হিজবুল্লাহ হলো ইরানের রাফিদ্বী শিয়া সমর্থিত একটি রাজনৈতিক শিয়াপন্থি গোষ্ঠী যার বিভিন্ন দেশে বিস্তৃত একটি নেটওয়ার্ক রয়েছে। রাজনৈতিক ও মতাদর্শিকভাবে শিয়া মতবাদকে প্রতিষ্ঠিত করা তাদের একমাত্র লক্ষ্য। সুন্নি মুসলিম দেশগুলোতে যুদ্ধবিগ্রহ, নৈরাজ্য ও বিপ্লব সৃষ্টি করার মাধ্যমে তাদের প্রতীক্ষিত মাহদীর আগমনের পথকে সুগম করা তাদের মূল উদ্দেশ্য। তারা গোপনে ইসলামের শত্রুদের সাথে মিত্রতা পোষণ করে এবং বাহ্যিকভাবে ইসলাম ও মুসলিমদের স্বার্থে কাজ করার দাবি করে।
১. ভূমিকা
হিজবুল্লাহ হলো ইরানের রাফিদ্বী শিয়া সমর্থিত একটি রাজনৈতিক শিয়াপন্থি গোষ্ঠী যার বিভিন্ন দেশে বিস্তৃত একটি নেটওয়ার্ক আছে। রাজনৈতিক ও মতাদর্শিকভাবে শিয়া মতবাদকে প্রতিষ্ঠিত করা তাদের একমাত্র লক্ষ্য। এই রাজনৈতিক দলটি আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দে লেবাননে প্রতিষ্ঠিত হয়, যদিও তাদের প্রাথমিক কার্যক্রম ১৯৮২ খ্রিষ্টাব্দের কাছাকাছি কোথাও শুরু হয়েছিল।
ইরান সমর্থিত লেবাননী শিয়াদের সুদূর প্রসারী চিন্তাভাবনার প্রেক্ষিতে এই দলটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। যদিও প্রাথমিকভাবে এই আন্দোলনের নাম ছিল “হারাকাহ আমাল আশ-শী’ইয়্যাহ” (শিয়া আশার আন্দোলন), কিন্তু পরবর্তীতে জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এর পরিধিকে বাড়ানো হয় এবং এর নাম পরিবর্তন করে “আমাল আল-ইসলামিয়্যাহ” (ইসলামের আশা) রাখা হয়, যা মূল সংগঠনেরই একটি শাখা। (ইসলামের) মুখপাত্র এবং রক্ষক হওয়ার ছদ্মবেশে, এটি লেবাননসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শিয়া মতবাদের প্রচার করে।
তবে, মূল সংগঠনটি (হারাকাহ আমাল আশ-শী’ইয়্যাহ) বিভিন্ন অপরাধ ও বর্বরতার সাথে জড়িত ছিল এবং নব্যসংগঠিত দলটিকে প্রায়ই সমালোচনার সম্মুখীন হতে হতো, যে কারণে কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে, তারা একটি নতুন দল গঠন করল যা বর্তমানে হিজবুল্লাহ নামে পরিচিত।
এমন একটি যুগ যখন মানুষ দীন বোঝে না, সত্য, সঠিক আক্বীদাহ সম্পর্কে জানে না এবং ইতিহাস অধ্যয়নের প্রতি কোনো গুরুত্ব দেয় না, এমন পরিস্থিতিতে হিজবুল্লাহর মতো দলগুলো মুসলিম জাতির বিরুদ্ধে মাথাচাড়া দিয়ে উঠে এবং ধ্বংসাত্মক ভূমিকা পালন করে। একারণে, এই ধ্বংসাত্মক দলটির ভয়াবহতা সম্পর্কে জানা আহলুস সুন্নাহর জন্য অত্যাবশ্যক, “..যেন অপরাধীদের পথ স্পষ্ট হয়ে যায়।” (৬:৫৫)
এই প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু সাইয়্যেদ হুসাইন আল-আফফানীর হিজবুল্লাহ আর-রাফিদ্বী, তারীখ আসওয়াদ ওয়া ইফতিরা‘আত (রাফিদ্বী হিজবুল্লাহ, অন্ধকার ও মিথ্যাচারের ইতিহাস, দার আল-আফফানী, কায়রো প্রথম সংস্করণ, ১৪২৮ হি.) থেকে সংগৃহীত।
২. হারাকাহ আমাল আশ-শী’ইয়্যাহ, এর প্রতিষ্ঠাতা এবং হিজবুল্লাহর ইতিহাস
মূল সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা ছিল মূসা আস-সাদর, একজন ইরানি নাগরিক, যে ১৯২৮ সালে জন্মগ্রহণ করে এবং ১৯৫৮ সালে লেবাননে আসে এবং তাকে লেবাননের নাগরিকত্ব দেওয়া হয়। সে আল-খোমেইনির ছাত্র ছিল এবং আল-খোমেইনির সাথে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও ছিল।
আল-খোমেইনির ছেলে আহমাদ মূসা আস-সাদরের ভাগ্নীকে বিয়ে করে এবং মূসা আস-সাদরের ভাতিজা মুর্তাজা আত্ব-ত্বাবত্বাবায়ী আল-খোমেইনির নাতনিকে বিয়ে করে। মূসা আস-সাদর উত্তর লেবানন এবং বৈরুতে হারাকাহ আমাল আশ-শী’ইয়্যাহ নামে একটি সশস্ত্র দল গঠন করে এবং ঐ দেশের রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র বাহিনীর সাথে তারা যৌথভাবে কাজ করে।
আস-সাদর, সিরিয়া থেকে লেবাননে আসা যে কোনো নুসাইরীর[১] প্রধান সহকারী হিসেবেও কাজ করত, আর যখন নুসাইরী সিরীয় সেনাবাহিনী লেবাননে প্রবেশ করল, তখন আস-সাদর লেবাননী জাতীয়তাবাদী থেকে নুসাইরী বাত্বিনী দখলদার হিসেবে তার পরিচয় পরিবর্তন করল এবং সে কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করল, যেমন:
ক) সে অফিসার ইব্রাহীম শাহীনকে আরব সেনাবাহিনী থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার নির্দেশ দিলো এবং সিরিয়ার (নুসাইরী বাত্বিনীদের) সাথে মিত্রতা স্থাপনের মাধ্যমে একটি লেবাননী সেনাবাহিনী গঠন করল, এবং দক্ষিণে, নেতা আহমাদ আল-মুআমিরীও বিচ্ছিন্ন হয়ে (সিরিয়া থেকে আগত) নুসাইরী বাত্বিনী সেনাবাহিনীতে যোগ দিলো এবং;
খ) সে (আস-সাদর) রোমান অর্থোডক্স এবং রোমান ক্যাথলিক বিশপ ছাড়াও অন্যান্য ব্যক্তিবর্গ এবং প্রতিনিধিদের সাথে সাক্ষাৎ করা শুরু করল।
সিরীয় নুসাইরীদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত একটি আঞ্চলিক সরকার গঠনে সহায়তা করাই এসবের মূল উদ্দেশ্য ছিল।
এসমস্ত কর্মকাণ্ড ইরানের শিয়া সম্প্রদায় এবং সিরীয় নুসাইরী বাত্বিনীদের (যারা নিজেরাই ইমামিয়্যাহ শিয়াদের একটি চরমপন্থি শাখা) পক্ষে মূসা আস-সাদরের প্রকৃত আনুগত্য এবং সাধারণ সুন্নি আরব জনগোষ্ঠীর বিপক্ষে তার বিরুদ্ধাচরণকে তুলে ধরে।
১৯৮৫ সালে, ‘হারাকাহ আমাল আশ-শী’ইয়্যাহ’-এর বাহিনী দক্ষিণ লেবাননে ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের ঘেরাও করে ফেলে (এবং তাদেরকে কিছু খ্রিষ্টান জঙ্গিরাও সাহায্য করে)। এটি সিরীয় নুসাইরী বাত্বিনী নেতা, আল-আসাদ দ্বারা সমর্থিত ছিল। পার্শ্ববর্তী ইহুদী রাষ্ট্র থেকে কোনো বড় ধরনের আগ্রাসনকে এড়াতে সে দক্ষিণে অবস্থানরত ফিলিস্তিনিদেরকে উৎখাত করতে চেয়েছিল এবং সেই অঞ্চলটিকে শিয়া অধ্যুষিত বানাতে চেয়েছিল।
এই যুদ্ধগুলো “war of the camps” নামে পরিচিতি লাভ করে এবং শিয়ারা ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের উপর ভয়ংকর নৃশংসতা চালায়। তারা শরণার্থী ক্যাম্পগুলোতে অবস্থানরত বয়োবৃদ্ধ, নারী ও শিশুদেরকে হত্যা করে, তারা বৈরুতের হাসপাতালগুলোতে কিছু ফিলিস্তিনিকে গলা কেটে হত্যা করে[২] এবং তাদের জঙ্গিরা অসংখ্য আহত লোকদেরকে ক্যাম্পে জড়ো করে তাদেরকে হত্যা করে এবং প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছে যে তারা হারাকাহ আমালের জঙ্গিদেরকে গাজা হাসপাতাল ও তার আশেপাশের এলাকা থেকে ৪৫ জনেরও বেশি আহত লোককে হত্যা করতে দেখেছে।
সাবরা অঞ্চলের শরণার্থী ক্যাম্প দখল করার পর ২/৬/১৯৮৫ তারিখে পশ্চিম বৈরুতের রাস্তায় এই জঙ্গিরা “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল-আরাব আ’দা আল্লাহ” (আরবরা আল্লাহর শত্রু) স্লোগান দিতে থাকে। হারাকাহ আমালের জঙ্গিরা সাবরা ক্যাম্পের আশেপাশের ২৫ জন ফিলিস্তিনি মেয়েকেও অপহরণ করেছে বলে কুয়েতী নিউজ (৪/৬/১৯৮৫) এবং আল-ওয়াত্বন (৩/৬/১৯৮৫) একটি প্রতিবেদন করে।
উল্লিখিত বিষয়গুলো প্রমাণ করে যে, এই অঞ্চলে ফিলিস্তিনি সুন্নি জনগোষ্ঠী নির্মূল করাই হারাকাহ আমাল আশ-শী‘ইয়্যাহ-এর প্রধান লক্ষ্য ছিল এবং ইহুদী ও শিয়াদের মাঝে কয়েক বছর আগে থেকেই এ বিষয়ে বোঝাপড়া ও তৎপরতা চলছিল।
হারাকাহ আল-আমালের এক নেতা হায়দার আদ-দাইখ বলেছে:[৩]
“আমরা ইসরায়েলের সম্মুখ দিয়ে অস্ত্র বহন করতাম, অথচ ইসরায়েল আমাদেরকে সাদরে গ্রহণ করত এবং আমাদেরকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে আসত, ইসরায়েল দক্ষিণ (লেবাননের) ফিলিস্তিনি ওয়াহহাবী সন্ত্রাসীদেরকে নির্মূল করতে আমাদের সাহায্য করতো।”
এবং সুবহী আত্ব-ত্বুফাইলী তার দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে (২৫শে সেপ্টেম্বর ২০০৩ / ২৯শে রজব ১৪২৪ হি.) আশ-শারক আল-আওসাত সংবাদপত্রকে বলেছে যে, যখন ইসরায়েলি সেনাবাহিনী লেবাননে প্রবেশ করল এবং শিয়াদের সহযোগিতায় (দক্ষিণে অবস্থিত) ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীকে ধ্বংস করে ফেলল, তখন দক্ষিণ লেবাননের শিয়ারা জায়োনিস্ট ইসরায়েলি সেনাদের দাঁড়িয়ে অভিনন্দন জানিয়েছিল এবং এ বিষয়টি হিজবুল্লাহ কর্তৃক প্রকাশিত সাজাল আন-নূর (পৃ. ২২৭) বইয়ে স্বয়ং হাসান নাসরুল্লাহ নিশ্চিত করেছে।
৩. লেবাননে হিজবুল্লাহর প্রতিষ্ঠাতাদের নাম ও তাদের লক্ষ্য
রাফিদ্বী রাষ্ট্র ইরান নিম্নোক্ত শিয়াদের সহযোগিতায় হিজবুল্লাহ নামক নতুন সংগঠন গড়ে তুলে: মুহাম্মাদ হুসাইন ফাদ্বলুল্লাহ (“লেবাননের খোমেইনি” হিসেবে পরিচিত), সুবহী আত্ব-ত্বুফাইলী, হাসান নাসরুল্লাহ (“আরবের খোমেইনি” হিসেবে পরিচিত), ইব্রাহীম আল-আমীন, আব্বাস মাওসাওয়ী, নাঈম ক্বাসিম, জুহাইর কাঞ্জ, মুহাম্মাদ ইয়াজবিক এবং রাগিব হারব।
হারাকাহ আমাল শী’ইয়্যাহ এবং হিজবুল্লাহ উভয়েই ইরান থেকে নির্দেশনা নেয় এবং মূলত এই অঞ্চলে ইরানের প্রতিনিধি (proxy) হিসেবে কাজ করে।
“আরবের খোমেইনি” হিসেবে পরিচিত হাসান আব্দুল কারীম নাসরুল্লাহ ১৯৬০ সালে জন্মগ্রহণ করে। দীন (অর্থাৎ ইমামিয়্যাহ শিয়াদের আক্বীদাহ) শেখার উদ্দেশ্যে সে ইরাকের আন-নাজাফ গমন করে। ১৯৮২ সালে তাকে হারাকাহ আমাল আশ-শী‘ইয়্যাহ-এর একজন কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় কিন্তু পরবর্তীতে সে পৃথক হয়ে হিজবুল্লায় যোগ দেয় এবং ১৯৮৫ সালে এই সংগঠনের অধীনেই বৈরুতে কর্মরত থাকে, এবং ১৯৯২ সালে দলের সাবেক নেতা আল-মাওসাওয়ী হত্যাকাণ্ডের পর এবং দলনেতা হওয়ার আগ পর্যন্ত চেষ্টা চালিয়ে যায়।
প্রকাশ্য এবং অপ্রকাশ্য লক্ষ্যসমূহ
লেবাননে হিজবুল্লাহর প্রকাশ্য লক্ষ্য হলো এমন একটি সংগঠন হিসেবে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করা যারা লেবাননে ইসরায়েলি দখলদারিত্বের বিরোধিতা করে এবং ফিলিস্তিনের পবিত্র ভূমি (বাইতুল মাক্বদিস) অবমুক্ত করতে চায়, কিন্তু এসবই হলো মুসলিমদের সাথে তাদের প্রতারণা, যেন তারা তাদেরকে অন্ধ বানিয়ে রাখতে পারে এবং তাদের (শিয়াদের) আসল লক্ষ্য থেকে তাদের (মুসলিমদের) দূরে সরিয়ে রাখতে পারে, এবং তারা যেন তাদের (শিয়াদের) প্রতি আকৃষ্ট হতে পারে। এবং এসবই তারা ইরানের সহযোগিতায় বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক চাহিদা পূরণের মাধ্যমে অর্জন করে।
তাদের প্রকৃত এবং বাস্তবিক গোপন লক্ষ্য হলো লেবাননে শিয়া মতবাদের প্রচার করা, শিয়াদের একটি স্থায়ী আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা এবং দেশের সমস্ত (রাজনৈতিক, সামাজিক, সামরিক, অর্থনৈতিক) শক্তির উৎসকে নিয়ন্ত্রণ করা। এবং এটি ইরান ও তার ধর্মীয়-রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের উদ্দেশ্যগুলোকে অগ্রসর করার জন্য এই অঞ্চলকে প্রস্তুত করার সামগ্রিক নীলনকশার অংশ।
৪. হিজবুল্লাহর আক্বীদাহ-বিশ্বাস
এই গোষ্ঠীটির আক্বীদাহ হলো ‘আল-তাশাইয়্যু’ (শিয়া মতবাদ) এবং আর-রাফদ্ব, অথবা তাদের ভাষ্য অনুযায়ী তারা হলো “জাফারাইট টুয়েলভার্স” (জাফারিয়্যাহ ইসনা আশারিয়্যাহ)। এখানে আমরা তাদের মতবাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করব, যেগুলো সরাসরি তাদের বইপুস্তক থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে:
- আল-কুলাইনীর লেখা উসূল আল-কাফী;
- হাশিম আল-বাহরানীর লেখা মাদীনাহ আল-মুআজিয;
- রজব আল-বুরসীর লেখা মাশারিক আনোয়ার আল-ইয়াক্বীন;
- মির্জা হুসাইন আন-নূরী আত্ব-ত্বাবারসীর লেখা ফাসল আল-খিতাব ফী ইসবাত তাহরীফ আল-কিতাব;
- মুহাম্মাদ রিদ্বা আল-মুজাফ্ফারের লেখা আক্বাইদ আল-ইমামিয়্যাহ;
- ইউসুফ আল-বাহরানীর লেখা আশ-শিহাব আস-সাক্বিব ফী বায়ান মা‘না আন-নাসিব;
- মুহাম্মাদ আশ-শীরাযীর লেখা মাওসুআহ আল-ফিক্বহ;
- জাওয়াদ আল-কাজউইনীর লেখা আল-আদিল্লাহ আল-জালিয়্যাহ ‘আলা জাওয়ায আত-তাক্বিয়্যাহ;
- আল-মাজলিসীর লেখা মিরআত আল-উক্বূল এবং বিহার আল-আনোয়ার; ইত্যাদি।
দ্রষ্টব্য: সুন্নাহর আলেমরা, রাফিদ্বীদের আক্বীদাহর মৌলিক বিষয়ের ভিত্তিতে তাদেরকে কাফের বলে ঘোষণা দিয়েছেন। শাইখ ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ) – তাদের আলেম সমাজ ও সর্বসাধারণের উপর কোনো প্রকার তারতম্য ছাড়াই তাকফীর করেছেন এবং এই মতের উপর তিনি অতীতের আলেমদের অনুসরণ করেছেন। অন্যান্য আলেম যেমন শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ এবং বর্তমান যুগে শাইখ আল-আলবানী তাদের আলেম সমাজের উপর তাকফীর করেছেন কিন্তু তাদের সর্বসাধারণের উপর তাকফীর করার পূর্বে তাদের উপর প্রমাণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে বলে মতামত দিয়েছেন।
তাদের আক্বীদাহর মৌলিক বিষয়াদি
০১ তাদের নেতাদের প্রতি অতিরঞ্জন: রাফিদ্বীরা আহলুল বাইত নিয়ে অতিরঞ্জন করে এবং তাদের বিশ্বাস অনুযায়ী তাঁরা (আহলুল বাইত) ভুলের ঊর্ধ্বে, তাঁরা অদৃশ্যের জ্ঞান রাখে এবং তাদের বারো ইমাম স্বেচ্ছায় যে কোনো জিনিসের জ্ঞান আয়ত্ত করতে পারে, তাদের মৃত্যু কখন হবে সে সম্পর্কেও তারা জানে এবং তারা নিজেদের ইচ্ছায় মৃত্যুবরণ করে। এক পর্যায়ে আল-মাজলিসীর মতো কিছু লোক এটাও দাবি করে যে, তাদের ইমামগণ মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ব্যতীত সকল নবী থেকে উত্তম। তারা আরও বিশ্বাস করে যে, তাদের ইমামরা মৃতদেরকে জীবিত করে আর তাদের কেউ কেউ এমন পর্যায়ে চলে গেছে যে তারা বিশ্বাস করে আলী “অন্তরের অভ্যন্তরীণ বিষয় সম্পর্কে জানেন” এবং তিনি হলেন (আল্লাহর) সকল সুন্দরতম নাম যেগুলো দিয়ে (আল্লাহকে) ডাকা হয় এবং অন্যান্য আরও অতিরঞ্জন আছে যেগুলো কুফরী।
০২ কুরআন সম্পর্কে: তারা বিশ্বাস করে যে, সাহাবীরা কুরআনকে বিকৃত করেছে এবং পূর্ণাঙ্গ কুরআন শুধু তাদের ইমামগণ সংকলন করেছে, এবং আলী ইবনু আবী তালিব (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) এবং তাঁর পরবর্তীতে তাদের ইমামগণেরা তা পূর্ণাঙ্গরূপে সংকলন করেছে যেভাবে তা নাযিল হয়েছিল, এবং তারা আরও বিশ্বাস করে যে সম্পূর্ণ কুরআন শুধু তাদের কাছেই আছে আর অন্য কারও কাছে নেই। এবং তাদের মধ্যে কেউ কেউ এমন পর্যায়ে চলে গেছে যে তারা বিশ্বাস করে, পূর্ণাঙ্গ কুরআনে সতেরো হাজার আয়াত রয়েছে এবং তাদের এই আক্বীদার পক্ষে তাদেরই নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্ব এবং আলেম নি‘মাতুল্লাহ আল-জাযায়িরীর প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি রয়েছে।
০৩ ভুলের ঊর্ধ্বে হওয়া ও ভক্তি সম্পর্কে: তারা বিশ্বাস করে তাদের বারো ইমাম ভুলের ঊর্ধ্বে এবং তারা তাদের প্রতি মাত্রাতিরিক্ত ভক্তি প্রদর্শন করে যে কারণে তাদের বিরুদ্ধবাদীদের উপর তাকফীর করাকে তারা অপরিহার্য মনে করে, এবং (তারা যাদেরকে তাকফীর করে) তাদের প্রধান তিনজন হলেন খলীফা আবূ বাকর, উমার এবং উসমান (رضي الله عنهم) এবং এই রাফিদ্বী গাধারা বিশ্বাস করে যে তারা সবাই আলী ইবনু আবী তালিব (رضي الله عنه) থেকে খিলাফত ছিনিয়ে নিয়েছে এরপর তারা কাফের এবং মুরতাদ্দ হয়ে গিয়েছে। এই কারণে, তারা বিশ্বাস করে যে কোনো সৎকাজ ক্ববূল হওয়ার ক্ষেত্রে আল-ওয়ালায়াহ (পরম কর্তৃত্বের উপর বিশ্বাস স্থাপন করা) একটি পূর্বশর্ত। আল-মাজলিসীর বিহার আল-আনোয়ার বইয়ে একটি অধ্যায় আছে, যার শিরোনাম হলো, “আল-ওয়ালায়াহ ব্যতীত কোনো আমলই ক্ববূল হয় না।” আল-মাজলিসীর এই বইটিকে রাফিদ্বীদের আটটি “বিশুদ্ধ” হাদীস গ্রন্থের মাঝে অন্যতম হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
০৪ নবীর স্ত্রীগণ ও তাঁর সাহাবীদের সম্পর্কে: কয়েকজন (সাহাবী) ব্যতীত সকল সাহাবীদেরকে তারা কাফের বলে ঘোষণা দেয় এবং তারা বিশ্বাস করে যে, তাদেরকে অভিশাপ দেওয়া আল্লাহর নৈকট্য লাভের অন্যতম একটি মাধ্যম। তারা নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর স্ত্রীদেরকে, বিশেষ করে আয়িশা (رضي الله عنها) এবং হাফসা (رضي الله عنها)-কে অভিশাপ দেয়। তারা আয়িশাকে একটি লজ্জাজনক কাজের জন্য অভিযুক্ত করে – এবং এই অপবাদের মাধ্যমে তারা ইহুদীদের সাদৃশ্য ধারণ করে, যারা ঈসা (عليه السلام)-এর মা মারইয়াম (عليها السلام)-কে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে – এবং তারা আয়িশা ও হাফসা উভয়কে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর হত্যাকারী হিসেবে অভিযুক্ত করে।
০৫ যারা ইসনা আশারিয়্যাহ শিয়াদের অন্তর্ভুক্ত নয় তাদের সম্পর্কে: রাফিদ্বীরা প্রত্যেক মুসলিম সম্প্রদায়ের উপর কোনো প্রকার তারতম্য ছাড়াই তাকফীর করে, যেভাবে আবদুল্লাহ আশ-শিবর (আর-রাফিদ্বী) তার হাক্কুল ইয়াক্বীন ফী মা‘রিফাতি উসূলিদ দীন বইয়ে ইমামিয়্যাহ শিয়াদের এ বিষয়ে ঐকমত্য উল্লেখ করে বলেছে: (২/১৮৯):
আশ-শাইখ, আল-মুফীদ বলেছেন: ইমামিয়্যাহরা সর্বসম্মতভাবে একমত যে, যে কেউই ইমামদের (তাদের বারোজন ইমামদের) ইমামত (নেতৃত্ব) প্রত্যাখ্যান করবে এবং আনুগত্যের বাধ্যবাধকতা থেকে মহান আল্লাহ তার উপর যা কিছু ফরয করেছেন তা প্রত্যাখ্যান করবে তাহলে সে পথভ্রষ্ট কাফের যে অনন্তকাল জাহান্নামে থাকার উপযুক্ত…
এবং সে অন্যত্র বলেছে:
ইমামিয়্যাহরা সর্বসম্মতভাবে একমত যে, বিদআতীরা (অর্থাৎ শিয়া ব্যতীত সবাই) কাফের, তাই ইমামের দায়িত্ব হলো তাদেরকে দাওয়াত প্রদান করা, তাদের উপর প্রমাণ প্রতিষ্ঠা করা আর সম্ভব হলে তাদেরকে তাওবাহ করতে বলা। সুতরাং, হয় তাদের বিদআত থেকে তাওবাহ করে তারা সত্যের দিকে ফিরে যাবে অন্যথায় ইমান আনার পর মুরতাদ্দ হয়ে যাওয়ার কারণে তাদেরকে হত্যা করা হবে। আর তাদের কেউ যদি এই (বিদআতের) উপর মৃত্যুবরণ করে তবে সে জাহান্নামীদের অন্তর্ভুক্ত হবে।
ইউসুফ আল-বাহরানী তার আশ-শিহাব আস-সাক্বিব (পৃ. ৮৫) গ্রন্থে বলেছে যে,
…সত্যের বিরোধিতাকারী (অর্থাৎ তারা যাকে সত্য মনে করে) কাফের এবং তার ক্ষেত্রে সেই একই হুকুম প্রযোজ্য হবে যা কাফেরদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।
এবং মুহাম্মাদ আশ-শীরাযীর মতো কিছু কিছু ইসনা আশারিয়্যাহ, তাদের নিজেদের ব্যতীত, শিয়াদের অন্যান্য ফির্কাগুলোকে কাফের বলে ঘোষণা দেয়।
০৬ উইলায়াত আল-ফাক্বীহ মতবাদ (নেতৃস্থানীয় আলেমের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব): এটি রাফিদ্বী শিয়াদের একটি বিদআত, যা আল-খোমেইনি শিয়াদের জন্য উদ্ভাবন করেছে, এবং এটি একটি ধর্মীয়-রাজনৈতিক বিদআত, যার সারাংশ হলো যে রাষ্ট্রকে নেতৃত্ব দেওয়ার সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি হলো নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূর্ণকারী একজন প্রবীণ আলেম, এবং সে হলো প্রতীক্ষিত মহান ইমাম (শিয়াদের মাহদী)-এর ভারপ্রাপ্ত নেতা যে তার (মাহদীর) পক্ষ থেকে উম্মাহর নেতৃত্ব দিবে, সুতরাং, এই উম্মাহ (যেহেতু) সেই প্রতীক্ষিত ইমামের পক্ষ থেকে তাকে পথ প্রদর্শনকারী ভারপ্রাপ্ত নেতা হিসেবে নির্বাচন করেছে, সুতরাং, এই ধর্মীয় নেতার কাছে প্রত্যাবর্তন করা ব্যতীত কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। আল-খোমেইনির অধীনেই হিজবুল্লাহ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যে রাফিদ্বীদের জন্য (উইলায়াত আল-ফাক্বীহ-এর) এই ভূমিকা পালন করেছে, যা প্রমাণ করে যে হিজবুল্লাহ ইরানের একটি শিয়া প্রতিনিধি (proxy) ব্যতীত আর কিছুই নয়, যারা এই অঞ্চলে ইরানি রাফিদ্বী বিপ্লবের লক্ষ্য-উদ্দেশ্যগুলোকে পূর্ণতা দিচ্ছে এবং বাস্তবায়ন করছে। উইলায়াত আল-ফাক্বীহ-এর এই ধারণাটি নব উদ্ভাবিত ধর্ম Rabbinical Judaism-এর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ!
দ্রষ্টব্য
উইলায়াত আল-ফাক্বীহ-এর এই মতবাদটি আল-খোমেইনির “আল-হুকূমাহ আল-ইসলামিয়্যাহ” বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে যা “আল-হাকিমিয়্যাহ”-এর আলোকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, এবং তা আল্লাহর জন্যই নির্দিষ্ট বলে সে দাবি করেছে এবং সে আরও বলেছে:
وفي هذه الصورة يكون الحكام الحقيقيون هم الفقهاء إذن يجب أن تكون الحاكمية رسميا للفقيه
“এবং এই ক্ষেত্রে, শাসকগণই হলেন প্রকৃত ফক্বীহ, তাই আল-হাকিমিয়্যাহ [আল্লাহর বিধান দিয়ে বিচারকার্য পরিচালনা করা এবং তা বাস্তবায়ন করা]-এর দায়িত্ব রাষ্ট্রীয়ভাবে ফক্বীহর উপর অর্পণ করা ওয়াজিব।”
এবং আল-খোমেইনি এবং আল-খামেইনি [দু’জনকে মিলিয়ে ফেলবেন না] তাদের বিপ্লবের অগ্রগতির জন্য আল-মাওদূদী[৪] (আল-খোমেইনির খুব ঘনিষ্ঠ সহচর) এবং সাইয়্যেদ কুত্ববের[৫] লেখা (আল-আদালাহ আল-ইজতিমা’ইয়্যাহ এবং আয-যিলাল) থেকেও দিকনির্দেশনা নিয়েছে (আল-খামেইনি কুত্ববের কিছু বই এবং আয-যিলালের কিছু অংশ ফারসি ভাষায় অনুবাদ ও প্রকাশ করে)।
রাফিদ্বীরা বিশ্বাস করে যে তাদের প্রতীক্ষিত মাহদীর আগমনের আগ পর্যন্ত প্রতিটি সরকারই তাগুতী, কাফিরাহ (অর্থাৎ তারা সীমালঙ্ঘনকারী, কাফের) যে কারণে খোমেইনির উইলায়াত আল-ফাক্বীহ-এর (নব উদ্ভাবিত) নীতি তার বিপ্লব এবং রাষ্ট্রকে বৈধতা দেয়।
সাইয়্যেদ কুত্ববের লেখা বইগুলোতে এমন সব বিষয়ের উল্লেখ রয়েছে যা সুস্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করে যে, উসমান ইবনু আফফান (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)-এর খিলাফতের পর থেকে শুধু আলী ইবনু আবী তালিব (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু)-এর খিলাফত ব্যতীত সে সমগ্র উম্মাহকে তাকফীর করে, এবং সে বিশ্বাস করে যে ঐ সময় থেকে আজ পর্যন্ত কোনো ইসলামী রাষ্ট্র বা মুসলিম সমাজের অস্তিত্ব পাওয়া যায় না এবং তার বিশ্বাস অনুযায়ী: ইসলামী শরীয়াহ যেই সামাজিক ন্যায়বিচারের কথা বলে, যদি তা (সমাজে) বাস্তবায়ন না করা হয়, সেক্ষেত্রে কোনো প্রকার তারতম্য ছাড়া, পুরো সমাজ কাফের এবং মুরতাদ্দ হয়ে যায়। এছাড়াও অন্যান্য আরো বিষয় [যেমন বানূ উমাইয়া, আবূ সুফিয়ান, হিন্দ এবং অন্যান্যদের তাকফীর ইত্যাদির] কারণে রাফিদ্বীরা সাইয়্যেদ কুত্ববকে ভালোবাসে।
এর প্রমাণ স্বরূপ রাফিদ্বী এবং খারিজীদের মাঝে সমন্বয় এবং তাদের মিত্রতার প্রতি লক্ষ্য করুন; (অর্থাৎ) কীভাবে তারা মুসলিম জাতির বিরুদ্ধে একটি বিপ্লবে রূপান্তরিত হয়েছে, এবং কীভাবে তারা ইসলাম, মুসলিম এবং মুসলিম দেশগুলোর বিরুদ্ধে (ইসলামের) শত্রুদের দ্বারা ব্যবহৃত হচ্ছে। এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই যে যখন দাজ্জাল আবির্ভূত হবে তখন তারা সবাই তার চারপাশে জড়ো হবে, যেমনটি খারিজীদের সাথে সম্পর্কিত হাদীসগুলোর মাঝে আমরা দেখতে পাই।[৬]
৫. ইরানি শিয়া প্রতিনিধিরা (proxies): বাহরাইনে হিজবুল্লাহ
উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো এবং আরব উপদ্বীপের দেশগুলোতে হিজবুল্লাহর প্রতিনিধি বা উপদল (proxies) আছে যাদের আক্বীদাহ এবং মানহাজ এক এবং অভিন্ন। ইরানের আঞ্চলিক লক্ষ্য-উদ্দেশ্যগুলোকে বাস্তবায়ন করার জন্য তারা বিক্ষোভ করে, বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে ও জঙ্গি মোতায়েন করে।
ইরানের রাফিদ্বী শিয়া বিপ্লব চলাকালীন (যা আবুল আ’লা মাওদূদী, হিজবুত তাহরীরের[৭] অনুসারীসহ অন্যান্য পথভ্রষ্ট বিদআতীদের দ্বারা প্রশংসিত ও সমর্থিত ছিল), ইরানি অনুপ্রবেশের বাস্তবায়নকে সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে, ইরানি প্রোগ্রাম ও নীলনকশা অনুসরণ করে, (ইরানের) বাইরে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন অঞ্চলে শিয়াদের বহু সংগঠন তৈরি হয়।
বাহরাইনে, হাদী আল-মাদ্রাসী তেহরানের সমর্থনে ইসলামিক ফ্রন্ট ফর লিবারেশন অফ বাহরাইন (আল-জাবহাহ আল-ইসলামিয়্যাহ লি তাহরীর আল-বাহরাইন) গঠন করে। প্রাথমিকভাবে তারা নিম্নোক্ত লক্ষ্যমাত্রাগুলো নির্ধারণ করে:
ক) আল-খলীফার (বাহরাইনের শাসক) শাসনের পতন ও বিলুপ্তি ঘটানো,
খ) ইরানে আল-খোমেইনির বৈপ্লবিক রাজনৈতিক কাঠামোর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি শিয়াপন্থি সাংগঠনিক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা এবং
গ) দেশটিকে Gulf Cooperation Council (উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ) থেকে বিচ্ছিন্ন করে Iranian Republic (ইরানি প্রজাতন্ত্রের) সাথে সংযুক্ত করা।
এই (শিয়া) ইসলামিক ফ্রন্ট, আশ-শিআব আস-সাইর এবং আস-সাওরাহ ওয়ার-রিসালাহ-এর মতো ইরানি ম্যাগাজিন প্রকাশ করে এবং তা বিতরণ করে এবং তাদের তথ্য ও বিজ্ঞপ্তি সংক্রান্ত দায়িত্ব ঈসা মারহূনের উপর ন্যস্ত করে। ১৯৭৯ সালের শেষের দিকে (শিয়া) ইসলামিক ফ্রন্টের পরিকল্পনা অনুযায়ী বাহরাইনের শিয়ারা বিক্ষোভ করা শুরু করে এবং একই সময়ে সৌদি আরবের আল-ক্বাত্বীফে শিয়ারা যে বিক্ষোভ করছিল তার সাথে সমন্বয় করে তা পরিচালনা করে। এর ফলে যখন অরাজকতা সৃষ্টি হয়েছিল, তখন রাফিদ্বীরা বাহরাইনি গোয়েন্দাদের একজন নেতাকে হত্যা করেছিল যে কারণে (বাহরাইন) সরকার কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল এবং (শিয়া) ইসলামী ফ্রন্টের অসংখ্য সদস্যকে আটক করেছিল এবং কারাবন্দি করেছিল। এরপর (শিয়া) ইসলামী ফ্রন্ট বিক্ষোভ করা বন্ধ করে দেয় কিন্তু বিদ্রোহ করার প্রচেষ্টাকে অব্যাহত রাখে। তারা বাহরাইনে অস্ত্র পাচার শুরু করে এবং ১৯৮১ সালে, মুহাম্মাদ তাক্বী আল-মাদ্রাসীর নেতৃত্বে, তারা সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার চেষ্টা করে। তবে, এটি ব্যর্থ হয় এবং এর সাথে জড়িত থাকার কারণে বা তাদের সমর্থন করার সন্দেহে সরকার তাদের ৭৩ জনকে গ্রেপ্তার করে। ৮০ এর দশকের মাঝামাঝি, ইরানি গোয়েন্দাদের সাথে (শিয়া) ইসলামিক ফ্রন্ট একটি বৈঠক করে, এবং বৈঠকের পর তারা এতে সম্মত হয় যে ফ্রন্টের জন্য হিজবুল্লাহ বাহরাইন নামের একটি সামরিক শাখা প্রতিষ্ঠা করা উচিত।
হিজবুল্লাহ বাহরাইনে ৩০০০ বাহরাইনি শিয়া নিয়োগ দেওয়ার পাশাপাশি ইরান ও লেবাননে তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয় (শিয়া) ইসলামিক ফ্রন্টের প্রধান নেতা মুহাম্মাদ আলী মাহফূজকে। এই নতুন দলটির নেতা ছিল ‘আব্দুল-আমীর আল-জামারী, এবং পরবর্তীতে আলী সালমান তার স্থলাভিষিক্ত হয়।
(শিয়া) ইসলামিক ফ্রন্টের মুখপাত্র এবং দলের মূল পরিচালক হাদী আল-মাদ্রাসী তাদের কৌশলগত সহায়তা দিচ্ছিল, এবং মুহাম্মাদ তাক্বী আল-মাদ্রাসী দলটিকে যুদ্ধকৌশলগত সামরিক সহায়তা দিচ্ছিল। যখন নতুন দল গঠন হয়ে গেল, এরপরই দেশজুড়ে অরাজকতা ও বিপ্লব সৃষ্টি করার লক্ষ্যে এবং জোরপূর্বক কিছু অঞ্চল ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নিয়ন্ত্রণ করার উদ্দেশ্যে তারা একটি সুসংগঠিত এবং পরিকল্পিত কর্মসূচি গ্রহণ করল।
এসব কার্যক্রমের পেছনে হিজবুল্লাহ বাহরাইনের প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল ক্ষমতাসীন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে একটি অভ্যুত্থান ঘটানো এবং এমন একটি কাঠামো তৈরি করা যা ইরানের সাফাওয়ী শিয়া মতবাদের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে ও তাদের সমর্থন করবে।[৮] এই উদ্দেশ্যগুলো গোপন ছিল না, যেমন আয়াতুল্লাহ রূহানী বলেছে, “বাহরাইন ইরানকে অনুসরণ করে, এবং এটি ইরানি ইসলামী প্রজাতন্ত্রের একটি অংশ”[৯], এবং এখানে সে বাহরাইনের শিয়া জনগোষ্ঠীর কথা বলেছে।
১৯৯৪ সালে হিজবুল্লাহ বাহরাইন আরও বিক্ষোভ, বিদ্রোহ এবং নাশকতামূলক কার্যকলাপ শুরু করে এবং তারা “অর্গানাইজেশন ফর ডাইরেক্ট অ্যাকশন” এবং “মুভমেন্ট ফর লিবারেটিং বাহরাইন” এবং “অর্গানাইজেশন অফ স্টোলেন বাহরাইন”-এর মতো বিভিন্ন নাম ও উপাধি ব্যবহার করে, অথচ এসবই হিজবুল্লাহ বাহরাইনের অধীনে সংঘটিত হয়েছিল। লন্ডনে তারা “সাওত আল-বাহরাইন (বাহরাইনের আওয়াজ)” নামক মাসিক নিউজলেটার ছাপিয়ে তা বিতরণ করত এবং তাদের লক্ষ্য এবং অ্যাজেন্ডাগুলো তাতে ব্যাখ্যা করা থাকত। তারা বিদেশি সংস্থা (বা সরকার) থেকে আর্থিক সহায়তাও পেত। সাঈদ আল-হিশাবী, মাজিদ আল-আলাওয়ী এবং মানসূর আল-জামারী ছিল এই “মুভমেন্ট ফর লিবারেটিং বাহরাইন” নামের সংগঠনের মূলহোতা।
১৯৯৬ সালে আরও ভয়ংকর ঘটনা ঘটে, সবগুলোই ইরানে সংগঠিত ও পরিকল্পিত হয় এবং বাহরাইনে বাস্তবায়িত হয়। ঐ বছর মার্চ মাসে কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে এবং পরবর্তী কয়েক মাস ধরে তারা ধারাবাহিকভাবে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড ঘটাতে থাকে। যেমন তারা দোকানপাট ও গাড়ি পুড়িয়ে দেয়, বৃহৎ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্য কেন্দ্র ধ্বংস করে দেয়, একইভাবে বেশ কয়েকটি হোটেল ও স্কুল ধ্বংস করে দেয়, এবং পথেঘাটে বিদ্যুৎ ও টেলিফোন লাইনও ধ্বংস করে দেয়। বিদ্যুৎ ও টেলিফোন লাইনগুলো এই শিয়াদের বিরুদ্ধে ঠিক কী অপরাধ করেছিল তা এখনও জানা যায়নি।
তারা ইসলামিক ব্যাংক অফ বাহরাইনের একটি শাখা এবং ন্যাশনাল ব্যাংক অব বাহরাইনের একটি শাখাও পুড়িয়ে দেয়। এসব কর্মকাণ্ড ইরানি গণমাধ্যমগুলো দ্বারা পরিচালিত হচ্ছিল যারা বাহরাইনের জনগণকে তাদের রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এবং আইন অমান্য করতে উসকে দিচ্ছিল কারণ শিয়াদের দাবি পূরণ হচ্ছিল না। এখানে “শিয়াদের দাবি” বলতে তারা শাসকের কর্তৃত্বকে উৎখাত করে তার জায়গায় ইরানের আদলে একটি সাফাওয়ী শিয়া রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করাকে বুঝিয়েছে।
কুয়েতী সংবাদপত্র, আল-আম্বা আল-কুয়েতিয়্যাহ ১০ই জুন ১৯৯৬ সংস্করণে উল্লেখ করেছে যে, ইরাকি সেনাবাহিনী কুয়েতে যে অস্ত্রগুলো রেখে গিয়েছিল সেগুলো “হিজবুল্লাহ কুয়েতী ক্রয় করে নিচ্ছিল এবং হিজবুল্লাহ বাহরাইনীর কাছে পাচার করছিল” এবং সেই প্রতিবেদনে আরও ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে ইরান হিজবুল্লাহ কুয়েতকে দিকনির্দেশনা দিচ্ছিল যেন সেই অস্ত্রগুলো সবার অগোচরে বাহরাইনে পাচার করা হয়।
এটি হিজবুল্লাহ আল-বাহরাইনীর অন্যতম নেতা আহমাদ কাজিম আল-মিতকাওয়ী স্বীকার করেছে এবং এটি বাহরাইনী এবং আরবী গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে, সে বলেছে যে ইরানি গোয়েন্দাদের সহযোগিতায় অস্ত্রগুলো সমুদ্রপথে বাহরাইনে পাচার করা হয়েছে।
এটি জাসিম হাসান আল-খায়াতও স্বীকার করেছিল। সে আরও ব্যাখ্যা করেছে যে, একটি অভ্যুত্থান ঘটানো এবং সামরিকভাবে সরকারকে প্রতিস্থাপন করে ইরানের প্রতি অনুগত একটি শিয়া সরকার গঠন করাই এসব কর্মকাণ্ডের সর্বশেষ লক্ষ্য ছিল। এমনকি আব্বাস আলী আহমাদ আল-হুবাইলের মতো শিয়া ধর্মগুরুও তার খুত্ববায় রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে জনগণকে উসকে দিচ্ছিল। এর পাশাপাশি, কীভাবে বাহরাইনি নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে মোকাবেলা করে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একটি সামাজিক উত্থান ঘটানো যায়, সে বিষয়ে দলের প্রধান ভূমিকা পালনকারী, আব্দুল ওয়াহহাব হুসাইন নির্দেশনা প্রদান করছিল।
এই লক্ষ্য-পরিকল্পনাগুলো আজও থেমে নেই। হিজবুল্লাহ লেবানন এবং হিজবুল্লাহ বাহরাইনের মতো ইরানের অন্যান্য প্রতিনিধিদের (proxies) মাঝে সহযোগিতা ও সমর্থন রয়েছে এবং তারা বাহরাইনি সরকারের বিরুদ্ধে সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে যেন তাকে প্রতিস্থাপন করে রাফিদ্বী ইরান দ্বারা পরিচালিত ও তাদের প্রতি অনুগত একটি সাফাওয়ী শিয়া সরকার গঠন করা যায়।
১. শিয়াদের একটি চরমপন্থি দল।
২. দেখুন: Sunday Telegraph 27/5/1985.
৩. দেখুন: A Meeting with Hayder, Arab News Weekly 24/3/1983.
৪. দেখুন:
https://www.themadkhalis.com/md/articles/oyama-hasan-al-banna-sayyid-qutb-abu-ala-mawdudi-the-rafidah-and-the-iranian-revolution.cfm
৫. দেখুন:
http://www.sayyidqutb.com/
৬. দেখুন:
https://tinyurl.com/25fuc5je
৭. দেখুন:
https://www.nabahani.com/articles/gnlgwnw-hizb-ut-tahrir-and-the-rafidah-shiah-enemies-of-the-sahaabah-part-1.cfm
৮. ১৫০০ থেকে ১৭০০ খ্রিষ্টাব্দের ভিতরে সাফাওয়ীরা ইরানকে একটি ইসনা আশারিয়্যাহ শিয়া অধ্যুষিত অঞ্চলে পরিণত করে।
৯. দেখুন ‘আল-হারাকাত ওয়া আল-জামা’আত আস-সিয়াসিয়্যাহ ফী আল-বাহরাইন’ (পৃ. ৯৯-১০০)।
Share this:
- Share on X (Opens in new window) X
- Share on Facebook (Opens in new window) Facebook
- Email a link to a friend (Opens in new window) Email
- Share on Pinterest (Opens in new window) Pinterest
- Share on Telegram (Opens in new window) Telegram
- Share on WhatsApp (Opens in new window) WhatsApp
- Print (Opens in new window) Print
- Share on LinkedIn (Opens in new window) LinkedIn
- Share on Tumblr (Opens in new window) Tumblr

















