ইমাম মুহাম্মাদ ইবনু সালিহ আল-উসাইমীন, ইমাম আব্দুল আযীয ইবনু বায, আল-আল্লামাহ হামূদ আত-তুওয়াইজিরী
ছবি তোলার নিষেধাজ্ঞা এবং এর ক্ষতি সম্পর্কিত আলোচনা।
ইমাম মুহাম্মাদ ইবনু সালিহ আল-উসাইমীন (رحمه الله)
ছবি তোলা মানুষের জন্য বড় ফিতনার কারণ যার ফলে নারীদের ছবি সমাজে ছড়িয়ে পড়ে, এবং এর পাশাপাশি তা ব্যক্তিকে মহান আল্লাহর অভিশাপ ও জাহান্নামের শাস্তির জন্য উপযুক্ত করে তুলে। কারণ নবী (صلى الله عليه وسلم) ছবি আঁকার ব্যাপারে সতর্ক করে বলেছেন:
أشد الناس عذابا يوما القيامة الذين يضاهئون بخلق الله
‘‘কেয়ামতের দিন মানুষের মাঝে তারাই সবচেয়ে কঠিন শাস্তি ভোগ করবে যারা আল্লাহর সৃষ্টির অনুরূপ ছবি তৈরি করে।”[১] তিনি আরও বলেছেন:
كل مصـور فى النـار يجعل له بكل صورها نفـس يعذب بـها فى جهنم. (رواه مسلم)
‘‘সকল চিত্রকার (যারা ছবি, প্রতিমা ইত্যাদি তৈরি করে) জাহান্নামে থাকবে। তার তৈরিকৃত প্রতিটি ছবির জন্য একটি প্রাণ সৃষ্টি করা হবে যার মাধ্যমে তাকে জাহান্নামে শাস্তি দেওয়া হবে।’’[২] চিত্রকারদেরকে রাসূল (صلى الله عليه وسلم) লানত করেছেন।[৩] এই হাদীসগুলো সবই রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) থেকে বিশুদ্ধভাবে প্রমাণিত। সুতরাং যে ব্যক্তি ছবি তোলে/আঁকে সে যেন এই হাদীসগুলোর আওতায় পড়া থেকে সাবধানতা অবলম্বন করে। কারণ, বাস্তবে, সে নিজেকে শাস্তির জন্য উপযুক্ত করে তুলছে। কোনো কোনো আলেম ফটোগ্রাফিক ছবিকে বৈধ বলে আখ্যায়িত করলেও, তাদের মধ্যে কেউ কেউ একে উল্লিখিত হুমকির আওতাভুক্ত বলে মনে করেন। তিনি (صلى الله عليه وسلم) আরও বলেছেন: “যা তোমাকে সন্দেহে পতিত করে তা ত্যাগ করো এবং যা সন্দেহ সৃষ্টি করে না তা গ্রহণ করো।”[৪] তিনি আরও বলেছেন: “আর যে ব্যক্তি সন্দেহযুক্ত বিষয়ে পতিত হয়েছে; সে হারামে পতিত হয়েছে। তার অবস্থা সেই রাখালের মতো যে নিষিদ্ধ চারণ ভূমির চারপাশে (তার গবাদিপশু) চরায়, আর কোনো পশু তাতে (নিষিদ্ধ চারণ ভূমিতে) প্রবেশ করল কিনা তা নিয়ে আশঙ্কা করতে থাকে।”[৫]
যদি ফটোগ্রাফিক ছবি তোলা জায়েজও হতো, তবে সেটি কেবল তখনই জায়েজ হতো যদি তাতে শরিয়ত বিরোধী কিছু না থাকতো।
আমি আল্লাহর নিকট অভিশপ্ত শয়তান থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ ۚ وَمَن يَتَّبِعْ خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ فَإِنَّهُ يَأْمُرُ بِالْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ ۚ وَلَوْلَا فَضْلُ اللَّهِ عَلَيْكُمْ وَرَحْمَتُهُ مَا زَكَىٰ مِنكُم مِّنْ أَحَدٍ أَبَدًا وَلَٰكِنَّ اللَّهَ يُزَكِّي مَن يَشَاءُ ۗ وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ
“হে মুমিনগণ! তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। আর যে শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করবে নিশ্চয়ই শয়তান তো শুধু আল-ফাহশা [অশ্লীলতা (অর্থাৎ অশ্লীল আচরণ ইত্যাদি।)] এবং আল-মুনকার [কুফর এবং শিরক (অর্থাৎ সকল মন্দ ও গর্হিত কাজ; ইসলামে নিষিদ্ধ এমন কথা বা কাজ করা ইত্যাদি।)]-এর নির্দেশ দেয়। যদি আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়া না থাকত তোমাদের কেউই কখনো পবিত্র হতে পারতে না, তবে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকে পবিত্র করেন (ইসলামের দিকে হেদায়েত দেন) আর আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।” [সূরাহ আন-নূর ২৪: ২১][৬]
তিনি (رحمه الله) আরও বলেছেন:
আমি আপনাদের কাছে আমার মতামত স্পষ্ট করছি যে, ছবি তোলা বৈধ নয়, সেগুলো ফটোগ্রাফিক ডিভাইস ব্যবহার করে তোলা হোক বা অঙ্কন করা হোক। আজকাল লোকেরা স্মৃতিচারণের উদ্দেশ্যে যেসব ছবি তোলে সেগুলোও এর অন্তর্ভুক্ত। তবে কেউ যদি বাধ্য হয় এবং ভিসা, নাগরিকত্ব বা পাসপোর্টের মতো স্পষ্ট প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়, সেক্ষেত্রে আমরা মানুষকে বাধা দিতে পারি না কেননা তাতে বৃহত্তর অকল্যাণ ও কষ্ট রয়েছে। এটিই আমার অবস্থান যার উপর আমি অনড়।
ইমাম আব্দুল আযীয ইবনু বায (رحمه الله)
প্রশ্ন: এই ডিভাইসগুলোর মাধ্যমে যে ফটোগ্রাফিক ছবি তোলা হয় সে বিষয়ে আপনার অভিমত কি?
উত্তর: [শাইখ ইবনু উসাইমীনের মতো একই হাদীসগুলো উল্লেখ করার পর] এ সম্পর্কিত সকল প্রমাণ নির্দেশ করে যে, ফটোগ্রাফি সর্বাবস্থায়ই হারাম, তা সূর্যের প্রতিফলন, ফটোগ্রাফিক কাগজ বা অনুরূপ কিছুর ভিত্তিতে তৈরি করা হোক না কেন। কেননা, যখন তিনি (صلى الله عليه وسلم) আয়িশাহ (رضي الله عنها)-এর ঘরের পর্দায় একটি ছবি দেখতে পেলেন, তিনি তা ছিঁড়ে ফেললেন। তাঁর মুখমণ্ডলে পরিবর্তন দেখা দিলো এবং তিনি (صلى الله عليه وسلم) বললেন: “নিশ্চয়ই, এই ছবির সঙ্গীদেরকে কেয়ামতের দিন শাস্তি দেওয়া হবে। তাদেরকে বলা হবে: ‘তোমরা যা সৃষ্টি করেছ তাতে প্রাণ সঞ্চার করো।”[৭] সেটি একটি পর্দা ছিল। অতঃপর আয়িশাহ (رضي الله عنها) তা ছিঁড়ে ফেললেন এবং নবী (صلى الله عليه وسلم)-এর জন্য দু’টি বালিশ বানালেন।[৮] আর যখন তিনি [صلى الله عليه وسلم] কাবার দেয়ালে একটি ছবি দেখতে পেলেন, তিনি ভেজা কাপড় দিয়ে সেটি মুছতে লাগলেন এবং ঘষতে থাকলেন যে পর্যন্ত না সেটি দেয়াল থেকে সম্পূর্ণরূপে দূরীভূত হয়ে গেল। তাঁর (صلى الله عليه وسلم) সুন্নাহ থেকে এটি সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত।[৯]
সম্প্রতি, ছবি তোলার (নিষেধাজ্ঞার) ব্যাপারে মানুষের উদাসীনতা বা দায়সারা মনোভাব এতটাই বেশি যে, তারা এখন পুরো পৃথিবী ছবি দিয়ে পূর্ণ করে ফেলেছে, অথচ এর আদৌ কোনো যৌক্তিকতা নেই। প্রকৃত অর্থে এটি তাদের কাণ্ডজ্ঞানের অভাব, এবং যারা এতে অংশগ্রহণ করে তাদের দীনি অবক্ষয়েরই প্রমাণ। আমরা শুধু আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাই।
প্রশ্ন: যার ছবি তোলা হয় এবং এমতাবস্থায় সে সন্তুষ্ট থাকে এবং যে সন্তুষ্ট থাকে না এ দু’য়ের মাঝে কি কোনো পার্থক্য আছে?
উত্তর: যারা সদিচ্ছায় এই কাজটি করে এবং এতে সন্তুষ্ট থাকে তারা সকলে এই বিধানের অন্তর্ভুক্ত। তবে ব্যতিক্রম হলো সেই ব্যক্তি যে কঠিন পরিস্থিতিতে নিপতিত হয় এবং এতে অংশ নিতে বাধ্য হয়। সুতরাং, সে এমন কেউ যাকে বাধ্য করা হয়েছে। যেমন জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স ইত্যাদির মতো বাধ্যতামূলক বিষয়াদি।[১০]
তিনি (رحمه الله) আরো বলেন:
আল্লাহ তাঁর সুমহান গ্রন্থে নির্দেশ দিয়েছেন যে, নারীরা যেন যথাযথভাবে হিজাব পরিধান করে এবং নিজেদের ঘরে অবস্থান করে, এবং তিনি তাদেরকে সতর্ক করেছেন যেন পরপুরুষদের সাথে কথা বলার সময় তারা নিজেদেরকে প্রদর্শন না করে বা কোমল কণ্ঠে কথা না বলে, এবং তিনি এসবকিছু এজন্য নির্ধারণ করেছেন যেন তারা ফিতনা থেকে রক্ষা পেতে পারে এবং সেসকল মাধ্যম থেকে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে যে (মাধ্যমগুলো) প্রলোভন ও অশ্লীলতার দিকে পরিচালনা করে। মহান আল্লাহ বলেছেন:
“হে নবীর স্ত্রীগণ! তোমরা অন্যান্য নারীদের মতো নও; যদি তোমরা আল্লাহকে ভয় করো, তবে পরপুরুষের সাথে কোমল কণ্ঠে কথা বলো না, নাহলে যার অন্তরে [নিফাক্ব, অথবা যিনা করা ইত্যাদির] ব্যাধি রয়েছে সে প্রলুব্ধ হবে। আর তোমরা ন্যায়সংগত কথা বলবে। এবং তোমরা নিজ নিজ গৃহে অবস্থান করবে; জাহেলী যুগের (নারীদের মতো) নিজেদেরকে প্রদর্শন করে বেড়াবে না। তোমরা সালাত কায়েম করবে ও যাকাত প্রদান করবে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করবে।” [সূরাহ আল-আহযাব ৩৩: ৩২-৩৩]
মুমিনদের মা ও সকল নারীদের মাঝে সর্বোত্তম ও সবচেয়ে পবিত্র হওয়া সত্ত্বেও মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় নবী (صلى الله عليه وسلم)-এর স্ত্রীদেরকে পরপুরুষের সাথে কথা বলার সময় কোমল কণ্ঠে কথা বলতে নিষেধ করেছেন। অর্থাৎ কোমল, নমনীয় বা বন্ধুসুলভ ভঙ্গিতে কথা বলা, যাতে যিনার ব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যক্তির মনে অনৈতিক চিন্তাচেতনা তৈরিতে বাধা সৃষ্টি হয় এবং তারা যেন এই ধারণায় উপনীত না হয় যে তারাও এই হারাম কাজে লিপ্ত হওয়ার ব্যাপারে সম্মত। তিনি তাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তারা যেন নিজ নিজ গৃহে অবস্থান করেন এবং জাহেলী যুগের নারীদের মতো নিজেদেরকে প্রদর্শন না করেন। এখানে তাদের সৌন্দর্য এবং আকর্ষণীয় অঙ্গসমূহ যেমন মাথা, মুখমণ্ডল, ঘাড়, বুক, বাহু, গোড়ালি ইত্যাদি প্রদর্শন করার কথা বলা হয়েছে। কেননা এসব হলো মহা বিপদ ও কঠিন পরীক্ষায় নিপতিত হওয়ার কারণ। এটি পুরুষদের অন্তরগুলোকে বিগলিত করে ও তাদেরকে ব্যভিচারের মাধ্যমগুলোর দিকে পরিচালনা করে এবং অবশেষে তাতে নিপতিত করে।
মহান আল্লাহ এখানে মুমিনদের মায়েদের আল্লাহভীরুতা, ইমানদারিতা ও সতীত্বের কথা জেনেও এসব অনৈতিক কাজ থেকে তাদেরকে সতর্ক করেছেন, সুতরাং অন্যান্যরা (নারীরা) এসব বিষয়ে আদিষ্ট হওয়ার ক্ষেত্রে বেশি উপযুক্ত। (অর্থাৎ) সাবধানতা অবলম্বন করা, বিধিনিষেধ মেনে চলা এবং ফিতনার মাধ্যমগুলোর ব্যাপারে সতর্ক থাকার বিষয়টি তাদের ক্ষেত্রে বেশি প্রযোজ্য। আল্লাহ যেন আমাদের এবং আপনাদেরকে বিভ্রান্তিকর ফিতনা থেকে রক্ষা করেন। এখানে উল্লিখিত হুকুমগুলো সাধারণ এবং প্রতিটি নারীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যেমনটি তাঁর, সুবহানাহু ওয়া তায়ালার বাণী থেকে প্রমাণিত: “আর তোমরা সালাত কায়েম করো এবং যাকাত প্রদান করো এবং তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করো।”[১১]
আল-আল্লামাহ হামূদ আত-তুওয়াইজিরী (رحمه الله) মুসলিমদের মাঝে ছবি তোলার প্রসার সম্পর্কিত আলোচনা শেষে বলেছেন:
“আজ মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকেরা যা করেছে, যেগুলো আমরা উল্লেখ করেছি এবং যেগুলো উল্লেখ করিনি, এসবই মহান আল্লাহর শত্রুদেরকে অনুকরণ করা এবং তাদের কার্যকলাপ অনুসরণ করাকে প্রমাণ করে — নবী (صلى الله عليه وسلم) থেকে এটি নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত যে, তিনি বলেছেন: “যে ব্যক্তি কোনো সম্প্রদায়ের সদৃশতা অবলম্বন করবে তবে সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হবে।”[১২] …রাসূলুল্লাহ (صلى الله عليه وسلم) আরও বলেছেন:
لَيْسَ مِنَّا مَنْ تَشَبَّهَ بِغَيْرِنَا، لَا تَشَبَّهُوْا بِالْيَهُوْدِ وَلَا بِالنَّصَارَى
[১] সহীহ: আল-বুখারী: ৫৯৫০ এবং মুসলিম: ২১০৯।
[২] সহীহ: মুসলিম: ২১১০।
[৩] সহীহ: আল-বুখারী: ৫৩৪৭।
[৪] সহীহ: আহমাদ ৩:১৫৩ এবং গায়াহ আল-মারাম: ১৭৯। শাইখ আলবানী সহীহ বলেছেন।
[৫] সহীহ: আল-বুখারী: ৫২ এবং মুসলিম: ১৫৯৯।
[৬] উৎস: আদ্ব-দ্বিয়াউল লামী’ ৮: ৫৭৪।
[7] সহীহ: মুসলিম: ৫৫৮৬।
[৮] সহীহ: মুসলিম: ২১১৭।
[৯] সহীহ: আত-তাহাওয়ী কর্তৃক শারহু মা‘আনিল আছার: ৬৯২১ এবং শাইখ আলবানী সহীহ বলেছেন। দেখুন সহীহ আল-জামি’: ৪২৯২।
[১০] উৎস: দুরূস লিশ শাইখ আব্দিল আযীয ইবনি বায ১৩: ৪৩।
[১১] উৎস: আত-তাবাররুজ: ৬
[১২] সহীহ: আবূ দাঊদ: ৪০৩১ এবং শাইখ আলবানী সহীহ বলেছেন। দেখুন গায়াহ আল-মারাম: ১০৯।
[১৩] হাসান: আত-তিরমিযী: ২৬৯৬ এবং শাইখ আলবানী হাসান বলেছেন। দেখুন আস-সহীহাহ: ২১৯৪।
[১৪] উৎস: ই’লান আন-নাকীর: ৮
Share this:
- Share on X (Opens in new window) X
- Share on Facebook (Opens in new window) Facebook
- Email a link to a friend (Opens in new window) Email
- Share on Pinterest (Opens in new window) Pinterest
- Share on Telegram (Opens in new window) Telegram
- Share on WhatsApp (Opens in new window) WhatsApp
- Print (Opens in new window) Print
- Share on LinkedIn (Opens in new window) LinkedIn
- Share on Tumblr (Opens in new window) Tumblr
- Share on Pocket (Opens in new window) Pocket

















