্ষ, সুন্নাহর রক্ষক, মালিকী মাযহাবের অনুসারী এবং তিনি বিদআতীদের প্রতি কঠোর ও কর্কশ ছিলেন।

০৮ ইমাম উসমান বিন সাঈদ আদ-দারিমী (মৃ. ২৮০হি) সম্পর্কে ইবন হিব্বান বলেছেন:

আদ-দারিমী ছিলেন নির্ভুলভাবে মুখস্থকারীদের অন্যতম, নেককার এবং দীনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত, এবং তিনি তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন যারা (ইলম) মুখস্থ করেছেন এবং তা একত্রিত করেছেন অতঃপর দীনের বুঝ অর্জন করেছেন, অতঃপর (বইপুস্তক) রচনা করেছেন এবং তা (এই ইলম) বর্ণনা করেছেন। এবং তিনি তাঁর অঞ্চলে সুন্নাতকে সমুন্নত করেছেন, এর প্রতি আহ্বান করেছেন, এর পবিত্রতা রক্ষা করেছেন এবং এর বিরুদ্ধবাদীদের প্রতিহত করেছেন।

আর আয-যাহাবী বলেছেন: [১১]

তিনি ছিলেন সুন্নাহর প্রতি নিবেদিতপ্রাণ, যুক্তিতর্কে অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন এবং বিদআতীদের চোখে একটি কুড়াল।

০৯ ইসমাঈল বিন ইসহাক্ব আল-ক্বাদী (মৃ. ২৮২হি)-এর বর্ণনায় বলা হয়েছে: [১২]

এবং তিনি বিদআতীদের উপর কর্কশ, কঠোর ছিলেন, তিনি তাদেরকে তাওবাহ করাতেন এবং তা নিশ্চিত করতেন, তা এতটাই বেশি যে তাঁর সময়ে (তাঁর ভয়ে) তারা বাগদাদ থেকে দূরে অবস্থান করত…।

সুবহানাল্লাহ! আগেকার যুগে বিদআতীরা আহলুস সুন্নাহর সেই স্পষ্টভাষী অনুসারীদের নিকট থেকে পালিয়ে যেত যারা বিরুদ্ধবাদী ও পথভ্রষ্টদের ব্যাপারে প্রকাশ্যে তাদের বক্তব্যগুলোকে প্রচার করতেন। তাদের দ্বারা অপমানিত হওয়ার ভয়ে বিদআতীরা তাদের শহর ও আবাসভূমি থেকে পালিয়ে যেত, কিন্তু আজ, আপনি পথভ্রষ্ট এবং বিরুদ্ধবাদীদের মুমাইয়্যিআদের সাহচর্য, সমর্থন, পৃষ্ঠপোষকতা ও তাদের দ্বারা উপকৃত হওয়ার জন্য তাদের নিকট আশ্রয় গ্রহণ করতে দেখবেন ।

১০ আবূ জাফার  মুহাম্মাদ বিন আল-আব্বাস বিন আইয়্যূব আল-আখরামের (মৃ. ৩০১ হি) জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে:[১৩]

তিনি সুন্নাহর কট্টর সমর্থনকারী ছিলেন এবং বিদআতীদের প্রতি অত্যন্ত কঠোর (গালীযান) ছিলেন।

১১ এবং আবূ মুহাম্মাদ আল-হুসাইন বিন আলী বিন খালফ আল-বারবাহারী (মৃ. ৩২৯হি) সম্পর্কে ইবন কাসীর বলেছেন: [১৪]

আলেম, যাহিদ, হাম্বালী ফিক্বহের অনুসারী, সতর্ককারী, আল-মারওয়াযী ও সাহল আত -তুস্তারীর সহচর… তিনি ছিলেন কঠোর, আহলুল বিদআহ ও পাপাচারীদের প্রতি কর্কশ, তাঁর ব্যাপারে উঁচু ধারণা পোষণ করা হতো, সাধারণ ও বিশেষ শ্রেণীর মানুষ তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করত।

আর আল-বারবাহারী সম্পর্কে ইবন রজব বলেছেন: [১৫]

তিনি ছিলেন তাঁর সমসাময়িক একদল (আলেমের) শাইখ, আহলুল  বিদআহর বিরুদ্ধে কঠোর এবং হাত অথবা মুখ দিয়ে তাদেরকে কোণঠাসা করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে অগ্রগামী।

১২ ইমাম আবূ উমার বিন মুহাম্মাদ আল-মু‘আফিরী আল-আন্দালুসী আত্ব-ত্বলামানকী , ক্বুরত্বুবার আলেম, (মৃ. ৪২৯হি) যার জীবনীতে আয-যাহাবী বলেছেন: [১৬]

তিনি ছিলেন সুন্নাতের ব্যাপারে কঠোর ও সম্ভ্রান্ত একজন ব্যক্তি, খালফ ইবন বাশ্কওয়াল বলেছেন: “তিনি প্রবৃত্তির অনুসারী ও আহলুল বিদআহর বিরুদ্ধে একটি কোষমুক্ত তলোয়ার ছিলেন , তাদের প্রতিহতকারী, শরীয়তের প্রতি অত্যন্ত রক্ষণশীল এবং আল্লাহর জন্য অত্যন্ত কর্কশ, কঠোর।

১৩ আবূ মানসূর আব্দুল মালিক বিন মুহাম্মাদ  বিন ইউসুফ আল-বাগদাদী (মৃ. ৪৬০হি) সম্পর্কে ইবন কাসীর বলেছেন: [১৭]

সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করা, সৎকাজ সম্পাদনে উদ্যোগী হওয়া, সৎকর্মশীলদের হাতকে শক্তিশালী করা, বিদআতীদের বিরুদ্ধে কঠোর হওয়া এবং তাদেরকে তিরস্কার করার ক্ষেত্রে তিনি তাঁর সময়কার এক অনন্য ব্যক্তিত্ব ছিলেন।

১৪ এবং ইবন রজব কর্তৃক শাইখুল ইসলাম আবূ ইসমাঈল আব্দুল্লাহ বিন মুহাম্মাদ আল-আনসারী আল-হারাবী (মৃ. ৪৮১ হি) সম্পর্কে যা বর্ণিত হয়েছে: [১৮]

…সুন্নাহর সমর্থন, প্রতিরক্ষা এবং এর বিরোধিতাকারীদের প্রতিহত করার ক্ষেত্রে তিনি কঠোর ছিলেন যার কারণে তাকে তাঁর জীবনে অনেক বড় বড় ফিতনার সম্মুখীন হতে হয়েছিল এবং ইমাম আহমাদের মাযহাবকে সমর্থন করা ও শ্রদ্ধা করার ক্ষেত্রে তিনি অত্যন্ত কঠোর ছিলেন।

আর আয-যাহাবী তার সম্পর্কে বলেছেন: [১৯]

এবং এই ব্যক্তি ছিলেন মুতাকাল্লিমীনদের (অনুমানভিত্তিক ধর্মতত্ত্ববিদদের ) বিরুদ্ধে একটি কোষমুক্ত তলোয়ার…

তিনি আরও বলেছেন:

তিনি ছিলেন বিরুদ্ধবাদীদের উপর একটি কোষমুক্ত তলোয়ার এবং মুতাকাল্লিমীনদের (অনুমানভিত্তিক ধর্মতত্ত্ববীদদের) উপর একটি কুড়াল…

এবং আরও: [২০]

তিনি ছিলেন বিদআতীদের চোখে একটি কুড়াল, জাহমিয়্যাদের বিরুদ্ধে একটি তলোয়ার।

১৫ এবং আবূল-মুযাফফার আস-সামআনির (মৃ. ৪৫৮হি) জীবনীতে আয-যাহাবী বলেছেন: [২১]

 তিনি হাদীসের উপর আল-ইস্তালাম, আল-বুরহান এবং আল-আমালী নামের বই রচনা করেছেন। তিনি ছিলেন আহলুল হাদীস ওয়াস-সুন্নাহ ওয়াল-জামাআহর কট্টর সমর্থনকারী, এবং তিনি ছিলেন বিরুদ্ধবাদীদের চোখের কাঁটা এবং আহলুস সুন্নাহর পক্ষে প্রমাণ।

১৬ এবং শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যাহ (মৃ. ৭২৮হি) সম্পর্কে ইবন আব্দিল  হাদী বলেছেন: [২২]

আর তিনি (رحمه الله) ছিলেন বিরুদ্ধবাদীদের উপর একটি কোষমুক্ত তলোয়ার, প্রবৃত্তির অনুসারী ও বিদআতীদের গলার কাঁটা।

আর আল-হাফিয ইবন হাজার বলেছেন: [২৩]

এটি [সবচেয়ে] আশ্চর্যজনক (বিষয়) যে এই ব্যক্তি রাওয়াফিদ্ব, হুলূলী, ইত্তিহাদীদের মতো আহলুল বিদআহর মোকাবেলা (করা এবং তাদেরকে প্রতিহত) করার ক্ষেত্রে সর্বশ্রেষ্ঠ ছিলেন এবং এই বিষয়ে তাঁর বহু বিখ্যাত রচনা রয়েছে, এবং তাদের সম্পর্কে তাঁর ফাতাওয়া এতো বেশি যে তা অফুরন্ত।

‘ইজমা আল-উলামা’ গ্রন্থের লেখক, শাইখ খালিদ আয-যুফাইরী  (حفظه الله) এসব বর্ণনার (পাশাপাশি অন্যান্য বর্ণনা) উল্লেখ করার পর বলেছেন (পৃষ্ঠা ৫৫):

এতকিছুর পরও, এই সালাফী বৈশিষ্ট্যগুলোর (কঠোরতা, রুক্ষতা) কারণে কি কোনো ব্যক্তির জন্য আহলুস সুন্নাহর কাউকে সমালোচনা করা জায়েয? যদি সে এটি করে থাকে, তাহলে এই মূর্খ জানে না যে এ কাজের দ্বারা সে সৎকর্মশীল সালাফগণের সমালোচনা করছে, যাদের শীর্ষে আছেন সাহাবীগণ, যেমনটি ইতোমধ্যে তাদের নিকট হতে বর্ণিত হয়েছে।

উল্লিখিত বিষয়সমূহ অর্থাৎ পথভ্রষ্ট সম্প্রদায় এবং বিদআতীদের প্রতি সালাফগণের কঠোরতা সম্পর্কে উপলব্ধি করার পর, আসুন আমরা আবূ জাফার আহমাদ বিন আউনিল্লাহর অত্যন্ত বিচিত্র এবং বিস্ময়কর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করি, যা কোমলস্বভাব ও দুর্বলচিত্তের ব্যক্তিদের জন্য প্রযোজ্য নয়।

৫. আবূ জাফার আহমাদ বিন আউনিল্লাহর আশ্চর্যজনক অবস্থা

আবূ জাফার আহমাদ বিন আউনিল্লাহ বর্তমান যুগের মুমাইয়্যাদের জন্য একটি শক্তিশালী শিক্ষা এবং মহান সতর্কবাণী, যারা আহলুল বিদআহর সমর্থনে সালাফগণের মানহাজকে বিনষ্ট করেছে। নিম্নোক্ত বিষয়গুলো কোমল হৃদয়, দুর্বলচিত্ত বা সহজেই বিচলিত হয় এমন লোকদের জন্য প্রযোজ্য নয়।

আবূ আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ বিন আহমাদ বিন মুফাররাজ বলেছেন: [২৪]

আবূ জাফার আহমাদ বিন আউনিল্লাহ (মৃ. ৩৭৮হি) সব সময় বিদআতীদেরকে প্রত্যাখ্যান করতেন এবং তাদেরকে জবাবদিহি করাতেন, তাদের বিরুদ্ধে চরম কঠোরতা অবলম্বন করতেন, তাদেরকে চরম অপমান করতেন।

তিনি সবসময়ে তাদের দোষত্রুটি খুঁজে বের করতে সচেষ্ট থাকতেন, তাদের ক্ষতি করার জন্য তৎপর হতেন, তাদের উপর কঠিন অত্যাচার করতেন, যখনই পারতেন তাদেরকে তাড়িয়ে দিতেন, তাদেরকে স্থির হতে দিতেন না।

এবং তাদের (আহলুল বিদআহর) প্রত্যেকেই তাকে ভয় পেত, তার থেকে নিজেদেরকে লুকিয়ে রাখতে চাইত এবং রক্ষা করতে চাইত।

তিনি কখনও তাদের কারও সঙ্গে আপস করতেন না, এবং তাদের কাউকে নিরাপদে থাকতে দিতেন না।

এবং তিনি যদি মন্দ কাজেের সম্মুখীন হতেন এবং সুন্নাহ থেকে কোনো প্রকারের বিচ্যুতি প্রকাশ পেতে দেখতেন, তিনি তার বিরোধিতা করতেন এবং (সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে) অপমানিত ও অপদস্থ করতেন।

এবং তিনি সেই ব্যক্তির প্রকৃত অবস্থা প্রকাশ করে দিতেন এবং বিভিন্ন সমাবেশে তার অপকর্মগুলো ফাঁস করে দিতেন এবং এর মাধ্যমে ঐ ব্যক্তির সাথে তার সম্পর্কচ্ছেদের ব্যাপারে ঘোষণা দিতেন।

এবং তিনি অন্যদেরকে তার বিরুদ্ধে এমনভাবে উসকে দিতেন যে, হয় সেটি তাকে ধ্বংস করে দিত অথবা তাকে তার মন্দ ও ঘৃণ্য মাযহাব এবং তার মন্দ মতবাদ ত্যাগ করতে বাধ্য করত।

আর তিনি কখনই এই অভ্যাসের ব্যতিক্রম করেননি, বরং তিনি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য এবং আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ না করা পর্যন্ত এর উপর অবিচল ছিলেন এবং এই পথে জিহাদ করা অব্যাহত রেখেছেন।

মুমায়্যিআদের উত্থানের কারণে সুন্নাহ ও তার অনুসারীদের যে ক্ষতি হয়েছে, এবং তারা আহলুল বিদআহ ও হিযবীদেরকে যে শক্তি ও প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ দিয়েছে, সেই প্রেক্ষিতে, আমাদের বর্তমান সময়ে আবূ জা‘ফারের মতো ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয়তা কতটাই না বেশি!

৬. নম্রতা ও শিথিলতা প্রদর্শনের ব্যাপারে সালাফগণের মানহাজ

ইতোমধ্যে যা উল্লেখ করা হয়েছে, এবং এটি জানার পর যে পথভ্রষ্ট ও বিদআতী, ভ্রষ্টতা ও হিযবিয়্যার দিকে আহ্বানকারীরাই ধর্মগ্রন্থের (অপব্যাখ্যা) এবং দ্বীনের মূল নীতিমালা (আক্বীদাহ, মানহাজ) পরিবর্তন করা (তাবদীল) ও বিকৃত (তাহরীফ) করার কারণ, তাই সালাফগণ কেবল বিদআতীদের উপর রুক্ষতা ও কঠোরতা প্রদর্শন করেই ক্ষান্ত হননি, বরং তারা ঐসকল ব্যক্তিদেরও শায়েস্তা করেছেন যারা তাদের জ্ঞানের জন্য সম্মানিত এবং সুপরিচিত হওয়া সত্বেও তাদের কথা ও কাজ দিয়ে এই মানহাজকে লঙ্ঘন করেছেন।

০১ আল-খাযারের আলেম—আব্দুল্লাহ বিন উমার আল-সারখুসী বলেছেন: [২৫]

আমি এক বিদআতীর সাথে একবেলা খাবার খেয়েছিলাম এবং ইবন আল-মুবারাক এ ব্যাপারে জানতে পেরেছিলেন অতঃপর তিনি (আমার সম্পর্কে) বলেছিলেন: ‘আমি তার সঙ্গে ত্রিশ দিন কথা বলব না।

০২ ইবন ওয়াদ্দাহ আল-ক্বুরত্বুবী একজন সালাফ থেকে বর্ণনা করেছেন:[২৬]

আমি আমর বিন উবাইদের (আল-মু‘তাযিলী) সাথে হাঁটছিলাম, এবং ইবন আওন আমাকে দেখতে পেয়েছিলেন। তারপর তিনি দুই মাস আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে রেখেছিলেন।

০৩ ইবন আবী হাতিম, আব্দুল আযীয আল-উওয়াইসী থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন: [২৭]

যখন হুসাইন বিন আব্দুল্লাহ বিন দামাইরার সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য ইসমাঈল বিন আবী উওয়াইস রওনা হলেন এবং এই (খবরটি ইমাম) মালিকের কাছে পৌঁছালো, তিনি চল্লিশ দিনের জন্য তাকে পরিত্যাগ করলেন, কারণ তিনি (মালিক) তার (হুসাইন) উপর সন্তুষ্ট ছিলেন না।

০৪ এবং আবূ জা‘ফর মুহাম্মাদ বিন আল-হাসান বিন হারুন আল-মাওসিলী বলেছেন: [২৮]

আমি আবূ আবদুল্লাহ আহমাদ বিন হাম্বালকে জিজ্ঞেস করলাম: ‘আমি মাওসিল শহরের সম্প্রদায়ের অধিবাসী এবং আমাদের শহরের বেশিরভাগ লোকই জাহমিয়্যাহ, এবং আল-কারাবিসীর এই বক্তব্য, ‘আমার কুরআনের তিলাওয়াত  সৃষ্ট’ সেখানেই প্রকাশ পেয়েছিল।’ অতঃপর তিনি বললেন: ‘এই কারাবিসীর ব্যাপারে সাবধান থাকবে। তার সঙ্গে কথা বলো না, এবং তার সঙ্গে যে কথা বলে তুমি তার সঙ্গেও কথা বলো না।’ আমি তাকে বললাম: ‘এই বক্তব্য এবং এত্থেকে যত শাখা-প্রশাখার উৎপত্তি হবে তা সবই কি আপনি জাহমের উক্তির অন্তর্ভুক্ত বলে মনে করেন?’ তিনি বললেন: ‘তা সবই জাহমের উক্তির অন্তর্ভুক্ত।’

০৫ আল-ফুদ্বাইল বিন ইয়াদ্ব (মৃ. ১৮৭হি) বলেছেন: [২৯]

যে ব্যক্তি কোনো বিদআতীর সঙ্গে উঠাবসা করে, তার থেকে সাবধান থাকো এবং যে ব্যক্তি কোনো বিদআতীর সঙ্গে উঠাবসা করে তাকে হিকমত দেওয়া হয়নি। আমি খুশি হতাম যদি আমার এবং বিদআতীর মাঝে একটি লোহার দুর্গ থাকত। কোনো বিদআতীর সঙ্গে খাদ্য গ্রহণ করার চেয়ে কোনো ইহুদি ও খ্রিষ্টানের সঙ্গে খাদ্য গ্রহণ আমার নিকট অধিক পছন্দনীয়।

০৬ ইবরাহীম বিন মাইসারাহ (মৃ. ১৩২হি) বলেছেন:[৩০]

যে ব্যক্তি কোনো বিদআতীকে সম্মান করল সে ইসলামের ধ্বংসে সহায়তা করল।

০৭ আল-ফুদ্বাইল বিন ইয়াদ্ব বলেছেন:[৩১]

যে ব্যক্তি অন্য কোনো ব্যক্তির নিকট পরামর্শ চাইতে আসল এবং সে তাকে কোনো বিদআতীর দিকে পরিচালিত করল, তাহলে সে ইসলামের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করল। বিদআতীর নিকটে যাওয়া থেকে সাবধান থাকো কারণ তারা [মানুষকে] সত্যপথ থেকে বিচ্যুত করে।

৭. মুমায়্যিআরা (কখনও কখনও) আহলুস সুন্নাহর জন্য বেশি ক্ষতির কারণ হয়

ইবন আওন বলেছেন: [৩২]

যারা বিদআতীদের সঙ্গে বসে, তারা আমাদের নিকট বিদআতীদের চাইতেও অধিক কঠোর।

সালাফরা খুব স্পষ্টভাবে জানতেন যে সুন্নাহর অনুসারী বা এর সাথে সংযুক্তকারীদের মাঝে এমন লোক থাকতে পারে যারা এই মানহাজের উল্লিখিত হিকমাহগুলোকে যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পারে না।

যে কারণে তাদের সঙ্গে কিছু পথভ্রষ্ট, বিদআতী বা সমালোচিত ব্যক্তিদের সুসম্পর্ক, বন্ধুত্ব, সম্পৃক্ততা বা মিত্রতা গড়ে উঠে। ফলস্বরূপ, তারা সেই সংযুক্তি এবং সহযোগিতাকে তাদের ব্যক্তিগত মাসলাহার (ব্যক্তিগত স্বার্থ) অজুহাত দেখিয়ে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে, যদিও সেই মাসলাহা শরীয়ত এবং সালাফগণের বুঝ দ্বারা উদ্দেশিত এবং প্রত্যাশিত নয়।

এই বিষয়টি তাদেরকে সন্দেহ এবং ভুল ধারণা তৈরি করতে উদ্বুদ্ধ করে, এমনকি তারা সেসকল সুন্নাতের অনুসারীদের অপছন্দ এবং ঘৃণা করতে শুরু করে যারা এই মানহাজের বাস্তবায়ন করেন।

অবশেষে, তারা কঠোর এবং কর্কশ হয়ে উঠে, এবং আহলুস সুন্নাহর জন্য পথভ্রষ্ট লোকজন ও বিদআতীদের চেয়েও বেশি ক্ষতির কারণ হয়ে উঠে। তাদের সন্দেহ এবং বিষ ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য তারা সময় ব্যয় করে, কারণ সালাফী মানহাজ বাস্তবায়নের ফলে তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থ বাধাগ্রস্ত হয়।

তারা আরও ক্ষতিকর হয়ে উঠে কারণ বিদআতী ও পথভ্রষ্টদের ব্যাপারটি ইতোমধ্যে স্পষ্ট হয়েছে, আর আহলুস সুন্নাহ তাদের দ্বারা প্রভাবিত বা প্রতারিত হয় না। কিন্তু এ ধরনের লোকেরা আহলুস সুন্নাহর মাঝে সন্দেহ ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে, যার ফলে বিভেদ ও মতানৈক্য তৈরি হয়।

৮. উপসংহার

সালাফগণের জীবনী এবং তাদের বর্ণনাগুলোতে তামঈ এবং মুমায়্যিআদের মানহাজের ব্যাপারে যথাযথ এবং বিস্তারিত খণ্ডন (রদ) রয়েছে, যারা “ভারসাম্য বজায় রাখা”, “মধ্যমপন্থা অবলম্বন করা”, “ন্যায়পরায়ণতা”, “মধ্যম পথ অবলম্বন করা” এবং অন্যান্য সুন্দর স্লোগানের আড়ালে আহলুস সুন্নাহ ও সালাফগণের আক্বায়িদ, মানাহিজ এবং মাযাহিবের বিরাট ক্ষতিসাধন করে, এবং আহলুস সুন্নাহ ও বিদআতীদের মাঝে পার্থক্যগুলোকে ভেঙ্গে ধ্বংস করে।

এটাও মনে রাখতে হবে যে, দাওয়াহর ক্ষেত্রে নম্রতার একটি স্থান আছে এবং কঠোরতারও একটি স্থান আছে। দাওয়াহর ক্ষেত্রে নম্রতা হলো ভিত্তি এবং মূলনীতি, আর বিদআত, বিদআতী এবং হিযবীদের ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো প্রয়োজন অনুযায়ী প্রথমে নম্রতা অবলম্বন করা, তারপর বিচ্ছিন্নতা অবলম্বন করা, প্রত্যাখান করা, কর্কশ হওয়া এবং কঠোরতা অবলম্বন করা। তাদের নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি পরিস্থিতি ও ব্যক্তি ভেদে পরিবর্তিত হয় এবং কোন পদ্ধতিটি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করবে তার উপর নির্ভর করে এবং সেই ব্যক্তি কি অজ্ঞ, বিভ্রান্ত, সাধারণ ব্যক্তি নাকি ত্বালিবুল ইলম বা দাঈ, অথবা সে কি তার বিদআত সম্পর্কে নীরব নাকি সোচ্চার ইত্যাদির উপর নির্ভর করে।

এখানে উদ্দেশ্য হলো সালাফী মানহাজে যে  তামঈর অনুপ্রবেশ ঘটেছে তা হতে কিছু প্রতিহত করা, এবং সেই ভারসাম্যহীনতা দূর করা যা মৌখিক বা তাত্ত্বিকভাবে সালাফী মানহাজের সাথে সংযুক্তকারী অনেককে আচরণগতভাবে এর বিরোধিতা করতে উদ্বুদ্ধ করেছে এবং বিদআতী ও হিযবীদের প্রতি শিথিলতা প্রদর্শন করতে উদ্বুদ্ধ করেছে, যারা প্রাথমিকভাবে হিদায়াতের উপর থাকলেও পরবর্তীতে ভ্রষ্টতায় নিপতিত হয় অতঃপর বিচ্যুত হয়।

পাদটীকা:


১. মানাক্বিব আল-ইমাম আহমাদ (পৃ. ২৫৩)।

২. আস-সিয়ার (৭/৩৬৪) এবং তাহযীবুল-কামাল  (৬/১৮২)।

৩. ইজমা উলামা আল-উম্মাহ, (পৃ. ৩৩-৩৪)।

৪. শারহ উসূল আল-ইতিক্বাদ (নং ১১৩৭)।

৫. আত-তাক্বরীব (পৃ. ৪৩৬)।

৬. আস-সিয়ার (৮/২০৯)।

৭. আল-জামি লি ইবন আবী যাইদ আল-ক্বায়রাওয়ানী (পৃ. ১২৫)।

৮. মানাক্বিব আশ-শাফিয়ী (১/৪৬৯)।

৯. তাবয়ীন  কাযিব আল-মুফতারী, ইবন আসাকীর (পৃ. ৩৪৮)।

১০. ইবন ফারহুনের আদ-দীবাজ আল-মাযহাব (পৃ. ১৩৪)।

১১. আস-সিয়ার (১৩/৩২২)।

১২. আদ-দীবাজ আল-মাযহাব (পৃ. ৯৪)।

১৩. ত্বাবাক্বাতুল মুহাদ্দিসীন বি আসবাহান, (৩/৪৪৭)।

১৪. আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়াহ (১১/২৩১)।

১৫. ত্বাবাক্বাত আল-হানাবিলাহ (২/১৮)।

১৬. তাযকিরাহ আল-হুফ্ফায (৩/১০৯৮-১০৯৯)।

১৭. আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়াহ (১২/১০৩)।

১৮. যাইল আত্ব-ত্বাবাক্বাত (৩/৬০-৬১)।

১৯. আস-সিয়ার (১৮/৫০৯)।

২০. আল-ইবার (২/৩৪৩)।

২১. আস-সিয়ার (১৯/১১৬)।

২২. আল-উক্বূদ আদ-দুররিয়্যাহ  (পৃ. ৭)।

২৩. আর-রদ্দ আল-ওয়াফির  (পৃ. ২৪৮)।

২৪. তারীখ দিমাশক (৫/১১৮)। আর তিনি হলেন মুহাদ্দিস, ইমাম, আহমাদ বিন আউনিল্লাহ বিন হুদাইর আবূ জাফার আল-আন্দালুসী আল-ক্বুরত্বুবী।

২৫. আল-লালাকায়ী  বর্ণনা করেছেন (নং. ২৭৪)।

২৬. আল-বিদআহ ওয়ান-নাহি আনহা (পৃ. ৫৮)।

২৭. আল-জারহ ওয়াত-তা‘দীল (১/২১)।

২৮. তারীখ বাগদাদ (৮/৬৫)।

২৯. আল-লালাকায়ী  শারহ উসূল আল-ইতিক্বাদে (নং ১১৪৯) বর্ণনা করেছেন।

৩০. আল-লালাকায়ী  (১/১৩৯) বর্ণনা করেছেন।

৩১. আল-লালাকায়ী  (নং ২৬১) বর্ণনা করেছেন।

৩২. ইবন বাত্তাহ কর্তৃক আল-ইবানাহ (২/২৭৩)

 

Support The Da'wah In Bangladesh

Recent Posts

Recommended Readings

ইসলাম

ইসলাম হলো আদম (‘আলাইহিস সালাম) থেকে মুহাম্মাদ (ﷺ) পর্যন্ত সকল নবীর দীন। একজন মুসলিম হলেন সেই ব্যক্তি যিনি এই দীনকে কবুল করেন এবং এর উপর আমল করেন। মুসলিমরা একমাত্র সত্য মা'বূদ (আরবিতে আল-ইলাহ) আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য কারো ইবাদত করেন না। মুসলিমরা সকল প্রকার শিরক পরিত্যাগ করেন এবং তারা মানবজাতির প্রতি প্রেরিত সর্বশেষ রাসূল মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর প্রদর্শিত শিক্ষার অনুসরণ করেন। এটিই হলো সালাফিয়্যাহর ভিত্তি।

আমাদের দাওয়াহ
সুন্নাহ

সুন্নাহ হলো নবী (ﷺ) ও তাঁর সাহাবাদের পথ। যিনি এই পথের অনুসরণ করেন তাকে সুন্নী বলা হয় এবং তিনি আহলুস-সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ’র অন্তর্ভুক্ত। মাঝেমধ্যে, শিয়া সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত নয় এমন কাউকে বুঝানোর জন্যও সুন্নী শব্দটি সাধারণভাবে ব্যবহৃত হয়। তবে, শুধু শিয়া না হওয়াটা কোনো ব্যক্তিকে পথভ্রষ্টতায় নিপতিত হওয়া থেকে বাঁচানোর জন্য যথেষ্ট নয়।

আমাদের দাওয়াহ
আস-সালাফ আস-সালেহ

আস-সালাফ আস-সালেহ হলেন মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর সাহাবা ও তাঁদের পরবর্তী তিন প্রজন্ম। তাদেরকে আহলুস-সুন্নাহ ওয়াল-জামা’আহ, আস-সালাফ,আছহাবুল-হাদীস এবং আহলুল-হাদীসও বলা হয়। যে ব্যক্তি তাঁদের পথকে কবুল করেন এবং তাঁদের আক্বীদাহ, মানহাজ ও দীনকে অবিকল অনুসরণ করেন, তিনি প্রকৃত হিদায়াতের উপর প্রতিষ্ঠিত।

আমাদের দাওয়াহ
সালাফিয়্যাহ

সালাফিয়্যাহ হলো ইসলাম ও সুন্নাহ অনুসরণের প্রকৃত পথ। একজন সালাফী হচ্ছেন সেই ব্যক্তি, যিনি অবিকল কোনো পরিবর্তন ছাড়াই সালাফে-সালেহীনের পথকে অনুসরণ করেন।

আমাদের দাওয়াহ
সুন্নী

সুন্নী, আহলুস-সুন্নাহ ওয়াল-জামাআহ, আছহাবুল-হাদীস এবং আহলুল-হাদীস এই সবই সমার্থক উপাধি । এই উপাধিগুলো একই পথের অনুসারী একটি দলকে বুঝায়। যাইহোক, যারা এই উপাধিগুলোকে ব্যবহার করে, তাদের প্রত্যেকেই প্রকৃত অর্থে নিজ দাবির অনুগামী নন। প্রকৃত অর্থে, বেশিরভাগ মানুষ, যারা এই উপাধিগুলোর সাথে নিজেকে যুক্ত করে তারা সালাফে-সালেহীনের আক্বীদাহ ও মানহাজের বিরোধিতা করে। একজন নিছক দাবিদার ও একজন প্রকৃত অনুসারীর মাঝে পার্থক্য স্থাপন করাই এই অনুচ্ছেদের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।

আমাদের দাওয়াহ

Discover more from Markaz At-Tahawee

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading