সূচিপত্র
কবর যিয়ারতের বৈধ ও অবৈধ বিষয়সমূহ[1]
সকল প্রশংসা শুধু আল্লাহ তা‘আলার জন্য; আমাদের নবী মুহাম্মাদ, তাঁর পরিবার ও তাঁর সাহাবীদের উপর সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক। অতঃপর:
কবর যিয়ারত দুই প্রকার:
প্রথম প্রকার:
শরিয়তসম্মত ও কাঙ্ক্ষিত যেটি মৃত ব্যক্তিদের জন্য রহমত ও ক্ষমা চাওয়ার উদ্দেশ্যে করা হয় এবং মৃত্যুর স্মরণ ও আখিরাতের প্রস্তুতি নেওয়ার উদ্দেশ্যেও করা হয়। কারণ নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
زوروا القبورَ فإنَّها تذَكِّرُكمُ الآخرةَ
‘তোমরা কবর যিয়ারত করো কারণ নিশ্চয়ই তা তোমাদেরকে আখিরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।’[2]
নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কবর যিয়ারত করতেন এবং তাঁর সাহাবীরাও কবর যিয়ারত করতেন। এই বিষয়টি (অর্থাৎ কবর যিয়ারত) পুরুষদের জন্য নির্দিষ্ট, মহিলাদের জন্য নয়। মহিলাদের জন্য কবর যিয়ারত বৈধ নয়; বরং তাদেরকে অবশ্যই এ থেকে নিষেধ করতে হবে। কারণ নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি কবর যিয়ারতকারিণী মহিলাদেরকে লানত (অভিশাপ) করেছেন। কারণ তারা কবর যিয়ারত করলে এতে তাদের জন্য অথবা তাদের দ্বারা ফিতনা সৃষ্টি হতে পারে; ধৈর্যের স্বল্পতা ও অতিরিক্ত অস্থিরতা তাদের উপর যে প্রভাব বিস্তার করে, এজন্য এটি হতে পারে। আর একইভাবে কবরে নেওয়ার সময় থেকে (কবরস্থ করা) পর্যন্ত মৃতদেহের পিছনে চলা তাদের জন্য বৈধ নয়। সহীহ হাদীসে উম্মু আতিয়া (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহা) থেকে বর্ণিত হয়েছে; তিনি বলেছেন:
‘আমাদেরকে (অর্থাৎ, মহিলাদেরকে) মৃতদেহের পিছনে চলা থেকে নিষেধ করা হয়েছে কিন্তু আমাদের উপর কড়াকড়ি আরোপ করা হয়নি।’[3]
এখান থেকে সাব্যস্ত হয় যে, কবর পর্যন্ত মৃতদেহের অনুসরণ করা তাদের জন্য নিষিদ্ধ; কারণ এতে তাদের নিজেদের জন্য অথবা তাদের দ্বারা (অন্যদের জন্য) ফিতনা ও ধৈর্যহীনতা সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা আছে। (যেকোনো ক্ষেত্রে) নিষেধাজ্ঞার মূল হলো যে তা হারাম এবং তা (হারাম) বুঝানোর জন্যই নিষেধ করা হয়েছে; কারণ আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
وَمَا آتَاكُمُ الرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَاكُمْ عَنْهُ فَانتَهُوا
‘রাসূল তোমাদেরকে যা দিয়েছেন তা গ্রহণ করো এবং তিনি যা থেকে তোমাদেরকে নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকো।’[4]
আর মৃত ব্যক্তির জন্য জানাযার সালাত আদায় করা পুরুষ-নারী উভয়ের জন্য বৈধ। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সাহাবীদের থেকে সহীহ হাদীসে এ ব্যাপারে বর্ণিত হয়েছে। আর উম্মু আতিয়া (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহার) কথা ‘আমাদের উপর কড়াকড়ি আরোপ করা হয়নি’ এটি নারীদের জন্য মৃতদেহের (কবর পর্যন্ত) অনুসরণ বৈধ হওয়ার কোনো প্রমাণ বহন করে না। কারণ নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে নিষেধাজ্ঞা আসাই (কোনো কিছু) নিষিদ্ধ হওয়ার জন্য যথেষ্ট। আর তাঁর এই উক্তি ‘আমাদের উপর কড়াকড়ি আরোপ করা হয়নি’, এটির ভিত্তি হলো তার ইজতিহাদ ও ধারণা। তার ইজতিহাদকে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সুন্নাতের বিরুদ্ধে দাঁড় করানো যাবে না।
দ্বিতীয় প্রকার: এই প্রকার যিয়ারত বিদআত[5]; আর তা হলো কবরবাসীদেরকে আহ্বান করা, তাদের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করা, তাদের জন্য পশু জবেহ করা অথবা তাদের কাছে মানত করার উদ্দেশ্যে (তাদের কবর) যিয়ারত করা; এটি একটি জঘন্য কাজ ও বড় শিরক। আমরা আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই। কবরের পাশে দোআ করা, সালাত আদায় করা ও কুরআন তিলাওয়াত করার উদ্দেশ্যে যিয়ারত করলেও সেগুলো এর অন্তর্ভুক্ত হবে। এগুলো বিদআত ও শরীয়ত সম্মত নয় এবং এটি শিরকের একটি মাধ্যম। তাই প্রকৃত অর্থে কবর যিয়ারত তিন প্রকার:
প্রথম প্রকার: (এই প্রকার কবর যিয়ারত) বৈধ। আর তা কবরবাসীর জন্য দোআ ও আখিরাতের স্মরণের উদ্দেশ্যে করা হয়।
দ্বিতীয় প্রকার: যদি কবরের নিকট কুরআন তিলাওয়াত করা, সালাত আদায় করা ও জবেহ করার জন্য যিয়ারত করা হয় তবে তা হবে বিদআত ও শিরকের রাস্তা।
তৃতীয় প্রকার: মৃত ব্যক্তির নামে জবেহ করার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য তালাশ করা, আল্লাহকে বাদ দিয়ে মৃত ব্যক্তির কাছে দোআ করা ও তার কাছে সাহায্য চাওয়ার উদ্দেশ্যে যদি কবর যিয়ারত করা হয় তবে এটি বড় শিরক। আমরা এসব থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই। এসকল বিদআতী পন্থায় কবর যিয়ারত থেকে সাবধান হওয়া জরুরি। যার কাছে দোআ করা হচ্ছে তিনি নবী হোন বা সৎকর্মশীল হোন বা অন্য কেউ হোক এক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য নেই। কিছু জাহেল লোকেরা আছে যারা রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, আল-হুসাইন, আল-বাদাওয়ী, শাইখ আব্দুল ক্বাদির আল-জিলানীর কবরের নিকট দোআ করে ও তাদের কাছে সাহায্য চায়, এটিও তার অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহুল মুস্তাআন।
মৃত ব্যক্তিদেরকে উসিলা (মাধ্যম) হিসেবে গ্রহণ করা, কবর যিয়ারতের বিধান ও কবর যিয়ারতের দোআ[6]
সকল প্রশংসা আল্লাহ তা‘আলার জন্য। সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের নবী মুহাম্মাদ, তাঁর পরিবার ও তাঁর সাহাবীগণের উপর। অতঃপর:
মৃত ব্যক্তিদেরকে উসিলা হিসাবে গ্রহণ করা ও কবর যিয়ারত করার ব্যাপারে আমাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল। আমি নিম্নোক্ত উত্তর দিয়েছিলাম:
যদি এই কবর যিয়ারতের উদ্দেশ্য হয় মৃত ব্যক্তিদের কাছে চাওয়া, জবেহ করার মাধ্যমে তাদের নৈকট্য তালাশ করা, তাদের জন্য নজর-মানত করা, তাদের কাছে বিপদাপদ থেকে আশ্রয় চাওয়া ও আল্লাহকে বাদ দিয়ে তাদের কাছে দোআ করা তাহলে এটি হবে বড় শিরক। এভাবেই যাদেরকে তারা ওলী-আউলিয়া নামে আখ্যায়িত করে থাকে; তারা মৃত হোক বা জীবিত হোক; যাদের ব্যাপারে তারা বিশ্বাস করে যে তারা উপকার করতে পারে, অথবা ক্ষতি করতে পারে, অথবা তাদের দোআর জবাব দিতে পারে, অথবা তাদের অসুস্থদেরকে সুস্থ করতে পারে; এগুলো সবই বড় শিরক। আমরা আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই। মক্কার মুশরিকরা লাত, উজ্জা, মানাত ও তাদের অন্যান্য উপাস্য ও মূর্তিদের সাথে যা করতো এটি সেগুলোর অনুরূপ।
মুসলিম দেশগুলোর শাসক ও আলেমগণের জন্য এ কাজের বিরোধিতা করা আবশ্যক। তাদের উপরে আরো আবশ্যক হলো তারা মানুষকে শরীয়তের ওয়াজিব বিষয়গুলো শেখাবে, শিরককে বাধা দিবে, সাধারণ মানুষ ও শিরকের মধ্যে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে, কবরের উপরে যে সকল গম্বুজ আছে সেগুলোকে ধ্বংস করবে ও অপসারণ করবে। কারণ এগুলো ফিতনা ও শিরকের মাধ্যম। আর এগুলো হারাম। রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কবরের উপর কিছু নির্মাণ করা, প্লাস্টার করা, বসা ও সেই দিকে সালাত আদায় করা থেকে নিষেধ করেছেন এবং তাদেরকে লানত করেছেন যারা কবরের উপরে মসজিদ বানায়। কবরের উপরে মসজিদ বা অন্য কোনো কিছু নির্মাণ করা নাজায়েয। বরং তা উন্মুক্ত রাখা ওয়াজিব যার উপরে কোনো কিছু নির্মিত থাকবে না; যেমনটি মদিনাসহ ঐ প্রত্যেক মুসলিম দেশের অবস্থা ছিল যেসব দেশ বিদআত ও প্রবৃত্তি দ্বারা প্রভাবিত হয়নি।
আর (মৃত্যুকে) স্মরণের জন্য ও মৃত ব্যক্তির জন্য দোআর উদ্দেশ্যে কবর যিয়ারত করা পুরুষদের জন্য সুন্নাত; তবে সেই উদ্দেশ্যে সফর করা যাবে না। নবী (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
زوروا القبورَ فإنَّها تذَكِّرُكمُ الآخرةَ
‘তোমরা কবর যিয়ারত করো কারণ নিশ্চয়ই তা তোমাদেরকে আখিরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।[7]
হাদীসটি ইমাম মুসলিম তার হাদীস গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন।[8] যখন সাহাবীরা কবর যিয়ারত করতেন তখন নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে এটি শিখিয়ে দিতেন:
السَّلَامُ عَلَيْكُمْ دَارَ قَوْمٍ مُؤْمِنِيْن وَإِنَّا إِنْ شَاءَ اللّٰهُ بِكُمْ لَاحِقُوْن نَسْأَلُ اللّٰهَ لَنَا وَلَكُمْ الْعَافِيَةَ يَرْحَمُ اللّٰهُ الْمُسْتَقْدِمِيْنَ مِنَّا وَالْمُسْتَأْخِرِيْن
উচ্চারণ: আস-সালামু ‘আলাইকুম দা-রা কওমিন মুমিনীন ওয়া ইন্না ইন শা আল্লাহু বিকুম লা-হিকূন নাসআলুল্লাহা লানা ওয়া লাকুম আল-‘আফিইয়াতা ইয়ারহামুল্লাহুল মুসতাকদিমীনা মিন্না ওয়াল মুসতাখিরীন
অর্থ: হে কবরবাসী মুমিনগণ, তোমাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক। ইন শা আল্লাহ, নিশ্চয়ই আমরা তোমাদের সাথে মিলিত হবো। আল্লাহর কাছে দোআ করি তিনি যেন আমাদেরকে ও তোমাদেরকে রক্ষা করেন। আমাদের মধ্যে যারা অগ্রগামী ও যারা পশ্চাদগামী আল্লাহ যেন তাদেরকে দয়া করেন।[9]
ইমাম তিরমিযী তার গ্রন্থে ইবনু ‘আব্বাস (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুমা) থেকে বর্ণনা করেছেন, ইবনু ‘আব্বাস (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুমা) বলেছেন, নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদিনার কবরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি তাদের দিকে মুখ ফিরালেন এবং বললেন:
السلام عليكم يا أهل القبور يغفر الله لنا ولكم أنتم سلفنا ونحن بالأثر
অর্থ: হে কবরবাসীগণ তোমাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক। আল্লাহ আমাদেরকে ও তোমাদেরকে ক্ষমা করুন। তোমরা আমাদের অগ্রবর্তী ও আমরা তোমাদের পদাঙ্ক অনুসরণকারী। [10]
এই অর্থে অনেক হাদীস আছে। বুখারী ও মুসলিমে আবূ সা‘ঈদ আল-খুদরী (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) থেকে বর্ণিত যে, রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
لا تشدوا الرحال إلا إلى ثلاثة مساجد المسجد الحرام ومسجدي هذا والمسجد الأقصى
অর্থ: তোমরা তিনটি মসজিদ ছাড়া অন্য কোনো মসজিদের উদ্দেশ্যে সফর করবে না: আল-মাসজিদুল হারাম, আমার এই মসজিদ (আল-মাসজিদ আন-নববী) ও আল-মাসজিদুল আক্বসা।[11]
আল্লাহই তাওফীক্বদাতা। আমাদের নবী মুহাম্মাদ, তাঁর পরিবার ও তাঁর সাহাবীদের উপর সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক।
শরীয়ত সম্মত কবর যিয়ারত[12]
প্রশ্ন: একজন প্রশ্নকারী তাদের সম্পর্কে প্রশ্ন করেছেন যারা গম্বুজ (বিশিষ্ট কবর) ও সৎ লোকদের কবর যিয়ারত করে। (এ ব্যাপারে) আপনার দিকনির্দেশনা কি?
উত্তর: তাদের কবর যিয়ারতের শরীয়ত সম্মত পন্থা শেখানো দরকার কারণ সাহাবীরা যখন কবর যিয়ারত করতেন তখন নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে এটি বলতে শিখিয়েছেন:
السلام عليكم أهل الديار من المؤمنين والمسلمين وإنا إن شاء الله بكم لاحقون نسأل الله لنا ولكم العافية
অর্থ: হে কবরবাসী মুমিন ও মুসলিম তোমাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক। নিশ্চয়ই আমরা তোমাদের সাথে মিলিত হব। আমরা আল্লাহর কাছে আমাদের ও তোমাদের জন্য নিরাপত্তা চাই।[13]
অন্য হাদীসে তিনি বলেছেন:
السلام عليكم دار قوم مؤمنين وأتاكم ما توعدون غدا مؤجلون وإنا إن شاء الله بكم لاحقون اللهم اغفر لأهل بقيع الغرقد
অর্থ: হে কবরবাসী মুমিনগণ তোমাদের উপর সালাম বর্ষিত হোক। তোমাদেরকে যার প্রতিশ্ৰুতি দেওয়া হয়েছিল তা তোমাদের কাছে এসে গেছে। (পরিপূর্ণ প্রতিদান) আগামীতে পাবে। আল্লাহ চাইলে আমরা তোমাদের সাথে মিলিত হবো । হে আল্লাহ, আপনি বাকী আল-গারকাদের কবরবাসীদেরকে ক্ষমা করুন।[14]
অন্য এক হাদীসে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
يرحم الله المستقدمين منا والمستأخرين يغفر الله لنا ولكم أنتم سلفنا ونحن بالأثر
অর্থ: আমাদের মধ্যে যারা অগ্রগামী ও যারা পশ্চাদগামী হে আল্লাহ (আমাদের সকলের উপর ) দয়া করুন। আল্লাহ যেন আমাদেরকে ও তোমাদেরকে ক্ষমা করেন । তোমরা আমাদের অগ্রবর্তী ও আমরা তোমাদের পদাঙ্ক অনুসরণকারী।
উপরোক্ত হাদীসগুলো এবং এই হাদীসের অর্থে যেসব হাদীস বর্ণিত হয়েছে সেখান থেকে কবর যিয়ারতের শরীয়ত সম্মত পদ্ধতি শিখতে হবে। আর মৃত ব্যক্তিদের জন্য দোআ করা ও কবর যিয়ারতকারী ব্যক্তির মৃত্যু ও আখিরাতকে স্মরণ করতে পারাই এই কবর যিয়ারতের উদ্দেশ্য। কারণ নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
زوروا القبور فإنها تذكركم الآخرة
অর্থ: তোমরা কবর যিয়ারত করো কারণ নিশ্চয়ই তা তোমাদেরকে আখিরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।[15]
কবরের উপর মসজিদ ও গম্বুজ নির্মাণ করা জায়েয নয়; কারণ নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
لعن الله اليهود والنصارى اتخذوا قبور أنبيائهم مساجد
অর্থ: ইহুদি নাসারাদের উপর আল্লাহর লানত। তারা তাদের নবীদের কবরগুলোকে মসজিদ হিসেবে গ্রহণ করেছে।[16]
‘আলী (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু)-কে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
لا تدع صورة إلا طمستها ولا قبرا مشرفا إلا سويتها
অর্থ: তুমি কোনো ছবি নষ্ট না করে ছাড়বে না এবং কোনো কবরকে সমতল না করে ছাড়বে না।[17]
জাবির (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুর) বর্ণিত হাদীসে রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সহীহ সনদে বর্ণিত হয়েছে যে:
তিনি (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কবর প্লাস্টার করা, কবরের উপর বসা ও কবরের উপর কিছু নির্মাণ করা থেকে নিষেধ করেছেন। ইমাম মুসলিম তার গ্রন্থে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।[18]
কবরের উপরে কোনো কিছু নির্মাণ করা নাজায়েয, এর উপরে কোনো মসজিদ নির্মাণ করা যাবে না, কোনো গম্বুজ তৈরি করা যাবে না, প্লাস্টার করা যাবে না ও এর উপরে বসা যাবে না। এগুলো সবই নিষিদ্ধ। কবরকে পর্দা দিয়ে ঢাকা নাজায়েয; বরং কবরকে এক বিঘত পর্যন্ত উঁচু রাখতে হবে যাতে বোঝা যায় যে সেটি কবর এবং সেটি যেন অবমাননা ও পদদলিত না করা হয়। তাই যাদের কাছে এই বিষয়ে জ্ঞান আছে তাদের প্রত্যেকেরই উচিত তাদের ভাইদের নিকট তা প্রচার করা ও তাদেরকে এই বিষয়টি শিক্ষা দেওয়া। এটিই আলেমগণের কাজ আর তা হলো আল্লাহ যে বিধান দিয়েছেন তা মানুষকে শিক্ষা দেওয়া। মুমিন ব্যক্তি আলেমদের কাছ থেকে শিখবে এবং যারা কবরের কাছে আসবে তাদেরকে (যিয়ারতের বিধিনিষেধ) শেখাবে। সে তাদেরকে বলবে যে, এটি হলো কবর যিয়ারতের শরীয়ত সম্মত নিয়ম। কবরের উপরে কোনো কিছু নির্মাণ করা, মৃত ব্যক্তির কাছে কিছু চাওয়া, কবরের মাটি থেকে বরকত গ্রহণ করা, কবরকে চুমু দেওয়া ও কবরের কাছে সালাত আদায় করা; এগুলো সবই বিদআত। তাই কবরের কাছে দোআ করা যাবে না, কবরকে দোআ করার স্থান হিসাবে গ্রহণ করা যাবে না এবং এর কাছে কুরআন পাঠ করা যাবে না। এগুলো সবই বিদআত। আর কবর থেকে বরকত, শাফাআত ও রোগীর জন্য আরোগ্য চাওয়া হলো বড় শিরকের অন্তর্ভুক্ত। যদি সে বলে, হে মহোদয় অমুক! আল্লাহর কাছে আমার জন্য সুপারিশ করুন, অথবা সে মৃত ব্যক্তিকে বলে, আমাকে সাহায্য করুন অথবা বলে, আমার অসুস্থ ব্যক্তিকে আরোগ্য দান করুন; সে এ ধরনের আরো যেসব কথা বলে; এগুলো সবই নাজায়েয। কারণ মৃত্যুর পরে মৃত ব্যক্তির তিনটি আমল ব্যতীত অন্য সকল আমল বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় (সেগুলো হলো:) সাদাকাহ জারিয়াহ[19], এমন জ্ঞান যা দ্বারা মানুষ উপকৃত হয় ও সৎ সন্তান যে তার জন্য দোআ করে । আর সে যদি (মৃত ব্যক্তির) কাছে অসুস্থদের জন্য আরোগ্য চায়, শত্রুদের বিরুদ্ধে বিজয় চায়, মৃত ব্যক্তির কাছে সে চায় যেন সে আল্লাহর কাছে তার জন্য কোনো বিষয়ে শাফাআত করুক; তবে এটি বড় শিরক। মৃত ব্যক্তিদের কাছে এসব চাওয়া জায়েজ নয়। এগুলো শুধুই আল্লাহর কাছে চাইতে হবে। সে বলবে হে আল্লাহ, আমাকে সুস্থতা দান করুন। হে আল্লাহ, আমাকে অমুক জিনিস দিন। হে আল্লাহ, আপনার নবীদেরকে দিয়ে আমার ব্যাপারে শাফাআত করান । হে আল্লাহ, আপনার নবী মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দিয়ে আমার ব্যাপারে শাফাআত করান , হে আল্লাহ ফেরেশতাগণ ও মুমিনদেরকে দিয়ে আমার ব্যাপারে শাফাআত করান; এভাবে (বললে) সমস্যা নেই কারণ এখানে আল্লাহর কাছেই চাওয়া হচ্ছে।
সারকথা হল, মুসলিমরা একে অন্যকে নসিহত করবে এবং একে অন্যকে শরীয়তের বিষয় শিক্ষা দেবে। আর আলেমদের উচিত এই ব্যাপারে সাধারণ মানুষকে নির্দেশনা দেওয়া। আর কবর যিয়ারতের শরীয়ত সম্মত পদ্ধতি শিক্ষা দেওয়া যা নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যার বর্ণনা পূর্বে দেওয়া হয়েছে; তাদেরকে এই শিক্ষা দেওয়া যে কবরের উপর কিছু নির্মাণ করা জায়েয নয় ও এর উপরে গম্বুজ বা মসজিদ নির্মাণ করা জায়েয নয় ; কবরের উপর প্লাস্টার করা, এর উপরে বসা, একে দোআ করার জায়গা হিসাবে গ্রহণ করা ও এর নিকটে সালাত আদায় করা বা কুরআন পাঠ করা এগুলো সবই বিদআত ও এগুলো সবই বড় শিরকের মাধ্যম। আল্লাহই তাওফীক্বদাতা।
কবরের নিকট যেসকল শিরক সংঘটিত হয়[20]
প্রশ্ন: মুসলিম সমাজে শরীয়ত বিরোধী বিভিন্ন কর্মকাণ্ড ছড়িয়ে পড়েছে; এর মধ্যে কিছু বিষয় আছে যা কবরের নিকটে সংঘটিত হয় এবং কিছু বিষয় কসম, নজর ও মানতের সাথে সম্পর্কিত। এই শরীয়ত বিরোধী কর্মকাণ্ডের বিধান ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে। এর মধ্যে কিছু কিছু কর্মকাণ্ড এমন শিরকের অন্তর্ভুক্ত যেগুলো ইসলাম থেকে বের করে দেয় আবার কিছু কিছু কর্মকাণ্ড আছে যেগুলো এর থেকে কম মারাত্মক। তাই ভালো হতো যদি আপনি এসকল বিষয় ব্যাখ্যা করতেন এবং এসকল মাসআলার বিধানসমূহ তাদের জন্য বর্ণনা করতেন; আর সাধারণ মুসলিমদেরকে এসকল বিষয়ে তুচ্ছজ্ঞান করা থেকে ভীতি প্রদর্শন করার জন্য যদি একটু নসিহত করতেন।
উত্তর: সকল প্রশংসা আল্লাহ তা‘আলার জন্য। সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উপর, তাঁর পরিবারবর্গের উপর, তাঁর সাহাবীদের উপর এবং যারা তাঁর হিদায়াতের অনুসরণ করবে তাদের উপর।
অতঃপর: নিশ্চয়ই অনেক মানুষ কবর বিষয়ক শরীয়ত সম্মত বিষয়গুলোর সাথে শিরকী ও বিদআতী বিষয়গুলো মিলিয়ে ফেলে। এভাবেই তাদের অনেকেই অজ্ঞতা ও অন্ধ অনুসরণের কারণে বড় শিরকে পতিত হয়। তাই সকল অঞ্চলের আলেমদের কর্তব্য হলো মানুষের কাছে তাদের দীনকে স্পষ্টভাবে বর্ণনা করা এবং তাদেরকে তাওহীদ ও শিরকের প্রকৃত অবস্থার বর্ণনা দেওয়া। আলেমদের উপর আরো কর্তব্য হলো শিরকের মাধ্যমসমূহ ও যেসব বিদআতে তারা পতিত হয়েছে সেসব বিষয়গুলোকে তাদের কাছে স্পষ্ট করা যাতে তারা সেগুলো থেকে সাবধান থাকে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
وَإِذْ أَخَذَ اللَّهُ مِيثَاقَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ لَتُبَيِّنُنَّهُ لِلنَّاسِ وَلَا تَكْتُمُونَهُ
অর্থ: আর স্মরণ করো ,যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছিল, যখন আল্লাহ তাদের প্রতিশ্রুতি নিয়েছিলেন: তোমরা অবশ্যই তা মানুষের কাছে স্পষ্টভাবে বর্ণনা করবে এবং তা গোপন করবে না।[21]
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:
إِنَّ الَّذِينَ يَكْتُمُونَ مَا أَنزَلْنَا مِنَ الْبَيِّنَاتِ وَالْهُدَىٰ مِن بَعْدِ مَا بَيَّنَّاهُ لِلنَّاسِ فِي الْكِتَابِ ۙ أُولَٰئِكَ يَلْعَنُهُمُ اللَّهُ وَيَلْعَنُهُمُ اللَّاعِنُونَ (159) إِلَّا الَّذِينَ تَابُوا وَأَصْلَحُوا وَبَيَّنُوا فَأُولَٰئِكَ أَتُوبُ عَلَيْهِمْ ۚ وَأَنَا التَّوَّابُ الرَّحِيمُ (160)
অর্থ: নিশ্চয়ই যারা গোপন করে সেসব স্পষ্ট নিদর্শন ও হিদায়াত যা আমরা নাযিল করেছি, মানুষের জন্য কিতাবে তা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করার পরেও; আল্লাহ তাদেরকে লানত করেন এবং লানতকারীগণও তাদেরকে লানত করে। (১৫৯) তবে তারা বাদে যারা তাওবাহ করেছে, সংশোধন করেছে ও (সত্যকে) সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে; এদের তাওবাহ আমি কবুল করব। আর আমি তাওবাহ কবুলকারী পরম করুণাময়। (১৬০) [22]
এবং নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
من دل على خير، فله مثل أجر فاعله
অর্থ: যে ব্যক্তি কোনো ভালো আমলের প্রতি পথনির্দেশ করে সে আমলকারীর সমপরিমাণ সাওয়াবের অধিকারী হয়। হাদীসটি ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেন।[23]
নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেছেন:
مَن دعا إلى هُدًى كان له مِن الأجرِ مِثْلُ أجورِ مَن تبِعهُ لا ينقُصُ ذلك مِن أجورِهم شيئًا، ومَن دعا إلى ضلالةٍ كان عليه مِن الإثمِ مِثْلُ آثامِ مَن تبِعهُ لا ينقُصُ ذلك مِن آثامِهم شيئًا
অর্থ: যে ব্যক্তি হিদায়াতের প্রতি আহ্বান করবে সে ঐ হিদায়াতের অনুসারীর সমপরিমাণ সাওয়াব পাবে। এতে তাদের সাওয়াব থেকে কোনো কিছু কমবে না। আর যে ব্যক্তি পথভ্রষ্টতার প্রতি আহ্বান করবে সে ঐ পথভ্রষ্টতার অনুসারীর সমপরিমাণ পাপের ভাগীদার হবে। এতে তার পাপ থেকে কোনো কিছুই কমবে না। এই হাদীসটিও ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেন।[24]
বুখারী ও মুসলিমে মু’আবিয়াহ (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) থেকে বর্ণিত যে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
مَنْ يُرِدِ اللَّهُ بِهِ خَيْرًا يُفَقِّهْهُ فِي الدِّينِ
অর্থ: আল্লাহ যার কল্যাণ চান তিনি তাকে দীনের ফিক্বহ (বুঝ) দান করেন।[25]
জ্ঞান প্রচার-প্রসারের দাওয়াত, মানুষকে এ ব্যাপারে উৎসাহ প্রদান করা, দীনের জ্ঞানকে উপেক্ষা করা ও তা গোপন করা থেকে সতর্ক করার ব্যাপারে অনেক আয়াত ও হাদীস বর্ণিত হয়েছে।
অনেক দেশে কবরের কাছে যেসব শিরক ও বিদআত সংঘটিত হয় তা একটি জানা বিষয় এবং এর প্রতি মনোযোগ দেওয়া, এটি স্পষ্ট করা ও এত্থেকে সতর্ক করার জন্য এটি উপযুক্ত একটি বিষয়। আর (এসব শিরক-বিদআতের) মধ্যে কবরবাসীদের কাছে দোআ করা, তাদের কাছে উদ্ধার চাওয়া, অসুস্থদের জন্য আরোগ্য চাওয়া, শত্রুর বিরুদ্ধে সাহায্য চাওয়া ও এ ধরনের অন্যান্য কর্মকাণ্ডগুলো অন্তর্ভুক্ত। এগুলো সবই বড় শিরকের অন্তর্ভুক্ত যার উপর জাহিলিয়াতের যুগের লোকেরা প্রতিষ্ঠিত ছিল। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
يَا أَيُّهَا النَّاسُ اعْبُدُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ وَالَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ
অর্থ: হে মানবজাতি, তোমরা তোমাদের সেই রবের ইবাদাত করো যিনি তোমাদেরকে এবং তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাক্বওয়া অর্জন করতে পারো।[26]
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ
অর্থ: আমি জিন ও মানুষকে শুধু আমার ইবাদাতের জন্য সৃষ্টি করেছি।[27]
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:
وقضى ربك ألا تعبدوا إلا إياه
অর্থ: আর তোমার রব আদেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তাঁকে ব্যতীত অন্য কারো ইবাদাত করবে না।[28] (قضى)-এর অর্থ আদেশ করেছেন ও উপদেশ দিয়েছেন।
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:
وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ حُنَفَاءَ
অর্থ: তাদেরকে শুধু এই আদেশই দেওয়া হয়েছে যে, তারা যেন (একমাত্র) আল্লাহরই ইবাদাত করে দীনকে তাঁরই জন্য একনিষ্ঠ করে … [29] এই অর্থে অনেক আয়াত আছে।
আর যে ইবাদতের কারণে মানুষ ও জিন জাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে ও যে ইবাদাতের জন্য তাদেরকে আদেশ করা হয়েছে তা হলো: আল্লাহ তা‘আলার তাওহীদ (একত্ববাদ) ও আনুগত্যের ক্ষেত্রে সকল প্রকার ইবাদাত আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট করা যেমন: সালাত, সাওম, যাকাত, হাজ্জ, জবেহ, ও নজর-মানত। যেমনটি আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ * لَا شَرِيكَ لَهُ ۖ وَبِذَٰلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا أَوَّلُ الْمُسْلِمِينَ
অর্থ: বলুন, নিশ্চয়ই আমার সালাত, আমার জবেহ, আমার জীবন ও আমার মরণ সৃষ্টিজগতের রব আল্লাহর জন্য। তাঁর কোনো শরীক নেই। আর আমাকে এরই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং আমি মুসলিমদের মধ্যে প্রথম। [30]
নুসুক হলো ইবাদাত আর এর মধ্যে জবেহ অন্তর্ভুক্ত। যেমনটি আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
إِنَّا أَعْطَيْنَاكَ الْكَوْثَرَ * فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ
অর্থ: নিশ্চয়ই আমরা আপনাকে কাওছার দান করেছি * অতএব আপনার রবের জন্য সালাত আদায় করুন ও জবেহ করুন। [31]
নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
لعن الله من ذبح لغير الله
অর্থ: আল্লাহর লানত তার উপরে যে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো জন্য জবেহ করে। [32]
ইমাম মুসলিম তার কিতাবে আমিরুল মুমিনীন ‘আলী বিন আবী ত্বালিব (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) থেকে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:
وَأَنَّ الْمَسَاجِدَ لِلَّهِ فَلَا تَدْعُوا مَعَ اللَّهِ أَحَدًا
অর্থ: আর মসজিদসমূহ (একমাত্র) আল্লাহরই জন্য অতএব তোমরা আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে ডেকো না। [33]
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:
وَمَن يَدْعُ مَعَ اللَّهِ إِلَٰهًا آخَرَ لَا بُرْهَانَ لَهُ بِهِ فَإِنَّمَا حِسَابُهُ عِندَ رَبِّهِ ۚ إِنَّهُ لَا يُفْلِحُ الْكَافِرُونَ
অর্থ: আর যে আল্লাহর সাথে অন্য কোনো ইলাহ্কে ডাকে; এ বিষয়ে তার নিকট কোনো দলিল নেই; তার হিসাব হবে তার রবের নিকট; নিশ্চয়ই কাফেররা সফলকাম হবে না। [34]
আল্লাহ তা‘আলা সূরাহ ফাতিরে বলেন:
ذَٰلِكُمُ اللَّهُ رَبُّكُمْ لَهُ الْمُلْكُ ۚ وَالَّذِينَ تَدْعُونَ مِن دُونِهِ مَا يَمْلِكُونَ مِن قِطْمِيرٍ * إِن تَدْعُوهُمْ لَا يَسْمَعُوا دُعَاءَكُمْ وَلَوْ سَمِعُوا مَا اسْتَجَابُوا لَكُمْ ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يَكْفُرُونَ بِشِرْكِكُمْ ۚ وَلَا يُنَبِّئُكَ مِثْلُ خَبِيرٍ
অর্থ: তিনিই আল্লাহ, তোমাদের রব। রাজত্ব তাঁরই। আর তোমরা তাঁর পরিবর্তে যাদেরকে ডাকো তারা খেজুরের বিচির আবরণেরও মালিক নয়। (১৩) যদি তোমরা তাদেরকে ডাকো তারা তোমাদের ডাক শুনবে না। আর যদি তা শুনতেও পায় তারা তোমাদের ডাকে সাড়া দিবে না। আর কিয়ামতের দিন তারা তোমাদের শিরককে অস্বীকার করবে। সর্বজ্ঞ (আল্লাহর) মতো কেউই তোমাকে অবহিত করতে পারবে না। [34]
এই আয়াতসমূহে আল্লাহ তা‘আলা স্পষ্ট করেছেন যে, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো জন্য সালাত আদায় করা ও জবেহ করা, এবং মৃত ব্যক্তি, মূর্তি, গাছপালা ও পাথরের কাছে দোআ করা সবই আল্লাহর সাথে শিরক ও কুফরী। তিনি ব্যতীত যেসকল নবী, ফেরেশতা, ওলী, জিন ও মূর্তিদেরকে আহ্বান করা হয়, তারা আহ্বানকারীর কোনো উপকার বা কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো কাছে দোআ করা শিরক ও কুফরী। যেমনটি আল্লাহ তা‘আলা স্পষ্ট করেছেন যে, তারা তাদের আহ্বানকারীর ডাক শুনতে পায় না। আর যদিও বা শুনতে পায় তবে তারা তাদের ডাকে সাড়া দেয় না।
তাই জিন ও মানুষের মাঝে সকল দায়িত্বপ্রাপ্তদের জন্য কর্তব্য হলো এটি (শিরক) থেকে সতর্ক থাকা, অন্যদেরকে সতর্ক করা ও এটি যে বাতিল তা মানুষের কাছে তুলে ধরা। আর রাসূলগণ (আলাইহিমুস সালাম) যেসব বিষয় নিয়ে এসেছেন যেমন: তাওহীদের প্রতি দাওয়াত দেওয়া ও একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদাত করা; এসব বিষয় শিরক বিরোধী। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَّسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ
অর্থ: আর আমরা প্রত্যেক জাতির নিকটেই রাসূল পাঠিয়েছি (এই নির্দেশ দিয়ে) যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদাত করো এবং তাগুতকে (শয়তানকে ও অন্যান্য বাতিল উপাস্যকে) বর্জন করো । [35]
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:
وَمَا أَرْسَلْنَا مِن قَبْلِكَ مِن رَّسُولٍ إِلَّا نُوحِي إِلَيْهِ أَنَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدُونِ
অর্থ: আর আপনার পূর্বে যে রাসূলকেই আমরা পাঠিয়েছি তাঁর কাছে এই ওহী পাঠিয়েছি যে, আমি ছাড়া সত্য কোনো ইলাহ নেই অতএব তোমরা আমারই ইবাদাত করো ।[36] নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মক্কায় ১৩ বছর অবস্থান করেছিলেন। সেখানে তিনি আল্লাহর প্রতি দাওয়াত দিয়েছেন , শিরক থেকে সতর্ক করেছেন ও তাদের কাছে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এর অর্থ স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। অতঃপর অল্প কিছু লোক তাঁর দাওয়াতে সাড়া দিলো এবং অধিকাংশ মানুষ তাঁর আনুগত্য ও অনুসরণ করতে অহংকার করল । অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মদিনায় হিজরত করলেন । অতঃপর সেখানে মুহাজির ও আনসার সাহাবীদের মাঝে ইসলামের দাওয়াত ছড়িয়ে পড়ল । নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর পথে জিহাদ করলেন, রাজা ও বিভিন্ন রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে চিঠি লিখে তাঁর দাওয়াত ও তিনি যে হিদায়াত নিয়ে এসেছেন সেটি তাদের কাছে স্পষ্টভাবে বর্ণনা করলেন অতঃপর তিনি ও তাঁর সাহাবীরা ধৈর্য ধারণ করলেন যতক্ষণ না আল্লাহর দীন বিজয়ী হলো এবং মানুষ দলে দলে ইসলামে প্রবেশ করতে থাকল । নবীর (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হাতে ও তারপরে তাঁর সাহাবীদের হাতে মক্কা, মদিনা ও সমস্ত আরব উপদ্বীপে তাওহীদ প্রসারিত হলো ও শিরক দূরীভূত হলো । তারপরে তাঁর সাহাবীগণ পৃথিবীর পূর্ব ও পশ্চিমে আল্লাহর প্রতি দাওয়াত দিতে থাকলেন ও তাঁর রাস্তায় জিহাদ পরিচালনা করতে থাকলেন । অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা তাদের শত্রুদের বিরুদ্ধে তাদেরকে বিজয়ী করলেন , তাদেরকে পৃথিবীতে নেতৃত্ব দিলেন এবং ইসলাম সমস্ত দীনের উপরে বিজয়ী হলো । যেমনটি আল্লাহ তা‘আলা তাঁর কিতাবে এই ব্যাপারে ওয়াদা প্রদান করেছেন । আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُولَهُ بِالْهُدَىٰ وَدِينِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُلِّهِ وَلَوْ كَرِهَ الْمُشْرِكُونَ
অর্থ: তিনিই তাঁর রাসূলকে হিদায়াত ও সত্য দীন (ধর্ম) সহ পাঠিয়েছেন তাকে সকল দীনের উপর বিজয়ী করার জন্য, যদিও মুশরিকরা তা অপছন্দ করে। [37]
বিদআত ও শিরকের প্রকারগুলোর মধ্যে আরো অনেক (প্রকার) আছে যা কবরকে ঘিরে করা হয় যেমন: কবরের কাছে সালাত আদায় করা, কুরআন পাঠ করা ও কবরের উপর মসজিদ ও গম্বুজ নির্মাণ করা। এগুলো সবই বিদআত ও নিকৃষ্ট কাজ এবং বড় শিরকের মাধ্যম। এ কারণে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সহীহ সনদে বর্ণিত হয়েছে যে তিনি বলেছেন:
لَعَنَ اللَّهُ اليَهُودَ والنَّصَارَى، اتَّخَذُوا قُبُورَ أنْبِيَائِهِمْ مَسَاجِدَ
অর্থ: ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের প্রতি আল্লাহর লানত। তারা তাদের নবীদের কবরগুলোকে মসজিদে পরিণত করেছে।[38] ‘আয়িশাহ (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহা) থেকে বর্ণিত এই হাদীসটি বুখারী ও মুসলিমের ঐক্যমতে সহীহ। আর সহীহ মুসলিমে জুনদুব বিন ‘আব্দিল্লাহ (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন যে তিনি বলেছেন:
(أَلاَ وَإِنَّ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ كَانُوا يَتَّخِذُونَ قُبُورَ أَنْبِيَائِهِمْ وَصَالِحِيهِمْ مَسَاجِدَ أَلاَ فَلاَ تَتَّخِذُوا الْقُبُورَ مَسَاجِدَ إِنِّي أَنْهَاكُمْ عَنْ ذَلِكَ
অর্থ: ‘সাবধান! নিশ্চয়ই তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা তাদের নবী ও সৎলোকদের কবরসমূহকে মসজিদ (সিজদার জায়গা) হিসেবে গ্রহণ করত। অতএব সাবধান! তোমরা কবরগুলোকে মসজিদ হিসেবে গ্রহণ করো না। নিশ্চয়ই আমি তোমাদেরকে এ কাজ থেকে নিষেধ করছি।’[39]
রাসূল (সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এই দুই হাদীস ছাড়াও এ অর্থে অন্যান্য যেসব হাদীস এসেছে ঐগুলোতে স্পষ্ট করেছেন যে, ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা (যেহেতু) তাদের নবীদের কবরকে মসজিদ হিসেবে গ্রহণ করত, তাই তিনি তাঁর উম্মতকে কবরকে মসজিদ হিসেবে গ্রহণ করা, এর কাছে সালাত আদায় করা, এর কাছে অবস্থান করা ও কুরআন পাঠ করার মাধ্যমে তাদের সাদৃশ্য অবলম্বন করা থেকে সতর্ক করেছেন। কারণ এগুলো সবই শিরকের রাস্তা। আর কবরের উপরে গম্বুজ ও পর্দা দেওয়াও এর অন্তর্ভুক্ত। এগুলো সবই শিরকের মাধ্যম ও কবরবাসীদের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি। যেমনটি ইহুদি, খ্রিষ্টান ও এই উম্মতের মূর্খ লোকদের থেকে সংঘটিত হয়েছে এমনকি তারা কবরবাসীদের পূজা করেছে, তাদের জন্য জবেহ করেছে, বিপদাপদে তাদের কাছে সাহায্য চেয়েছে, তাদের কাছে নজর-মানত করেছে, অসুস্থদের জন্য সুস্থতা চেয়েছে ও শত্রুদের বিরুদ্ধে সাহায্য চেয়েছে। এগুলো তার কাছে অজানা নয়, যে জানে হুসাইন, বাদাওয়ী, শাইখ আব্দুল ক্বাদির আল-জিলানী, ইবনু আরাবি ও অন্যদের কবরের কাছে কত ধরনের বড় শিরক করা হয়। আল্লাহুল মুস্তা‘আন। লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ।
নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি কবর বাঁধাই করা (প্লাস্টার করা), কবরের উপরে বসা, এর উপরে কিছু নির্মাণ করা এবং এর উপরে লেখা থেকে নিষেধ করেছেন। এটি শুধু এই কারণেই যে, কবর বাঁধাই করা ও এর উপরে কিছু নির্মাণ করা কবরবাসীদেরকে (আল্লাহর) সাথে শরীক করার (বড় শিরকের) একটি মাধ্যম।
তাই শাসক হোক বা জনগণ সকল মুসলিমদের জন্য ওয়াজিব হলো এই শিরক ও বিদআত থেকে সাবধান থাকা এবং বিশুদ্ধ ‘আক্বীদার জন্য পরিচিত এমন আলিমদেরকে প্রশ্ন করা এবং দীনের কোনো ব্যাপারে তাদের জন্য জটিলতা সৃষ্টি হলে সে ব্যাপারে সালাফদের মানহাজের উপরে চলা যাতে করে তারা জেনে-শুনে আল্লাহর ইবাদাত করতে পারে; আল্লাহ তা‘আলার এই বাণীর উপরে আমল করতে পারে:
فَاسْأَلُوا أَهْلَ الذِّكْرِ إِن كُنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ
অর্থ: অতএব, যদি তোমরা না জানো তবে জ্ঞানীদেরকে জিজ্ঞেস করো।[40] এবং নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই বাণীর উপরে আমল করতে পারে:
من سلك طريقًا يلتمس فيه علما سهل الله له به طريقًا إلى الجنة
অর্থ: যে ব্যক্তি (দীনী ইলম) অর্জনের জন্য কোনো মাধ্যম গ্রহণ করে, এর মাধ্যমে আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথসমূহ হতে একটি পথকে সহজ করে দেন।[41]
এবং নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এই বাণী:
مَنْ يُرِدِ اللَّهُ بِهِ خَيْرًا يُفَقِّهْهُ فِي الدِّينِ
অর্থ: আল্লাহ যার কল্যাণ চান তিনি তাকে দীনের ফিক্বহ (জ্ঞান) দান করেন।[42]
এটি জানা বিষয় যে, বান্দাদেরকে নিরর্থক সৃষ্টি করা হয়নি বরং তাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে মহান প্রজ্ঞা ও সম্মানিত এক লক্ষ্য নিয়ে। আর তা হলো সকল কিছু বাদ দিয়ে একমাত্র আল্লাহর ইবাদাত করা। যেমনটি আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ
অর্থ: আমি জিন ও মানুষকে শুধু আমার ইবাদাতের জন্য সৃষ্টি করেছি।[43]
মহান কিতাব (কুরআন) ও পবিত্র সুন্নাহ গভীরভাবে অধ্যয়ন না করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কোন কোন ইবাদাতের আদেশ করেছেন তা না জেনে এবং কোনো মাসআলার জটিলতা সম্পর্কে আলেমদেরকে জিজ্ঞেস না করে এই ইবাদাত সম্পর্কে জানার কোনো উপায় নেই। এভাবেই আপনি আল্লাহ তা‘আলার ইবাদাত সম্পর্কে জানতে পারবেন যে জন্য বান্দাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং তিনি যেভাবে ইবাদাতের বিধান দিয়েছেন সেভাবে ইবাদাত করবেন। এটিই হলো আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টি, তাঁর সম্মান পেয়ে সফল হওয়া এবং তাঁর ক্রোধ ও শাস্তি থেকে রক্ষা পাওয়ার একমাত্র উপায়। আল্লাহ তা‘আলা যেন মুসলিমদেরকে সে বিষয়ের তাওফীক্ব দেন যেটিতে তাঁর সন্তুষ্টি আছে, তাদেরকে দীনের জ্ঞান দান করেন, তাদের ভিতর যারা উত্তম তাদেরকে যেন তাদের উপর নেতৃত্ব দান করেন ও তাদের শাসকদেরকে সংশোধন করে দেন । আর আল্লাহ তা‘আলা যেন মুসলিম আলেমদেরকে তাদের ওয়াজিব কাজ যেমন: দাওয়াত, শিক্ষা, নসিহত ও দিকনির্দেশনার দায়িত্ব পালনের তাওফীক্ব দেন। নিশ্চয়ই তিনি মহান দাতা।
শিরকের আরো প্রকারগুলোর মধ্যে রয়েছে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে কসম করা, যেমন: নবীদের নামে কসম করা, কারো মাথা বা জীবন নিয়ে কসম করা এবং আমানত ও মর্যাদা নিয়ে কসম করা। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীস থেকে সাব্যস্ত হয়েছে যে তিনি বলেছেন:
مَن كانَ حَالِفًا، فَلْيَحْلِفْ باللَّهِ أوْ لِيَصْمُتْ
অর্থ: কেউ যদি কসম করতে চায় সে যেন আল্লাহর নামে কসম করে অথবা চুপ থাকে।[44]
হাদীসটি বুখারী ও মুসলিমের মতে সহীহ। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেন:
من حلف بشيئ دون الله فقد أشرك
অর্থ: যে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কিছুর নামে কসম করলো সে শিরক করলো। হাদীসটি ইমাম আহমাদ সহীহ সনদে ‘উমার ইবনুল খাত্তাব থেকে বর্ণনা করেছেন। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেন:
مَن حَلَف بالأمانةِ فليس مِنَّا
অর্থ: যে আমানত নিয়ে কসম করে সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।[45]
নবী ‘আলাইহিস সালাতু ওয়াস সালাম আরো বলেন:
لا تحلِفوا بآبائِكم ولا بأمَّهاتِكم ولا بالأندادِ ولا تَحلِفوا إلَّا باللهِ ولا تحلفوا باللهِ إلَّا وأنتُم صادقونَ
অর্থ: তোমরা তোমাদের পিতা-মাতার নামে কসম করো না এবং কোনো উপাস্যের নামেও কসম করো না। আর আল্লাহর নামে কসম করলে তোমরা সত্য কসম করবে।[46] এই অর্থে আরও অনেক হাদীস আছে।
আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নামে কসম করা ছোট শিরকের অন্তর্ভুক্ত। আর এটি বড় শিরক পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে যদি বিশ্বাস করা হয় যে (যে জিনিসের নামে কসম করা হচ্ছে) তার সম্মান আল্লাহর সম্মানের মতো; অথবা যদি বিশ্বাস করা হয় যে তা আল্লাহ ব্যতীত উপকার ও ক্ষতি করতে পারে; অথবা যদি বিশ্বাস করা হয় যে দোআ করা ও উদ্ধার চাওয়ার জন্য সে উপযুক্ত। আর এ ধরনের আরো কিছু বিষয় হলো: আল্লাহ যা চেয়েছেন ও অমুকে যা চেয়েছে, আল্লাহ ও অমুক না থাকলে এবং এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে ও অমুকের পক্ষ থেকে; নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাণী অনুযায়ী এগুলো সবই ছোট শিরকের অন্তর্ভুক্ত। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
لا تقولوا ما شاء اللهُ وشاء فلانٌ، ولكن قولوا ما شاء اللهُ ثم شاء فلانٌ
অর্থ: তোমরা আল্লাহ যা চেয়েছেন ও অমুক যা চেয়েছে এটি বলো না। বরং বলো আল্লাহ যা চেয়েছেন অতঃপর অমুক যা চেয়েছে।[47]
আর এই হাদীস দিয়ে জানা যায় যে, ‘যদি আল্লাহ না হতেন অতঃপর অমুক না হতো’ অথবা ‘এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে অতঃপর অমুকের পক্ষ থেকে’ এসব বাক্য বলতে কোনো সমস্যা নেই যদি সেই ব্যাপারটি ঘটার ব্যাপারে তাদের হাত থাকে।
নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, একজন লোক তাকে বলেছেন: আল্লাহ যা চেয়েছেন ও আপনি যা চেয়েছেন। তখন নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে বলেছেন: তুমি কি আমাকে আল্লাহর শরীক বানালে? বরং বলো: শুধু আল্লাহ যা চেয়েছেন।[48] এই হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে, সে যদি শুধু আল্লাহ যা চেয়েছেন বলে তবে এটিই সবচেয়ে উত্তম। আর যদি সে সকল হাদীস ও দলিলের সমন্বয়ে আল্লাহ যা চেয়েছেন অতঃপর অমুকে যা চেয়েছে বলে তবে এতেও সমস্যা নেই। আল্লাহই তাওফীক্বদাতা।
মৃত ব্যক্তির কাছে দোআ করা ও উদ্ধার চাওয়া [49]
প্রশ্ন: ঐসব বিষয়ের হুকুম কি যা কিছু অজ্ঞ লোকেরা কবরের পাশে করে যেমন মৃত ব্যক্তির কাছে দোআ করা, তার কাছে আশ্রয়, আরোগ্য অথবা শত্রুদের বিরুদ্ধে সাহায্য চাওয়ার মতো কাজ ? কারণ এই বিষয়টি অনেক অঞ্চলে দেখা যায়।
উত্তর: এই কাজটি বড় শিরক। আর এটি পূর্ববর্তী যুগের কাফেরদের শিরক যা কুরাইশ ও অন্যান্য কাফেররা করতো। তারা লাত, উজ্জা, মানাত ও অন্যান্য অনেক মূর্তির ইবাদাত করতো; তারা তাদের কাছে বিপদে উদ্ধার চাইতো ও শত্রুদের বিরুদ্ধে সাহায্য চাইতো। যেমন আবূ সুফিয়ান রাদিআল্লাহু আনহু (ইসলাম গ্রহণের পূর্বে) উহুদের দিন বলেছেন:
لنا العزى ولا عزى لكم
অর্থ: আমাদের উজ্জা আছে তোমাদের কোনো উজ্জা নেই। তখন নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবীদেরকে বললেন:
قُولوا: اللَّهُ مَوْلَانَا، ولَا مَوْلَى لَكُمْ
অর্থ: আপনারা তাকে বলুন, আল্লাহ আমাদের মাওলা (অভিভাবক), তোমাদের কোনো মাওলা নেই।” তখন আবূ সুফিয়ান বলেছিলেন (তখন তিনি কাফের ছিলেন), হুবাল (মূর্তি) সুউচ্চ হও। তিনি বুঝাতে চেয়েছেন, হে হুবাল, সুউচ্চ হও। হুবাল হলো সেই মূর্তি যার ইবাদাত কুরাইশরা মক্কায় করতো। তখন নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমরা তার জবাব দাও। সাহাবীরা বললেন, আমরা কি বলবো হে আল্লাহর রাসূল? তিনি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন:
قُولوا: اللَّهُ أَعْلَى وأَجَلُّ
অর্থ: তোমরা বলো: আল্লাহ অধিক সুউচ্চ ও অধিক মহান।[50]
উদ্দেশ্য হলো: মৃত ব্যক্তি, মূর্তি, পাথর, গাছ ও অন্যান্য সৃষ্টির কাছে দোআ করা, তাদের কাছে উদ্ধার চাওয়া, তাদের কাছে সাহায্য চাওয়া, এদের জন্য জবেহ করা, নজর-মানত করা ও এসবকে ঘিরে তাওয়াফ করা এগুলো সবই বড় শিরক। কারণ এগুলো সবই আল্লাহ ব্যতীত অন্যকে ইবাদাত করার মধ্যে পড়ে এবং এগুলো সবই পূর্ববর্তী ও পরবর্তী যুগের মুশরিকদের কাজ। অতএব, এসব থেকে সাবধান থাকা ও আল্লাহর কাছে তাওবাহ করা ওয়াজিব। আলেম ও দা‘ঈদের (যারা ইসলামের দাওয়াত দেন) জন্য ওয়াজিব হলো যারা এসব কাজ করে তাদেরকে উপদেশ দেয়া, শেখানো, সঠিক পথ দেখিয়ে দেয়া ও তাদের কাছে স্পষ্ট করা যে, এটি প্রাচীন যুগের মুশরিকদের শিরক যাদের ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন:
وَيَعْبُدُونَ مِن دُونِ اللَّهِ مَا لَا يَضُرُّهُمْ وَلَا يَنفَعُهُمْ وَيَقُولُونَ هَٰؤُلَاءِ شُفَعَاؤُنَا عِندَ اللَّهِ
অর্থ: আর তারা আল্লাহকে ছাড়া এমন কিছুর ইবাদাত করে যা তাদের কোনো ক্ষতি করে না ও উপকারও করে না এবং তারা বলে, এরা আল্লাহর কাছে আমাদের শাফাআতকারী।[51]
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:
إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَن يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَاءُ
অর্থ: নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না। এ বাদে যা আছে তা যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।[52]
আল্লাহ তা‘আলা এব্যাপারে আরো বলেন:
وَلَوْ أَشْرَكُوا لَحَبِطَ عَنْهُم مَّا كَانُوا يَعْمَلُونَ
অর্থ: তারা যদি শিরক করতো তাহলে তারা যা করেছে তা বরবাদ হয়ে যেত।[53]
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:
إِنَّهُ مَن يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَاهُ النَّارُ ۖ وَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ أَنصَارٍ
অর্থ: নিশ্চয়ই যে আল্লাহর সাথে শিরক করে আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন; তার আবাস হলো জাহান্নাম; আর জালেমদের জন্য কোনো সাহায্যকারী নেই।[54]
এ ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নবী মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সম্বোধন করে বলেছেন:
وَلَقَدْ أُوحِيَ إِلَيْكَ وَإِلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكَ لَئِنْ أَشْرَكْتَ لَيَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ
অর্থ: আপনার ও আপনার পূর্ববর্তীদের কাছে অবশ্যই ওহী করা হয়েছে যে, আপনি যদি শিরক করেন তবে অবশ্যই আপনার সকল কর্ম বিনষ্ট হয়ে যাবে এবং নিশ্চয়ই আপনি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবেন।[55]
আর নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ ব্যাপারে বলেন:
অর্থ: কেউ যদি কসম করতে চায় সে যেন আল্লাহর নামে কসম করে অথবা চুপ থাকে।[44]
مَن مَاتَ وهْوَ يَدْعُو مِن دُونِ اللَّهِ نِدًّا دَخَلَ النَّارَ
অর্থ: যে আল্লাহর সাথে শিরক করে মারা যাবে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।[56]
ইমাম বুখারী হাদীসটি তার সহীহ হাদীসগ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেন:
حَقَّ اللَّهِ علَى العِبادِ أنْ يَعْبُدُوهُ ولا يُشْرِكُوا به شيئًا
অর্থ: বান্দাদের উপর আল্লাহর হক (অধিকার) হলো যে তারা তাঁরই ইবাদাত করবে ও তাঁর সাথে কারো শরীক করবে না।[57]
বুখারী ও মুসলিমের ঐক্যমতে হাদীসটি সহীহ। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেন:
مَن لَقِيَ اللَّهَ لا يُشْرِكُ به شيئًا دَخَلَ الجَنَّةَ، ومَن لَقِيَهُ يُشْرِكُ به دَخَلَ النَّارَ.
অর্থ: যে আল্লাহর সাথে শরীক না করে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করবে (অর্থাৎ মারা যাবে) সে জান্নাতে প্রবেশ করবে; আর যে তাঁর সাথে শরীক করে মারা যাবে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।[58]
ইমাম মুসলিম হাদীসটি তার সহীহ হাদীসগ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। এই অর্থে অনেক আয়াত ও হাদীস আছে।
আল্লাহর কাছে দোআ করি তিনি যেন মুসলিমদেরকে তাঁর দীনের জ্ঞান দান করেন। তিনি যেন তাদেরকে সেই সকল কাজ থেকে রক্ষা করেন যা তাঁকে রাগান্বিত করে। তিনি যেন তাদেরকে প্রত্যেক অকল্যাণ থেকে খালেস নিয়তে তাওবাহ করার জন্য অনুগ্রহ করেন। তিনি যেন সকল অঞ্চলের মুসলিম আলেমদেরকে জ্ঞান প্রচার-প্রসার এবং অজ্ঞদেরকে তাওহীদ ও তাঁর আনুগত্যের পথ দেখানোর তাওফীক্ব দান করেন যে জন্য তাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছে। তিনি যেন মুসলিম শাসকদেরকে দীনের জ্ঞান দান করেন, শরীয়ত অনুযায়ী বিচার-ফয়সালা করা ও মানুষকে শরীয়ত অনুসরণ করতে উৎসাহিত করার তাওফীক্ব দান করেন। নিশ্চয়ই তিনি মহান দাতা। আল্লাহ যেন আমাদের নবী মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, তাঁর পরিবারবর্গ ও তাঁর সাহাবীদের উপরে সালাত ও সালাম বর্ষণ করেন।
কবরের কাছে অবস্থান করা [59]
প্রশ্ন: আমাদের এলাকায় একজন সৎ লোক ছিলেন যিনি মারা গিয়েছেন। তার কবরের উপর একটি স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে। প্রত্যেক বছর আমাদের এখানে অনুষ্ঠান পালন করা হয়। আমরা পুরুষ-মহিলা সবাই ঐ কবরের কাছে যাই। তারা সেখানে তিন দিন অবস্থান করে তাহলীল (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ) পড়ে ও জিকির করে এবং বিভিন্ন পরিচিত গুণ বর্ণনা করতে থাকে। তাই (এ ব্যাপারে আপনাদের কাছে) দিকনির্দেশনা চাই।
উত্তর: এ কাজ জায়েয নয়। এটি মানুষের আবিষ্কৃত বিদআতের অন্তর্ভুক্ত। তাই কারো কবরের উপরে অবস্থান করা জায়েয নয় তাতে মাকাম, গম্বুজ ও মসজিদ বা যে নামেই নামকরণ করা হোক। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সাহাবীদের যুগে বাকী কবরস্থানের কবরগুলো খোলামেলা ছিল; কবরগুলোর উপরে কোনো স্থাপনা ছিল না। আর নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কবরের উপরে স্থাপনা করতে ও কবর বাঁধাই করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন:
لَعَنَ اللَّهُ اليَهُودَ والنَّصَارَى، اتَّخَذُوا قُبُورَ أنْبِيَائِهِمْ مَسَاجِدَ.
অর্থ: ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের উপরে লানত[60] বর্ষিত হোক কারণ তারা তাদের নবীদের কবরসমূহকে মসজিদ হিসেবে গ্রহণ করেছে।[61]
হাদীসটি বুখারী ও মুসলিমের ঐক্যমতে সহীহ। জাবির বিন ‘আব্দুল্লাহ আল-আনসারী (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু) বলেছেন: নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কবর বাঁধাই করতে, কবরের উপরে বসতে ও কবরের উপরে কোনো কিছু নির্মাণ করতে নিষেধ করেছেন।[62] ইমাম মুসলিম তার সহীহ হাদীস গ্রন্থে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। কবরের উপরে কোনোকিছু নির্মাণ করা, কবর বাঁধাই করা, কবর সাজানো অথবা এর উপরে পর্দা দেয়া এগুলো সবই ঘৃণ্য কাজ ও শিরকের মাধ্যম; তাই এর উপরে গম্বুজ বানানো, পর্দা দেওয়া ও মসজিদ নির্মাণ করা জায়েয নয়। আর ঐভাবে কবর যিয়ারত করা যেমনটি প্রশ্নকারী উল্লেখ করেছেন যেমন কবরের পাশে বসা, জিকির করা, খাবার খাওয়া, কবর মাসাহ করা, কবরের পাশে দোআ করা ও কবরের পাশে সালাত আদায় করা এগুলো সবই নিকৃষ্ট কাজ ও বিদআত, এগুলো জায়েয নয় । কবর যিয়ারত করা শুধু (আখিরাত ও মৃত্যুর) স্মরণ এবং মৃতদের জন্য দোআ করার জন্য জায়েয (জায়েয বিষয়গুলো করা হয়ে গেলে কবরের কাছ থেকে) প্রস্থান করতে হবে। (সংক্ষেপিত)
কবরের চারদিকে তাওয়াফ করা ও কবরস্থ ব্যক্তির কাছে উদ্ধার চাওয়া [64]
প্রশ্ন: দুইজন লোকের মধ্যে এমন লোকের ব্যাপারে মতানৈক্য সৃষ্টি হয়েছে যে কবরের চারপাশে তাওয়াফ করে এবং কবরের (মৃত ব্যক্তির) কাছে উদ্ধার চায়। তাদের মধ্যে একজন বলছে এ কাজটি শিরক এতে কোন ইখতিলাফ নেই কিন্তু এই লোক তাওহীদের ব্যাপারে অজ্ঞতার কারণে ওযর (ছাড় বা ক্ষমা) পাবে। আর অন্যজন বলছে, যে লোকটি আল্লাহ ব্যতীত অন্যের কাছে উদ্ধার চায় সে কাফের হয়ে যাবে আর তাওহীদের ব্যাপারে অজ্ঞতার কারণে সে কোনো ওযর পাবে না। কিন্তু শাখাপ্রশাখাগত ও ফিক্বহী মাসআলার বিষয়ে ওযর পেতে পারে। প্রশ্ন হলো: এগুলোর মধ্যে কোন মতটি সঠিক আর কোন মতটি ভুল?
উত্তর: তার মত সঠিক যে বলেছে যে, এ ব্যাপারে কোনো ওযর নেই। কারণ এগুলো অনেক বড় বিষয় ও ইসলামের মূল। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সালাত, সাওম (রোজা), যাকাত ও অন্যান্য বিষয়গুলোর আগে সর্বপ্রথম এর প্রতিই আহ্বান করেছেন। তাই এমন লোক যে মুসলিমদের মাঝে বসবাস করে, কুরআন ও হাদীস শোনে সে দীনের (ইসলামের) মূল বিষয়ের ক্ষেত্রে অজ্ঞতার কারণে কোনো ওযর পাবে না। কবরস্থ ব্যক্তির কাছে উদ্ধার চাওয়া, তাদের জন্য নজর-মানত করা, তাদের কাছে দোআ করা, তাদের কাছে শাফাআত ও সাহায্য চাওয়া এগুলো সবই আল্লাহর সাথে (বড়) শিরক করার অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা তাঁর মহান কিতাবে বলেন:
وَمَن يَدْعُ مَعَ اللَّهِ إِلَٰهًا آخَرَ لَا بُرْهَانَ لَهُ بِهِ فَإِنَّمَا حِسَابُهُ عِندَ رَبِّهِ ۚ إِنَّهُ لَا يُفْلِحُ الْكَافِرُونَ
অর্থ: আর যে আল্লাহর সাথে অন্য কোনো ইলাহ্কে ডাকে যে ব্যাপারে তার কাছে কোনো প্রমাণ নেই; তার হিসাব তার রবের নিকটই আছে; নিশ্চয়ই কাফেররা সফলকাম হবে না।[65]
আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে এই কারণে কাফের বলেছেন। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:
ذَٰلِكُمُ اللَّهُ رَبُّكُمْ لَهُ الْمُلْكُ ۚ وَالَّذِينَ تَدْعُونَ مِن دُونِهِ مَا يَمْلِكُونَ مِن قِطْمِيرٍ * إِن تَدْعُوهُمْ لَا يَسْمَعُوا دُعَاءَكُمْ وَلَوْ سَمِعُوا مَا اسْتَجَابُوا لَكُمْ ۖ وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يَكْفُرُونَ بِشِرْكِكُمْ ۚ وَلَا يُنَبِّئُكَ مِثْلُ خَبِيرٍ
অর্থ: তিনিই আল্লাহ, তোমাদের রব। রাজত্ব তাঁরই। আর আল্লাহকে ছাড়া তোমরা যাদেরকে ডাকো তারা খেজুরের বীচির আবরণেরও মালিক নয়। * তোমরা তাদেরকে ডাকলে তারা তোমাদের ডাক শুনবে না। আর যদিও শোনে তবে তোমাদের ডাকে সাড়া দিবে না। আর কিয়ামতের দিন তারা তোমাদের শরীক করাকে অস্বীকার করবে। আর সর্বজ্ঞ আল্লাহর ন্যায় কেউই আপনাকে অবহিত করবে না।[66]
আল্লাহ তা‘আলা তাদের (অর্থাৎ আল্লাহ ব্যতীত অন্যের) কাছে তাদের দোআকে শিরক বলে অভিহিত করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:
فَلَا تَدْعُوا مَعَ اللَّهِ أَحَدًا
অর্থ: সুতরাং আল্লাহর সাথে তোমরা অন্য কাউকে ডেকো না।[67]
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:
وَلَا تَدْعُ مِن دُونِ اللَّهِ مَا لَا يَنفَعُكَ وَلَا يَضُرُّكَ ۖ فَإِن فَعَلْتَ فَإِنَّكَ إِذًا مِّنَ الظَّالِمِينَ
অর্থ: আর আল্লাহকে ছাড়া এমন কাউকে ডাকবে না যা তোমার উপকার করে না এবং ক্ষতিও করে না; যদি তুমি তা করো তবে নিশ্চয়ই তুমি জালেমদের অন্তর্ভুক্ত হবে।[68]
তাই মুশরিকরা হলো জালেম । যখন সাধারণভাবে জুলুম উল্লেখ করা হয় তখন সেটা দ্বারা শিরককে বুঝানো হয়। যেমনটি আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيم
অর্থ: নিশ্চয়ই শিরক বড় জুলুম।[69]
কবরের চারপাশে তাওয়াফ করার বিষয়টিও এমন। যদি সে কবরের চারপাশে তাওয়াফ করার মাধ্যমে কবরবাসীর ঘনিষ্ঠ হতে চায় তবে এটি কবরবাসীকে ডাকা ও তার কাছে উদ্ধার চাওয়ার মতোই বড় শিরক হবে। আর যদি সে এই মনে করে কবরের তাওয়াফ করে যে কবরের চারপাশে তাওয়াফ করলে আল্লাহর নৈকট্য পাওয়া যায়; তার উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর নৈকট্য পাওয়া। যেমনটি মানুষ কাবার চারপাশে আল্লাহর নৈকট্য পাওয়ার জন্য তাওয়াফ করে তাদের উদ্দেশ্য কোনো মৃত লোক নয়; তবে এটি হবে বিদআত এবং শিরকের বিপজ্জনক একটি মাধ্যম যা হারাম। যারা কবরের চারপাশে তাওয়াফ করে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা কবরবাসীর নৈকট্য পেতে এবং তাদের কাছ থেকে সাওয়াব ও শাফাআত পাওয়ার উদ্দেশ্যে এগুলো করে। আর এটি কবরবাসীর কাছে দোআ করার মতোই বড় শিরক। আল্লাহ রক্ষা করুন।
মৃত ব্যক্তি থেকে বরকত নেওয়া[70]
প্রশ্ন: আমাদের এলাকায় এক লোক মারা গিয়েছে। আর তার মৃত্যুর সংবাদ আমাদের কাছে দিনের বেলায় পৌঁছেছে। আমরা এলাকার বৃদ্ধা মহিলাদেরকে দেখেছি তার বাসায় যেতে। মৃত লোকটি কাপড়ে ঢাকা ছিল আর মহিলারা তার চারপাশে ছিল। আমরা তাদেরকে জিজ্ঞেস করেছি: আপনারা কেন তার কাছে যাচ্ছেন? তারা বললো: আমরা তার থেকে বরকত নিচ্ছি। তাদের এই কাজের বিধান কি? এটি কি সুন্নাত?
উত্তর: এই ধরনের কাজ জায়েয নয়। বরং এটি একটি নিকৃষ্ট কাজ। কারণ মৃত ব্যক্তি বা তার কবর থেকে বরকত গ্রহণ করা কারো জন্য জায়েয নয়। আল্লাহ ছাড়া তাদেরকে ডাকা, প্রয়োজন পূরণে তাদের কাছে চাওয়া, কোনো রোগীর জন্য আরোগ্য চাওয়া এবং এ ধরনের আরো যেসব জিনিস আছে তা করা জায়েয নয়। কারণ ইবাদাত হলো একমাত্র আল্লাহর হক। শুধু আল্লাহর কাছেই বরকত চাইতে হবে। আর আল্লাহ তা‘আলা তাবারুক (বরকতময়) বিশেষ্যের অধিকারী। যেমনটি আল্লাহ তা‘আলা সূরাহ ফুরক্বানে বলেন:
تَبَارَكَ الَّذِي نَزَّلَ الْفُرْقَانَ عَلَىٰ عَبْدِهِ لِيَكُونَ لِلْعَالَمِينَ نَذِيرًا
অর্থ: বরকতময় তিনি যিনি তাঁর বান্দার উপর ফুরক্বান (কুরআন) নাযিল করেছেন যেন সৃষ্টিজগতের জন্য সে সতর্ককারী হতে পারে।[71]
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন:
تَبَارَكَ الَّذِي بِيَدِهِ الْمُلْكُ
অর্থ: বরকতময় তিনি যাঁর হাতে সমস্ত রাজত্ব।[72]
এর অর্থ হলো: মহত্ত্ব ও বরকতের ক্ষেত্রে আল্লাহ তা‘আলা সর্বোচ্চ । আর বান্দা হলো মুবারাক (مبارَك যাকে বরকত দেয়া হয়েছে – ر তে জবর দিয়ে পড়তে হবে)। বান্দা তখন মুবারাক যখন আল্লাহ তাকে হিদায়াত দেন, সংশোধন করেন ও তার মাধ্যমে বান্দাদেরকে উপকৃত করেন। যেমনটি আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বান্দা ও রাসূল মারিয়াম পুত্র ঈসা ‘আলাইহিস সালামের ব্যাপারে বলেন:
قَالَ إِنِّي عَبْدُ اللَّهِ آتَانِيَ الْكِتَابَ وَجَعَلَنِي نَبِيًّا * وَجَعَلَنِي مُبَارَكًا أَيْنَ مَا كُنتُ وَأَوْصَانِي بِالصَّلَاةِ وَالزَّكَاةِ مَا دُمْتُ حَيًّا
অর্থ: তিনি বললেন, অবশ্যই আমি আল্লাহর বান্দা। তিনি আমাকে কিতাব দিয়েছেন এবং আমাকে একজন নবী বানিয়েছেন। আর আমি যেখানেই থাকি না কেন তিনি আমাকে মুবারক করেছেন[73] এবং যতদিন আমি জীবিত থাকি তিনি আমাকে সালাত ও যাকাত আদায়ের আদেশ করেছেন।[74] আল্লাহই তাওফীক্বদাতা।
মসজিদে নববীতে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কবর দিয়ে যারা দলিল দেয় তাদের জবাব[75]
প্রশ্ন: ঐ সকল কবরপূজারীদের জবাব কীভাবে দিব যারা মসজিদে নববীতে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কবর দিয়ে দলিল দেয়?
উত্তর: বিভিন্ন দিক থেকে এর জবাব আছে:
প্রথমত: মসজিদটি কবরের উপরে স্থাপন করা হয়নি। বরং মসজিদটি নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবদ্দশায় তৈরি করা হয়েছে।
দ্বিতীয়ত: নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মসজিদে দাফন করা হয়নি। তাই এটি বলার সুযোগ নেই যে এটি সৎ লোকদেরকে মসজিদে দাফন করার মতো। বরং তাকে তাঁর ঘরে দাফন করা হয়েছে। [বর্তমানেও নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কবর ‘আয়িশাহ (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহার) ঘরের ভিতরে] [76]
তৃতীয়ত: নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঘরগুলো আর এর মধ্যে ‘আয়িশাহ (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহার) ঘরও আছে; এই ঘরগুলো সাহাবীদের মত অনুযায়ী মসজিদের সীমানার মধ্যে ঢুকানো হয়নি। বরং তা করা হয়েছিল অধিকাংশ সাহাবীর মৃত্যুর পরে। এটি প্রায় ৯৪ হিজরীতে সংঘটিত হয়েছে । তাই এটি সাহাবীদের দ্বারা অনুমোদিত ছিল না। বরং তাদের মধ্যে অনেকে এর বিরোধিতা করেছেন। আর যারা বিরোধিতা করেছেন তাদের মধ্যে সাঈদ বিন আল-মুসায়্যিবও ছিলেন।
চতুর্থত: রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ঘরগুলো মসজিদে ঢুকানোর পরেও তাঁর কবর কিন্তু মসজিদের ভেতরে নেই কারণ রাসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কবর আলাদা কক্ষে। এর উপরে মসজিদ তৈরি করা হয়নি।
যে মসজিদে কবর আছে ঐ মসজিদে সালাত আদায় করার বিধান[77]
প্রশ্ন: প্রশ্নটি ঐ সকল মসজিদে সালাত আদায় করা সম্পর্কে যেখানে কবর রয়েছে?
উত্তর: যদি ঐ মসজিদটি কবরের উপরে স্থাপন হয়ে থাকে (অর্থাৎ কবর আগে থেকে ছিল এমন হয়ে থাকে) তবে ঐ মসজিদে সালাত আদায় করা হারাম এবং ঐ মসজিদটি ভাঙা ওয়াজিব। কারণ নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইহুদি ও খ্রিষ্টানদেরকে তাদের নবীদের কবরের উপরে মসজিদ নির্মাণ করার কারণে লানত করেছেন তাদের এই ধরনের কাজ থেকে (উম্মতকে) সতর্ক করার উদ্দেশ্যে।
আর যদি মসজিদটি কবরের আগে নির্মাণ করা হয়ে থাকে তাহলে কবরটি মসজিদ থেকে তুলে মুসলিমদেরকে যেখানে দাফন করা হয় সেখানে প্রতিস্থাপন করতে হবে। যদি এই অবস্থায় আমরা কবরটি খুড়ি তবে তাতে কোনো সমস্যা নেই কারণ তাকে এমন জায়গায় দাফন করা হয়েছে যেখানে দাফন করা বৈধ নয়। কারণ মসজিদে দাফন করা বৈধ নয়।
আর যদি মসজিদটি কবরের আগে নির্মিত হয়ে থাকে; কিন্ত কবরটি কিবলার দিকে না হয় আর মানুষ যদি কবরের দিকে মুখ করে সালাত আদায় না করে; তবে ঐ মসজিদে সালাত আদায় করা জায়েয (যদি কবর খোঁড়া সম্ভব না হয়)। কারণ নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কবরের দিকে সালাত আদায় করতে নিষেধ করেছেন। যদি কবর খুঁড়ে বের করা সম্ভব না হয় তবে মসজিদের দেয়াল ভাঙা অবশ্যই সম্ভব।
কবরে আলোকসজ্জা করা [78]
প্রশ্ন: ওলীদের কবরে আলোকসজ্জা করার বিধান কি?
উত্তর: মাকামাত দ্বারা প্রশ্নকারী ওলী ও নবীদের কবরকে বুঝাতে চাচ্ছেন। এই ধরনের আলোকসজ্জা করা হারাম। যারা এটি করে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে লানত করেছেন। তাই কবরে আলোকসজ্জা করা জায়েয নয়। আর যে এটি করে সে নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জবানে লানতপ্রাপ্ত। তাই কোনো লোক যদি কবরে আলোকসজ্জা করার নজর মানত করে তবে তার এই নজর মানত হারাম। আর নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
مَن نذَر أنْ يعصيَ اللهَ فلا يعصِه
অর্থ: যে আল্লাহর অবাধ্যতা করার নজর-মানত করেছে, সে যেন আল্লাহর অবাধ্যতা না করে।[79]
তাই এই নজর পূরণ করা তার জন্য জায়েয নয়।
কিন্তু নজর ভঙ্গের কারণে তার উপরে কি কসম ভঙ্গের কাফ্ফারা দেওয়া ওয়াজিব? এই ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে মতানৈক্য আছে। তবে নজর ভঙ্গের কারণে কাফ্ফারা দিলেই সাবধানতা অবলম্বন করা হলো। আল্লাহই ভালো জানেন।
কবরস্থানে আলোর ব্যবস্থা করার বিধান [80]
প্রশ্ন: কবরস্থানে আলোর ব্যবস্থা করার বিধান কি?
উত্তর: এমন কবরস্থান যেটা মানুষের প্রয়োজন নেই; যেমন কোনো কবরস্থান যদি বড় হয়ে থাকে আর সেখানে এমন কিছু জায়গা থাকে যেখানে কবর দেওয়া হয়ে গেছে তবে সেসব জায়গা আলোকিত করার কোনো প্রয়োজন নেই। কিন্তু যেসব জায়গায় কবর দেয়া হবে (অর্থাৎ কবর খননের কাজ হবে), তার আশেপাশেই আলো দিতে হবে। এটি জায়েয বলা যেতে পারে। কারণ এখানে শুধু রাতের বেলা (প্রয়োজনে) লাইট জ্বালানো হবে। এখানে এমন কিছু হচ্ছে না যার মাধ্যমে কবরকে সম্মান করা হয়, বরং প্রয়োজনের জন্যই তা করা হচ্ছে। তবে নিম্নোক্ত কারণগুলোর জন্য আমি (কবরস্থানে) বাতি জ্বালাতে পুরোপুরিভাবে নিষেধ করি।
প্রথম কারণ: এর কোনো প্রয়োজন নেই।
দ্বিতীয় কারণ: যদি লোকদের এটির প্রয়োজন হয় তবে তারা তাদের সাথে বাতি বহন করে নিয়ে যেতে পারে।
তৃতীয় কারণ: এই বিষয়টি যদি উন্মুক্ত করে দেয়া হয় তবে মানুষের অন্তরে মন্দ বিষয় (শিরক/বিদআত করার প্রবণতা) প্রসারিত হবে, পরে আর এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না।
তবে কবরস্থানে যদি একটি ঘর থাকে যেখানে ইট ও প্রাসঙ্গিক জিনিসপত্র রাখা হয় তবে সেই রুমে বাতি জ্বালাতে কোনো সমস্যা নেই যেহেতু তা কবর থেকে দূরে আর আলো ভিতরেই থাকছে এবং তা বাহির থেকে দেখা যায় না।
নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কবর যিয়ারতের উদ্দেশ্যে ভ্রমণ করার বিধান [81]
প্রশ্ন: নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কবর যিয়ারতের উদ্দেশ্যে সফর করার বিধান কি?
উত্তর: যেকোনো কবরই হোক, কবরের উদ্দেশ্যে সফর করা জায়েয নয়। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
لا تُشدُّ الرِّحالُ إلَّا إلى ثَلاثةِ مَساجدَ: مَسجِدِ الحرامِ ، ومَسجِدي هذا ، ومَسجِدِ الأَقصى
অর্থ: “তিনটি মসজিদ ব্যতীত অন্য কোনো মসজিদের উদ্দেশ্যে সফর করা যাবে না। (সেগুলো হলো): মাসজিদুল হারাম, আমার এই মসজিদ (আল-মাসজিদ আন-নববী) ও মাসজিদুল আক্বসা।” আর এখানে উদ্দেশ্য হলো পৃথিবীর কোনো স্থানেই ইবাদাতের উদ্দেশ্যে সফর করা যাবে না। কারণ যেসকল স্থানে ভ্রমণ করার বিষয়টি নির্দিষ্ট সেগুলো হলো শুধু ঐ তিনটি মসজিদ। এ মসজিদগুলো বাদে (ইবাদাতের উদ্দেশ্যে) অন্য কোনো জায়গায় সফর করা যাবে না। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কবরের উদ্দেশ্যে সফর করা যাবে না বরং তাঁর মসজিদের উদ্দেশ্যে সফর করতে হবে। যখন তারা মসজিদে পৌঁছাবে তখন পুরুষদের জন্য নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কবর যিয়ারত করা সুন্নাত কিন্তু মহিলাদের জন্য কবর যিয়ারত করা সুন্নাত নয়। আল্লাহই তাওফীক্বদাতা।
মৃত ব্যক্তিকে কবর থেকে তোলার বিধান [82]
প্রশ্ন: একটি লোক মারা গিয়েছে। কয়েকদিন পরে আরেকজন লোক ঐ মৃত ব্যক্তিকে স্বপ্নে দেখে এবং ঐ মৃত ব্যক্তি তাকে ঐ কবর থেকে (তার মৃতদেহ) বের করতে বলে এবং তার জন্য একটি মাজার বানাতে বলে। ঐ লোকটি সেটিই করে। এমন কাজের বিধান কি?
উত্তর: এটির বিধান হলো যে এটি একটি হারাম কাজ। স্বপ্নে শরীয়ত বিরোধী কোনো জিনিস দেখা গেলে তা বাতিল (মিথ্যা)। এটি হলো শয়তানের দৃষ্টান্ত বা উপমা ও শয়তানের ওহী। তাই এগুলো কখনো পালন করা জায়েয নয়। কারণ শরীয়তের বিধিবিধান স্বপ্নের কারণে পরিবর্তন হয় না। এখন তাদের জন্য ওয়াজিব হলো যে মাজারটি তারা বানিয়েছে তা ভেঙে ফেলা আর তার মৃতদেহটি মুসলিমদের কবরস্থানে ফিরিয়ে দেয়া।
আর তাদের ও তাদের মতো লোকদের জন্য আমার নসিহত হলো তারা স্বপ্নে যা দেখে তা যেন কুরআন ও সুন্নাহর সামনে রাখে । যা কুরআন সুন্নাহর বিরোধী সেগুলো ছুড়ে ফেলা হবে ও সেগুলোকে প্রত্যাখ্যান করতে হবে। সেগুলোর কোনো মূল্য নেই। মানুষের জন্য তার দীনের ব্যাপারে এ ধরনের মিথ্যা স্বপ্নের উপর নির্ভর করা জায়েয নয়। কারণ শয়তান আল্লাহর ইজ্জতের কসম দিয়েছে যে, সে আল্লাহর একনিষ্ঠ কিছু বান্দা ছাড়া আদমের সন্তানদের সকলকে পথভ্রষ্ট করবে। তাই যে আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ, তার দীনের অনুসরণকারী, সে শয়তানের কাছে পথভ্রষ্ট হওয়া থেকে ও তার অকল্যাণ থেকে নিরাপদ থাকবে। আর যে এর বিপরীত হবে শয়তান তাকে নিয়ে এবং তার ইবাদত, ‘আক্বীদাহ, চিন্তা ও কর্ম নিয়ে খেলা করবে। অতএব তার থেকে সাবধান হও। আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
إِنَّ الشَّيْطَانَ لَكُمْ عَدُوٌّ فَاتَّخِذُوهُ عَدُوًّا ۚ إِنَّمَا يَدْعُو حِزْبَهُ لِيَكُونُوا مِنْ أَصْحَابِ السَّعِيرِ
অর্থ: নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের শত্রু; অতএব তাকে শত্রু হিসেবেই গ্রহণ করো । সে তো তার দলবলকে ডাকে শুধু এজন্য যে, তারা যেন প্রজ্বলিত আগুনের অধিবাসী হয়।[83]
কবরের কাছে কুরআন তিলাওয়াত ও দোআ করার বিধান[84]
প্রশ্ন: কবরের কাছে কুরআন তিলাওয়াত করা, মৃত ব্যক্তির জন্য ও নিজের জন্য কবরের কাছে দোআ করার বিধান কি?
উত্তর: কবরের কাছে কুরআন তিলাওয়াত করা বিদআত। এই কাজ (কবরের কাছে কুরআন তিলাওয়াত করা) নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে ও তাঁর সাহাবীদের থেকে প্রমাণিত নয়। আর যখন নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর সাহাবীদের থেকে এটি প্রমাণিত নয় তখন আমাদের পক্ষ থেকে তা উদ্ভাবন করা ( বিদআত চালু করা) জায়েয নয়। কারণ নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন যা সহীহ সনদে বর্ণিত হয়েছে:
كلُّ محدثةٍ بدعةٌ، وكلُّ بدعةٍ ضلالةٌ، وكلُّ ضلالةٍ في النارِ
অর্থ: প্রত্যেক নবআবিষ্কৃত বিষয় হলো বিদআত, প্রত্যেক বিদআত পথভ্রষ্টতা ও প্রত্যেক পথভ্রষ্টতা জাহান্নামে (প্রবেশের কারণ)।[85]
মুসলিমদের উপরে ওয়াজিব হলো সালাফদের অর্থাৎ সাহাবা ও তাদের অনুসরণকারী তাবেঈদের ভালোভাবে অনুসরণ করা যেন তারা কল্যাণ ও হিদায়াতের উপরে থাকতে পারে। নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত হয়েছে যে তিনি বলেছেন:
خيرُ الكلامِ كلامُ اللهِ وخيرُ الهَدْيِ هديُ محمدٍ
অর্থ: সর্বোত্তম কালাম (কথা) হলো আল্লাহর কালাম এবং সর্বোত্তম হিদায়াত (দিকনির্দেশনা বা পদ্ধতি) হলো মুহাম্মাদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হিদায়াত।[86]
কিন্তু মৃত ব্যক্তির জন্য তার কবরের কাছে দোআ করতে কোনো সমস্যা নেই। সে কবরের পাশে দাঁড়াবে ও তার জন্য যা সহজ হয় এমন দোআ করবে। যেমন সে বলবে, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করুন, তাকে রহম করুন, তাকে জান্নাতে প্রবেশ করান, তার কবরকে প্রশস্ত করুন ইত্যাদি এই ধরনের অন্যান্য দোআ করবে।
আর যদি কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে কবরের কাছে নিজের জন্য দোআ করে তবে এটিও বিদআত। কারণ দোআ করার জন্য কোনো জায়গা নির্ধারণ করা যাবে না যদি না তা কুরআন-হাদীসে বর্ণিত হয়। আর যে ব্যাপারে সুন্নাতে কিছু বর্ণিত হয়নি (অর্থাৎ দোআ করার জন্য জায়গা নির্ধারণ করার ব্যাপারে) সেটি যে কোনো জায়গায় হোক না কেন এই নির্ধারণ হবে বিদআত।
- মাজমূ ফাতাওয়া ওয়া মাকালাত মুতানাওরি‘আহ্: ২৮৫-২৮৭
- সুনান ইবনি মাজাহ: ১৫৬৯
- সহীহ আল-বুখারী: ১২৭৮
- সূরাহ হাশর: ০৭
- কিছু বিদআত আছে যেগুলো ইসলাম থেকে খারিজ করে দেয় ও কিছু বিদআত আছে যেগুলো ইসলাম থেকে খারিজ করে দেয় না।
- মাজমূ ফাতাওয়া ওয়া মাকালাত মুতানাওরি‘আহ্: ১৩/২৮৮-২৯০
- সুনান ইবনি মাজাহ: ১৫৬৯
- সুনান ইবনি মাজাহ: ১৫৬৯
- সহীহ ইবনি হিব্বান: ৩১৭১
- সুনান আত-তিরমিযী: ১০৫৩
- মুসনাদ আহমাদ: ১৪/১৫৯
- মাজমূ ফাতাওয়া ওয়া মাকালাত মুতানাওরি‘আহ্: ১৩/২৯২-২৯৫
- সহীহ মুসলিম: ৯৫৭
- সহীহ মুসলিম: ২১৪৫
- সুনান ইবনি মাজাহ: ১৫৬৯
- সহীহ মুসলিম: ৫৩০
- সহীহ মুসলিম: ৯৬৯
- মুসনাদ আহমাদ: ১৫২৮৬
- সহীহ নাসায়ী: ৩৬৫৩
- মাজমূ ফাতাওয়া ওয়া মাকালাত মুতানাওরি‘আহ্: ৭/৪৫-৫২
- সূরাহ আল-‘ইমরান: ১৮৭
- সূরাহ বাকারাহ: ১৫৯-১৬০
- সহীহ মুসলিম: ১৮৯৩
- সহীহ মুসলিম: ৬৬৯৭
- সহীহ আল-বুখারী: ৭১
- সূরাহ বাকারাহ: ২১
- সূরাহ যারিয়াত: ৫৬
- সূরাহ ইসরা: ২৩
- সূরাহ বাইয়্যিনাহ: ০৫
- সূরাহ আনআম: ১৬২ ও ১৬৩
- সূরাহ কাওছার: ১ ও ২
- সহীহুত তারগীব: ১৪২০
- সূরাহ জিন: ১৮
- সূরাহ মু’মিনূন: ১১৭
- সূরাহ ফাতির: ১৩ ও ১৪
- সূরাহ নাহল: ৩৬
- সূরাহ আম্বিয়া: ২৫
- সূরাহ সাফ: ০৯
- সহীহ আল-বুখারী: ১৩৩০ ও সহীহ মুসলিম: ৫৩০
- সহীহ মুসলিম: ১০৭৫
- সূরাহ আন-নাহল: ৪৩
- সহীহ মুসলিম: ৬৭৪৬
- সুনান তিরমযী: ২৬৪৫
- সূরাহ আয-যারিয়াত: ৫৬
- সহীহ আল-বুখারী: ২৬৭৯
- আবূ দাঊদ: ৩২৫৩
- আবূ দাঊদ: ৩২৪৮
- সহীহু আবূ দাঊদ: ৪৯৮০
- মাদারিজুস সালিকীন ১/৬০২
- মাজমূ ফাতাওয়া ওয়া মাকালাত মুতানাওরি‘আহ্: ৭/৪৩২-৪৩৪
- সহীহ আল-বুখারী: ৪০৪৩
- সূরাহ ইঊনুস: ১৮
- সূরাহ নিসা: ৪৮
- সূরাহ আনআম: ৮৮
- সূরাহ মাইদাহ: ৭২
- সূরাহ যুমার: ৬৫
- সহীহ আল-বুখারী: ৪৪৯৭
- সহীহ আল-বুখারী: ৬২৬৭, সহীহ মুসলিম: ৩০
- সহীহ মুসলিম: ৯৩
- মাজমূ ফাতাওয়া ওয়া মাকালাত মুতানাওরি‘আহ্: (৫/২৮৫-২৮৮)
- লানত হলো আল্লাহর রহমত থেকে দূর করে দেওয়া।
- সহীহ মুসলিম: ৫৩০
- সহীহ মুসলিম: ৯৭০
- মাজমূ ফাতাওয়া ওয়া মাকালাত মুতানাওরি‘আহ্: ২৮/৩৩০-৩৩২
- সূরাহ মু’মিনূন: ১১৭
- সূরাহ ফাতির: ১৩ ও ১৪
- সূরাহ জিন: ১৮
- সূরাহ ইঊনুস: ১০৬
- সূরাহ লুকমান: ১৩
- মাজমূ ফাতাওয়া ওয়া মাকালাত মুতানাওরি‘আহ্: ১৩/ ১৯১-১৯২
- সূরাহ ফুরক্বান: ০১
- সূরাহ মূলক: ০১
- মুবারক করেছেন বা বরকত দিয়েছেন; কেউ কেউ বলেন এর অর্থ হলো: তাকে উপকারী বানিয়েছেন, কেউ বলেন: তাঁর কল্যাণ ছিল সৎ কাজের আদেশ ও খারাপ কাজ থেকে নিষেধ করা। আর কেউ বলেন: তাকে কল্যাণের শিক্ষক বানিয়েছেন। (তাফসীর ইবনি জারীর আত-তাবারী)
- সূরাহ মারইয়াম: ৩০ ও ৩১
- মাজমূ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইলিশ শাইখ মুহাম্মাদ ইবনি সালিহ আল-উসাইমীন: ২/২৩২-২৩৩
- নবীরা যেখানে মৃত্যুবরণ করেন সেখানেই তাদের দাফন করা হয়: (সুনান তিরমিযী ১০১৮)
- মাজমূ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইলিশ শাইখ মুহাম্মাদ ইবনি সালিহ আল-উসাইমীন: ২/২৩৪-২৩৫
- মাজমূ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইলিশ শাইখ মুহাম্মাদ ইবনি সালিহ আল-উসাইমীন: ২/২৩৬
- সহীহু ইবনি হিব্বান: ৪৩৮৭
- মাজমূ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইলিশ শাইখ মুহাম্মাদ ইবনি সালিহ আল-উসাইমীন: ২/২৩৬-২৩৭
- মাজমূ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইলিশ শাইখ মুহাম্মাদ ইবনি সালিহ আল-উসাইমীন: ২/২৩৭
- মাজমূ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইলিশ শাইখ মুহাম্মাদ ইবনি সালিহ আল-উসাইমীন: ২/২৩৯ – ২৪০
- সূরাহ ফাতির: ০৬
- মাজমূ ফাতাওয়া ওয়া রাসাইলিশ শাইখ মুহাম্মাদ ইবনি সালিহ আল-উসাইমীন: ২/৩০৯-৩১০
- সহীহুল জামি‘: ১৩৫৩
- এই অর্থে সহীহ মুসলিমের ৮৬৭ নম্বর হাদীস বর্ণিত আছে
Share this:
- Share on X (Opens in new window) X
- Share on Facebook (Opens in new window) Facebook
- Email a link to a friend (Opens in new window) Email
- Share on Pinterest (Opens in new window) Pinterest
- Share on Telegram (Opens in new window) Telegram
- Share on WhatsApp (Opens in new window) WhatsApp
- Print (Opens in new window) Print
- Share on LinkedIn (Opens in new window) LinkedIn
- Share on Tumblr (Opens in new window) Tumblr

















