সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি সমস্ত সৃষ্টিকুলের পালনকর্তা। মহান আল্লাহ যেন ফেরেশতাদের সর্বোচ্চ মাজলিসে নবীর স্মরণকে সমুন্নত করেন আর আল্লাহর শান্তি ও রহমত যেন বর্ষিত হয় তাঁর উপর, তাঁর পরিবারবর্গ, তাঁর সাহাবা ও বিচার দিবস পর্যন্ত যারা একনিষ্ঠভাবে তাঁর অনুসরণ করবেন তাঁদের সকলের উপর।
ভূমিকা ও গুরুত্বপূর্ণ কিছু শব্দের আলোচনা
সালাফী হওয়ার অর্থ হলো সালাফে-সালেহীনের (সৎকর্মশীল পূর্বসূরিদের) আক্বীদাহ, মানহাজ ও তাঁদের পথকে অনুসরণ করা। আমাদের নবী (ﷺ) ও তাঁর সাহাবীগণ ছিলেন প্রাথমিক যুগের সালাফ। অতঃপর, মুমিনদের সুপ্রতিষ্ঠিত তিনটি প্রজন্মের আগমন ঘটে যারা নবী (ﷺ) ও তাঁর সাহাবীদের সুন্নাহকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরেন। যে ব্যক্তি এই পথকে সঠিকভাবে উপলব্ধি করে, তা হুবহু অনুসরণ করে, এতে কোনো কিছু সংযোজন করে না বা এত্থেকে বিচ্যুত হয় না, তাহলে সে সালাফী। কেউ সালাফদের অনুসৃত পথের উপর প্রতিষ্ঠিত বলে ধারণা করলেই সে সালাফী হয়ে যায় না, বরং সালাফিয়্যাহ হলো সাহাবায়ে কেরামের দীনকে অধ্যয়ন করা ও তা অনুসরণ করা – কেননা তাঁরা নবী (ﷺ)-এর কথা ও কাজের অর্থ ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি জানতেন। সুতরাং, কেউ যদি জিজ্ঞাসা করে: “দীন শেখার, অনুশীলন করার ও তা শিক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে সালাফীদের দাওয়াতী (আহ্বানের) নীতি ও পদ্ধতি (মানহাজ) কী?” আমরা এই বলে উত্তর দিতে পারি: এই হলো আমাদের দাওয়াহ যা নিম্নলিখিত ৮৯ টি পয়েন্টে ব্যাখ্যা করা হয়েছে:
সালাফী দাওয়াহ ও মানহাজ
১. সর্বপ্রথমে, আমরা একমাত্র আল্লাহ’র ইবাদতের প্রতি আহ্বান করি আর তাঁর সকল শরীক কে বর্জন করতে বলি। এটিই ছিল নবীগণ (‘আলাইহিমুস-সালাম)-এর দাওয়াতের প্রারম্ভিক বিষয়বস্তু, যেমনটি আল্লাহ ইরশাদ করেছেন: “আমি প্রত্যেক জাতির প্রতি রাসূল প্রেরণ করেছি এই মর্মে যে: আল্লাহ’র ‘ইবাদত করো আর তাগূতসমূহ (মিথ্যা ইলাহদেরকে) বর্জন করো।”[1] অতএব “একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করো”-এই আহ্বানের পাশাপাশি বাকি সমস্ত কিছুর ইবাদতকে অস্বীকার করার প্রতি আহ্বান করাও ওয়াজিব।
২. আমরা জানি যে দীন বিভিন্ন আবশ্যকীয়তার প্রতি আহ্বান করে, তাই, আমরা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দিয়ে শুরু করি, এরপর কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী যেটি (তুলনামূলক) কম গুরুত্বপূর্ণ, ক্রমান্বয়ে সেই বিষয়ের প্রতি আহ্বান করি। আল্লাহ’র রাসূল (ﷺ) মু’আয বিন জাবাল (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুকে) আদেশ করেছিলেন: “সর্বপ্রথম তাদেরকে একমাত্র আল্লাহ’র ‘ইবাদতের প্রতি আহ্বান করবে। যদি তারা তা মেনে নেয়, তাহলে তাদেরকে অবহিত করবে যে আল্লাহ তাদের উপর দিবারাত্রি পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরয করেছেন। যদি তারা তা মেনে নেয়, তাদেরকে অবহিত করবে যে আল্লাহ তাদের উপর যাকাতকে ফরয করেছেন…”[2]
৩. আমরা বিশ্বাস করি, সুন্নাহ হলো ওয়াহী যেমনিভাবে কুরআন হলো ওয়াহী। আল্লাহ, সুবহানাহু ওয়া-তা’আলা, বলেন: “আর তিনি (মুহাম্মাদ ﷺ) মনগড়া কথা বলেন না, তিনি শুধু তাই বলেন যা তাঁর কাছে প্রত্যাদেশ করা হয়।”[3]
৪. আমরা বিশ্বাস করি, সুন্নাহ হলো কুরআন ব্যতীত ঐ সমস্ত কিছু যা রাসূল (ﷺ) এর প্রতি নাযিল করা হয়েছিল। রাসূল (ﷺ) বলেছেন: “নিশ্চয়ই আমাকে কুরআন দেওয়া হয়েছে এবং এর সাথে এর অনুরূপ কিছু।”[4]
৫. আমরা বিশ্বাস করি, সুন্নাহ হলো ঐ সমস্ত কিছু যা রাসূল (ﷺ) বলেছেন, করেছেন আর ঐ সমস্ত কিছু যা তাঁর উপস্থিতিতে করা হয়েছিল কিন্তু তিনি তাতে আপত্তি করেননি। তাঁর বাহ্যিক বিবরণ ও অভ্যন্তরীণ চরিত্রও সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত।
৬. আমরা বিশ্বাস করি, নবী-রাসূলগণের পর মানবজাতির মাঝে সর্বশ্রেষ্ঠ হলেন নবী (ﷺ)-এর সাহাবীগণ কেননা তিনি নিজেই বলেছেন: “মানবজাতির মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলো আমার প্রজন্ম, এরপর তাঁদের পরবর্তীরা, এরপর তাঁদের পরবর্তীরা।”
৭. আমরা বিশ্বাস করি, সাহাবীদের মধ্যে সবচাইতে উত্তম হলেন আবূ-বাকর আস-সিদ্দীক্ব, এরপর ‘উমার ইবনুল খাত্তাব, এরপর ‘উসমান ইবনু আফফান, এরপর ‘আলী বিন আবী ত্বালিব (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুম), এরপর বাকি দশজন জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত সাহাবা৷ এরপর হলেন বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীরা, এরপর হলেন তারা যারা হুদাইবিয়ায় গাছের নীচে “আর-রিদ্বওয়ানে” বায়াত গ্রহণ করেছিলেন, এরপর বাকি সমস্ত মুহাজিরগণ, এরপর আনসারগণ, এরপর হলেন তাঁরা যারা মক্কা বিজয়ের পূর্বে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, আর এরপর হলেন তাঁরা যারা বিজয়ের পরবর্তীকালীন সময়ে (ইসলাম) গ্রহণ করেছিলেন।
৮. আমরা রাফেযী শিয়াদের সাথে বিচ্ছিন্নতা অবলম্বন করি। আল্লাহ’র রাসূল (ﷺ)-এর স্ত্রী ও তাঁর সাহাবীদেরকে ঘৃণা, তিরস্কার ও লানত করার মতো তাদের [শিয়াদের] অগণিত ইসলাম বিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সতর্ক করি। রাসূল (ﷺ) বলেছেন: “আমার সাহাবীদেরকে তিরস্কার করো না, কেননা তাঁর কসম যাঁর হাতে আমার প্রাণ! তোমাদের মাঝে কেউ যদি উহুদ সমপরিমাণ স্বর্ণও [আল্লাহর পথে] ব্যয় করে, এরপরও তাদের কোনো একজনের এক মুঠ (দানের) সমানও তা হবে না, বরং এর অর্ধেকেরও না।”[5] এবং তিনি (ﷺ) আরও বলেছেন: “তার উপর আল্লাহ’র লানত যে আমার সাহাবীদেরকে লানত দেয়।”
৯. আমরা বিশ্বাস করি, আল্লাহ’র কিতাব ও রাসূল (ﷺ) এর সহীহ সুন্নাহকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরার মাধ্যমে এবং তা (অর্থাৎ কুরআন ও সুন্নাহকে) সাহাবাদের ফাহম (বুঝ) অনুযায়ী অনুসরণের মাধ্যমে এই উম্মাহর সংশোধন সম্ভব। নবী (ﷺ) বলেছেন: “তোমাদের মাঝে যা রেখে গিয়েছি তা যদি আঁকড়ে ধরো, তবে তোমরা কখনো পথভ্রষ্ট হবেনা: আল্লাহ’র কিতাব ও আমার সুন্নাহ।”[6] তিনি আরও বলেছেন: “আমার সুন্নাহ ও আমার পরবর্তীতে আমার হিদায়াতপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশিদীনের সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরবে।”[7]
১০. আমরা বিশ্বাস করি যে মুসলিমদের ঐক্য নিশ্চিতকরণ ও বিভক্তি পরিহার করা একটি মূলনীতি যা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ﷺ) আদেশ করেছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেছেন: “আর তোমরা আল্লাহ’র রজ্জুকে একযোগে দৃঢ়ভাবে ধারণ করো ও পরস্পর বিভক্ত হয়ো না।”[8] এবং তিনি বলেছেন: “আর তাদের মতো হয়ো না যারা সুস্পষ্ট প্রমাণ আসার পরও বিভক্ত হয়েছে ও মতবিরোধ করেছে।”[9]
১১. আমরা বিশ্বাস করি, একটি শরীয়াহ ভিত্তিক ঐকমত্য গঠন করা কেবল তখনই সম্ভব হবে, যখন মুসলিমরা তাদের সমস্ত বিরোধ ও বিবাদপূর্ণ বিষয়াদি সাহাবীদের ফাহমের (বুঝের) আলোকে ব্যাখ্যাকৃত কুরআন ও সুন্নাহর কাছে সমর্পণ করবে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলার বাণী: “অতঃপর যদি তোমাদের মধ্যে কোনো বিষয়ে কোনো মতবিরোধ হয় তাহলে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দিকে প্রত্যাবর্তিত হও, যদি তোমরা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস করে থাকো; এটিই হলো কল্যাণকর ও শ্রেষ্ঠতর পরিসমাপ্তি।” রাসূল (ﷺ) এর বাণী: “তোমাদের মাঝে যে কেউই দীর্ঘকাল জীবিত থাকবে সে অচিরেই অনেক মতবিরোধ ও বিবাদ দেখতে পাবে, তাই তোমাদের উপর ওয়াজিব হলো আমার সুন্নাহ ও আমার খুলাফায়ে রাশিদীনের সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরা। তোমাদের মাঁড়ির দাঁত দিয়ে তা আঁকড়ে ধরবে।”[11]
১২. আমরা বিশ্বাস করি, আক্বীদাহ সংশোধনের মাধ্যমে আল্লাহর প্রতি আহ্বানের কাজকে শুরু করতে হয়। এটিই ছিল রাসূলগণ (عليهم السلام)-এর দাওয়াতের প্রারম্ভিক বিষয়৷ রাসূল (ﷺ) মু’আয বিন জাবাল (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহু)-কে আদেশ করেছিলেন, তিনি যেন ইয়ামানবাসীকে ইসলামের দিকে আহ্বান করার সময় তাওহীদের বাণী দিয়েই তা শুরু করেন।
১৩. দীনের ভিতর সকল নব-উদ্ভাবিত আক্বীদাহ, কথা বা কাজকে আমরা প্রত্যাখ্যান করি ও হারাম ঘোষণা করি। আল্লাহ তা’আলা বলেন: “আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম, তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দীন হিসেবে মনোনীত করলাম।”[12] এবং আল্লাহ তা’আলার বাণী: “তাদের কি এমন কতকগুলো শরীক আছে যারা তাদের জন্য বিধান দিয়েছে এমন দীনের যার অনুমতি আল্লাহ দেননি?”[13]
১৪. দীনের ভিতর সংযোজনকৃত সকল নব-উদ্ভাবিত বিষয় হলো নিষিদ্ধ, বিপথগামী আর জাহান্নামের দিকে পরিচালনাকারী। সুতরাং, বিদআতে হাসানাহ (উত্তম বিদআত) বলার কোনো সুযোগ দীন ইসলামে নেই। রাসূল (ﷺ) বলেছেন: “নিশ্চয়ই ইসলামের ভিতর সবচেয়ে নিকৃষ্ট বিষয় হলো নব-উদ্ভাবিত বিষয়াদি। প্রতিটি নব-উদ্ভাবিত বিষয় হলো বিদআত, আর প্রতিটি বিদআত হলো পথভ্রষ্টতা আর প্রতিটি পথভ্রষ্টতা জাহান্নামে (নিয়ে যায়)।”[14] তিনি আরও বলেছেন: “যে কেউ আমাদের এই বিষয়ে (দীনের ভিতর) এমন কিছু উদ্ভাবন করবে যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত হবে।”[15]
১৫. আমরা বিশ্বাস করি, কুরআন আল্লাহর কালাম, তা সৃষ্ট নয় (গাইরু মাখলূক্ব)। যে বলবে কুরআন মাখলূক্ব (সৃষ্ট), সে কাফের। ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন: “এটি সৃষ্ট নয়। আর একে অসৃষ্ট বলাতে কেউ যেন দুর্বলতা প্রদর্শন না করে। বরং, আল্লাহর কালাম (তাঁর কথা বলার সিফাত তাঁর সত্তা থেকে) স্বতন্ত্র বা আলাদা কিছু নয়, এবং এর (কুরআনের) ভিতর কোনো কিছুই সৃষ্ট না।” আমরা বিশ্বাস করি আল্লাহ তা’আলা শব্দ ও অক্ষর দিয়ে কথা বলেন এবং এমন আওয়াজে (তিনি কথা বলেন) যা শোনা যায়। তাঁর যখন ইচ্ছা হয় ও যার সাথে ইচ্ছা হয় তিনি কথা বলেন।
১৬. আমরা আল্লাহর ঐসকল নাম ও গুণাবলি সত্য বলে স্বীকার করি যা কুরআন ও সহীহ সুন্নাহতে বর্ণিত হয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি সেগুলো বাহ্যিক অর্থেই গ্রহণ করতে হয়, রূপক অর্থে নয়। তবে, তাঁর গুণাবলি “কেমন” (অর্থাৎ সেগুলোর ধরন/প্রকৃতি বা কাইফিয়্যাহ) সম্পর্কে আমরা প্রশ্ন করি না। আমরা বিশ্বাস করি, গুণাবলি “কেমন” তা জিজ্ঞেস করা বিদ‘আত, কেননা তা আল্লাহর সাথে সৃষ্টির সাদৃশ্য করার পথকে খুলে দেয়। তাই প্রাথমিক যুগের সালাফরা, যেমন মালিক ইবনু আনাস (রাহিমাহুল্লাহ) তা শক্তভাবে নিষেধ করতেন।
১৭. আমরা আমাদের মহান রবকে, সৃষ্টির সাথে সকল প্রকার সদৃশতা (তামসীল) থেকে মুক্ত বলে ঘোষণা দেই এবং সেই সাথে তাঁর সমস্ত গুণাবলি সত্য ও অকাট্য বলে স্বীকার করি, যেমনটি তিনি বলেছেন: “তাঁর সদৃশ আর কিছুই নেই, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।”[16] সুতরাং, তিনি, সুবহানাহু ওয়া তা’আলা, (তাঁর সাথে সৃষ্টির সমস্ত কিছুর) সদৃশতাকে নাকচ করেছেন আর শ্রবণ ও দৃষ্টির গুণকে নিজ সত্তার জন্য সাব্যস্ত করেছেন।
১৮. আল্লাহ তাঁর নিজ সত্তার জন্য যে সমস্ত নাম ও গুণাবলি সাব্যস্ত করেছেন, ঐ সমস্ত নাম ও গুণাবলি আমরা তা’তীল (নিষ্ক্রিয় করে দেওয়া) বা তাহরীফ (শব্দের বাহ্যিক অর্থ বাদ দিয়ে ভিন্ন অর্থে গ্রহণ করা) ছাড়াই আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করি। তিনি, সুবহানাহু ওয়া তা’আলা, তাঁর সমস্ত নাম সম্পর্কে বলেছেন: “আর আল্লাহর জন্যই রয়েছে সুন্দর সুন্দর নাম। সুতরাং তোমরা তাঁকে সেসব নামেই ডাকো; আর যারা তাঁর নামকে বিকৃত (ইলহাদ) করে তাদেরকে বর্জন করো; তাদের কৃতকর্মের ফল অচিরেই তাদেরকে দেওয়া হবে।”[17]
১৯. আমরা কবরের আযাব ও প্রতিদানের উপর বিশ্বাস করি যেভাবে বিশুদ্ধ রিওয়ায়াতে বর্ণিত হয়েছে। দুই ফেরেশতা বান্দাকে তার কবরে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন বলে আমরা বিশ্বাস করি। তাঁরা বান্দাকে তার রব, তার দীন ও তার নবী সম্পর্কে প্রশ্ন করবেন যেভাবে সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে।
২০. আমরা বিশ্বাস করি, জাহান্নামের উপরে একটি পুল (আস-সিরাত) স্থাপন করা হয়েছে, যা চুলের চেয়েও সরু ও তলোয়ারের চেয়েও ধারালো, যেমনটি সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। প্রত্যেকে তার কৃতকর্ম অনুযায়ী তা অতিক্রম করবে। সৎকর্মশীলগণ বিদ্যুতের ন্যায় বা একটি দ্রুতগামী ঘোড়ার মতো তড়িৎ গতিতে তা অতিক্রম করবেন, অপরদিকে পাপিষ্ঠরা হামাগুড়ি দিবে, আর গুনাহের কারণে অন্যান্যদেরকে ছিনিয়ে নেওয়া হবে ও তাদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। মহান আল্লাহ বলেছেন: “এবং তোমাদের প্রত্যেকেই তা অতিক্রম করবে; এটি তোমার রবের অনিবার্য সিদ্ধান্ত।”[18]
২১. আমরা বিশ্বাস করি, মহান আল্লাহ তাঁর স্ব-সত্তায় সাত আকাশের উপরে আছেন, তাঁর আরশের উপরে আছেন, তাঁর সৃষ্টি থেকে তিনি সম্পূর্ণরূপে পৃথক ও স্বতন্ত্র এবং তিনি সবকিছু জানেন ও সমস্ত বিষয়কে নিয়ন্ত্রণ করেন। কুরআন-সুন্নাহ, সাহাবাদের ইজমা (ঐকমত্য), প্রাথমিক যুগের সালাফ ও আহলুস-সুন্নাহর ইমামদের থেকে এই ব্যাপারে এক হাজারেরও বেশি বর্ণনা পাওয়া যায় যা, আল্লাহর সুউচ্চে থাকার বিষয়টিকে প্রমাণ করে। যে ব্যক্তি বলে মহান আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির ভিতরে বিরাজমান সে কুফরী করেছে। রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন: “কাজেই তোমরা যখন আল্লাহর কাছে চাইবে, তখন আল-ফিরদাউসকে চাইবে কারণ তা জান্নাতের মধ্যখানে অবস্থিত ও তা জান্নাতের সর্বোচ্চ স্তর। আর এর উপরে রয়েছে আর-রহমানের আরশ যেখান থেকে জান্নাতের নদ-নদী উদ্গত হয়।”[19] মহান আল্লাহ বলেছেন: “আর-রহমান আরশের উপর উঠেছেন।”[20] ‘কীভাবে’ উঠেছেন তা আমরা প্রশ্ন করি না।
২২. আমরা কেয়ামতের দিন নবী মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর শাফাআতের উপর বিশ্বাস করি, আর তিনি ব্যতীত যত ফেরেশতা, নবী ও মুমিনদেরকে আল্লাহ শাফাআত (সুপারিশ) করার অনুমতি দিবেন, আমরা তাদের শাফাআতের উপরও বিশ্বাস করি। আল্লাহ তা’আলার বাণী: “পরম করুণাময়ের অনুমতিপ্রাপ্ত ব্যক্তি ব্যতীত কারো সুপারিশ করার কোনো ক্ষমতা থাকবে না।”[21] এবং নবী (ﷺ) এর হাদীস: “আমি হলাম কেয়ামতের দিন সমস্ত আদম সন্তানের সায়্যিদ। আমিই সর্বপ্রথম যার জন্য কবরকে বিদীর্ণ করা হবে, আমিই সর্বপ্রথম যে সুপারিশ করবে ও সুপারিশকারীদের মধ্যে আমিই সর্বপ্রথম যার সুপারিশ গৃহীত হবে।”[22]
২৩. আমরা বিশ্বাস করি যে নবী বা আউলীয়াদের (মৃত সৎকর্মশীল ব্যক্তিবর্গের) কাছে দু’আ করার মাধ্যমে শাফাআত চাওয়া বড় শিরক কেননা সেটা তাদের ইবাদত করার সমতূল্য। রাসূল (ﷺ) বলেছেন: “দু‘আ হলো ইবাদত।”[23] মহান আল্লাহ বলেন: “আর আল্লাহ ছাড়া এমন কিছুকে ডেকো না, যা তোমার উপকার করতে পারে না ও তোমার ক্ষতিও করতে পারে না। বস্তুত: যদি এরূপ করো তাহলে তুমি যালিমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। আল্লাহ যদি তোমাকে কোনো কষ্টে নিপতিত করতে চান তাহলে তিনি ছাড়া তা দূরীভূত করার কেউ নেই…।”[24] এবং যারা মৃতের কাছে দু‘আ চায় তাদেরকে উদ্দেশ্য করে তাঁর বাণী: “তার চেয়ে অধিক পথভ্রষ্ট আর কে, যে আল্লাহর পরিবর্তে এমন কাউকে ডাকে, যে কেয়ামতের দিন পর্যন্তও তার ডাকে সাড়া দিবে না? আর তারা তাদের আহ্বান সম্পর্কে অবহিত নয়”[25] এবং তাঁর বাণী: “তোমাদের রব বলেন: তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দিবো। কিন্তু যারা অহংকার বশত আমার ইবাদতে বিমুখ তারা অচিরেই জাহান্নামে প্রবেশ করবে লাঞ্ছিত হয়ে।”[26]
২৪. আল্লাহর ক্বাদা-ওয়াল-ক্বাদরের উপর আমরা বিশ্বাস করি। অর্থাৎ সকল বিষয় পূর্বনির্ধারিত। চারটি বিষয় এই বিশ্বাসের অন্তর্ভুক্ত: ১) যা কিছু পূর্বে ঘটেছে এবং যা ভবিষ্যতে ঘটতে চলেছে সে সমস্ত বিষয় সম্পর্কে আল্লাহর পরিপূর্ণ জ্ঞান; এবং কোনো কিছুই তাঁর জ্ঞানকে এড়িয়ে যাওয়ার ক্ষমতা রাখে না। ২) আকাশ ও যমীন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর আগে, কিয়ামত পর্যন্ত যা কিছু সংঘটিত হবে, আল্লাহ তা’আলা কলমকে তা লাওহে-মাহফূযে লিপিবদ্ধ করার আদেশ দিয়েছেন। ৩) যা কিছু সংঘটিত হয় তা আল্লাহর ইচ্ছায় হয়, আর তাঁর ইচ্ছা ব্যতীত কোনো কিছুই সংঘটিত হয় না। ৪) আল্লাহ, তাঁর পরিপূর্ণ জ্ঞানের ভিত্তিতে, ভালো ও মন্দ, সবকিছুকে সৃষ্টি করেছেন।
২৫. আমরা বিশ্বাস করি কোনো কবর, নির্দিষ্ট কোনো গাছ, পাথর বা প্রস্তর ইত্যাদি থেকে তাবাররুক (বরকত) তালাশ করা শিরক। একটি গাছকে তাবাররুকের উদ্দেশ্যে নির্ধারণ করা হোক বলে যারা অনুরোধ করেছিল তাদের উদ্দেশ্যে রাসূল (ﷺ) বলেছেন: “তাঁর শপথ, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, তোমরা ঠিক তাই বলেছ যা বনী ইসরাঈলরা মূসা (عليه السلام) কে বলেছিল: ‘আমাদের জন্য তাদের উপাস্যদের মতো একটি উপাস্য নির্ধারণ করুন।’ প্রতি উত্তরে মূসা (আলাইহিস সালাম) বললেন: নিশ্চয়ই তোমরা একটা জাহিল সম্প্রদায়।’ [আল-আ’রাফ: ১৩৮] তোমরা অবশ্যই তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে অনুসরণ করবে।”
২৬. আমরা বিশ্বাস করি, বিদআতীদেরকে বর্জন করা ও তাদেরকে বিতাড়িত করা ওয়াজিব কারণ তারা বিশুদ্ধ দীনকে কলুষিত করে। ফুদাইল বিন ইয়াদ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন: “আমি সবচেয়ে উত্তম ব্যক্তিদের সাথে সাক্ষাৎ করেছি, তাঁরা সকলে আহলুস-সুন্নাহ এবং তাঁরা সকলে বিদআতীদের সাথে উঠাবসা করাকে নিষেধ করতেন।”
২৭. আমরা বিশ্বাস করি, যারা বিদআতীদেরকে সমর্থন করে, আশ্রয় দেয় বা তাদের (লেখা বইপুস্তক, বিবৃতি) প্রচার করে তারা আহলুল-বিদ’আহর অন্তর্ভুক্ত। রাসূল (ﷺ) বলেছেন: “ব্যক্তি তার সঙ্গীর দীনের উপরই প্রতিষ্ঠিত থাকে, সুতরাং তোমাদের প্রত্যেকেই যেন দেখে সে কাকে নিজ সঙ্গী হিসেবে গ্রহণ করছে।”[27] ফুদাইল বিন ইয়াদ্ব (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন: “কোনো ব্যক্তি যদি বিদআতীদের সাথে উঠাবসা করে, তাহলে তার থেকে সাবধানতা অবলম্বন করো।”
২৮. আমরা বিশ্বাস করি, বিদআতীদের সাথে উঠাবসা করা ও তাদের থেকে ইলম নেওয়া বৈধ নয়। এই বিষয়ে আহলুস সুন্নাহর ইজমা (ঐকমত্য) আছে। কাযী আবূ ইয়ালা (মৃ.৩৩৩ হি) বলেছেন: “বিদআতীদের থেকে বিচ্ছিন্নতা অবলম্বন করা ও পৃথক হওয়ার ব্যাপারে সাহাবা ও তাবিঈনদের মাঝে ইজমা আছে।”
২৯. বিদআতীদের বই, লেখা (বইপুস্তক-প্রবন্ধ), ওয়েবসাইট ও তাদের শিক্ষাক্রমের দিকে তাকানো বা তাদের বক্তৃতা ও বিবৃতি শোনাকে আমরা হারাম বলে বিশ্বাস করি। তাদের দেওয়া শিক্ষা ও লেখা (বইপুস্তক-প্রবন্ধের) প্রতি গভীর মনোযোগ দেওয়ার অর্থই হলো সালাফী মানহাজের বিরুদ্ধাচরণ করা। বরং, তাদের ভুল-ত্রুটি উদ্ঘাটন করা এবং সেগুলো খণ্ডন করা শুধু উলামাদের জন্য নির্দিষ্ট এবং ইলমে দীনে যারা পরিপক্ব তাদের উপরে ন্যস্ত।
৩০. আমরা বিশ্বাস করি, সাধারণ মুসলিম যারা বিদআতের দিকে আহ্বানকারীদের দ্বারা বিভ্রান্ত হয়েছে, তাদেরকে মহান আল্লাহর বাণী অনুযায়ী উত্তমভাবে সুন্নাহর দিকে আহ্বান করতে হবে: “আপনি আপনার রবের পথে আহ্বান করুন হিকমাহ ও উত্তম উপদেশের দ্বারা ও তাদের সাথে বিতর্ক করুন এমনভাবে যা সবচেয়ে উত্তম।”[28]
৩১. আমরা বিশ্বাস করি, আল্লাহর দীনের প্রতি দাওয়াত প্রদান করা (অর্থাৎ এর বিষয়বস্তু ও পদ্ধতি) শরীয়ত কর্তৃক সুনির্ধারিত (তাওকীফিয়্যাহ) একটি বিষয় যা ব্যক্তিগত মতামত বা রা’ইর উপর নির্ভরশীল নয়। সুতরাং, আমরা তাদের নিন্দা জানাই যারা নাশীদ ও গান-বাজনার মাধ্যমে মানুষকে দীনের প্রতি আকৃষ্ট করতে চায়। এটা তাদের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য, যারা কাল্পনিক চলচ্চিত্র, জাদুবিদ্যা বা হাসি-তামাশাকে দাওয়াহর মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে। এরা পথভ্রষ্ট এবং সুন্নাহ ও সাহাবাদের মানহাজের বিরুদ্ধবাদী বলে বিবেচিত।
৩২. আমরা নিশ্চিতরূপে বিশ্বাস করি যে, সত্যিকার অর্থেই মুমিনগণ পরকালে তাদের রবকে [তাদের চর্মচক্ষু দিয়ে] দেখতে পাবেন, যেমনটি নবী (ﷺ) বলেছেন: “নিশ্চয়ই তোমরা তোমাদের রবকে দেখতে পাবে যেমনিভাবে মেঘমুক্ত আকাশে পূর্ণিমার চাঁদকে দেখতে পাও।” সুতরাং একে অপব্যাখ্যা করা বা একে রূপক অর্থে গ্রহণ করা বৈধ নয়। বরং আহলুস-সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের ইজমা অনুসারে তা কেবল বাহ্যিক অর্থেই গ্রহণ করতে হবে। ইমাম আল-আজুররী রাহিমাহুল্লাহ (মৃ.৩৬০ হি) বলেছেন: “এবং এই বিষয়ে আমরা যা কিছু উল্লেখ করেছি, কোনো ব্যক্তি যদি তার সমস্ত কিছুকে অস্বীকার করে ও দাবি করে যে, আখিরাতে আল্লাহকে দেখা যাবে না, সে কাফের।”
৩৩. আমরা বিশ্বাস করি, কোনো ব্যক্তি ততক্ষণ পর্যন্ত আহলুস-সুন্নাহ ওয়াল-জামাআতের অন্তর্ভুক্ত বলে বিবেচিত হবে না যতক্ষণ না সে আক্বলের উপর নাক্বলকে (অর্থাৎ বিবেক-বুদ্ধির উপর ওয়াহীকে) প্রাধান্য দিবে, ইলমুল কালাম ও দর্শনকে পরিত্যাগ করবে এবং হাদীসে রাসূল ও প্রাথমিক যুগের সালাফদের ফাহমের (বুঝের) কাছে আত্মসমর্পণ করবে।
৩৪. আমরা বিশ্বাস করি, শাসককে মান্য করতে হবে, হোক সে সৎকর্মশীল বা গুনাহগার; আর অত্যাচারী মুসলিম শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা হারাম, যদিও তার চরিত্র শয়তানের মতো হয়, যদিও সে সুন্নাহর অনুসরণ না করে, আর [যদিও] সে মানুষের পিঠে প্রহার করে, তাদের বন্দী করে রাখে ও তাদের সম্পদ লুণ্ঠন করে নেয়, যা নবী (ﷺ) এর উক্তির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ: “আমার পর তোমাদের উপর এমন শাসক নিযুক্ত হবে যারা আমার হিদায়াতের দ্বারা পরিচালিত হবে না ও আমার সুন্নাতের অনুসরণ করবে না। এবং তাদের মাঝে এমন কিছু লোকের উদ্ভব ঘটবে, যাদের অন্তঃকরণ হবে মানব দেহে শয়তানের অন্তঃকরণ।” আমি জিজ্ঞেস করলাম, “হে আল্লাহর রাসূল! আমি যদি সেই সময়ে পৌঁছাই তখন আমার কী করণীয়?” তিনি উত্তর দিলেন: “তুমি শাসকের কথা শুনবে ও মানবে, যদিও তোমার পিঠে প্রহার করা হয় ও তোমার সম্পদ কেড়ে নেওয়া হয়। তবুও তুমি শুনবে এবং মানবে!”[29]
৩৫. আমরা বিশ্বাস করি, অত্যাচারী শাসকের বেলায় ধৈর্যধারণ করা ওয়াজিব, ঠিক যেমন রাসূল (ﷺ) বলেছেন: “কোনো ব্যক্তি যদি তার আমীরকে অনৈতিক কোনো কিছু করতে দেখে, তাহলে সে যেন ধৈর্যধারণ করে।”[30]
৩৬. আমরা বিশ্বাস করি, শাসকবৃন্দকে প্রকাশ্যে তিরস্কার করা হারাম কারণ এটা পথভ্রষ্ট খাওয়ারিজদের মানহাজ। নবী (ﷺ) বলেছেন: “যে ব্যক্তি শাসককে উপদেশ দিতে চায়, সে যেন তা প্রকাশ্যে না করে ! বরং সে যেন তার হাত ধরে নেয় ও তাকে নির্জনে নিয়ে যায়। অতঃপর, যদি সে উপদেশ গ্রহণ করে নেয় তবে তা ভালো, আর যদি সে তা [গ্রহণ] না করে, তবে সে (উপদেশদাতা) তার দায়িত্ব পালন করেছে।”[31]
৩৭. আমরা বিশ্বাস করি, যারা অত্যাচারী শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে তারা খাওয়ারিজ ও আহলুল-বিদ’আহ – তারা আহলুস সুন্নাহ-ওয়াল-জামাআতের অন্তর্ভুক্ত নয়। নবী (ﷺ) তাদের সম্পর্কে বলেছেন: [“আমার পরবর্তীতে আমার উম্মতের ভিতর] এমন একটি দলের প্রাদুর্ভাব ঘটবে, যারা কুরআন পড়বে কিন্তু সেটা তাদের কণ্ঠনালিকে অতিক্রম করবে না। তারা দীন থেকে বেরিয়ে পড়বে, ঠিক যেভাবে তীর লক্ষ্য ভেদ করে বেরিয়ে যায়।”[32] সাহাবীগণ একমত ছিলেন যে এই হাদীস খাওয়ারিজদের প্রতি ইঙ্গিত করে।
৩৮. শুধু কবীরা গুনাহের কারণে কোনো মুসলিমকে আমরা কাফের বা মুরতাদ বলে ঘোষণা দেই না যতক্ষণ না তার গুনাহ শিরক বা বড় কুফরের পর্যায়ভুক্ত হবে। মহান আল্লাহ বলছেন: “নিশ্চয়ই আল্লাহ তার সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না। এছাড়া তিনি অন্যান্য পাপ ক্ষমা করেন, যার জন্য চান।…”[33] কবীরা গুনাহ করার কারণে যারা মুসলিমদেরকে কাফের বলে ঘোষণা দেয় তারাই খাওয়ারিজ।
৩৯. আমরা বিশ্বাস করি ব্যভিচারী, চোর, খুনি, মাতাল, জুয়াড়ি ইত্যাদি এরা সবাই আল্লাহর শাস্তির হুমকি ও তাঁর ইচ্ছার অধীনে। এসমস্ত পাপ করার পরও, সে কাফের বলে বিবেচিত হবে না, যতক্ষণ না সে নিজের জন্য তা (হারামকে) হালাল বানিয়ে নিবে। এই বিষয়ে আহলুস-সুন্নাহর ঐকমত্য আছে এবং ইবনু তাইমিয়্যাহ (মৃ.৭২৮ হি), ইবনু ‘আব্দিল-ওয়াহহাব (মৃ.১২০৭ হি) এবং ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ) ঠিক তাই বলেছেন। কিন্তু খাওয়ারিজরা এর বিরোধিতা করে আর মুসলিমদের মাঝে যারা কবীরা গুনাহগার তাদেরকে কাফের বলে ঘোষণা দেয়, আর এই ক্ষেত্রে পাপিষ্ঠ শাসকদেরকে তাদের মূল লক্ষ্যবস্তু বানায়।
৪০. আমরা বিশ্বাস করি, কুফর ছোট (আসগর) হতে পারে, যা একজন ব্যক্তিকে ইসলাম থেকে বের করে দেয় না- এবং তা বড় (আকবার) হতে পারে, যা একজন ব্যক্তিকে ইসলাম থেকে বের করে দেয়। অনুরূপভাবে, শিরক ছোট (আসগর) হতে পারে, যা একজন ব্যক্তিকে ইসলাম থেকে বের করে দেয় না – এবং তা বড় (আকবার) হতে পারে, যা একজন ব্যক্তিকে ইসলাম থেকে বের করে দেয়।
৪১. আমরা ইবনু তাইমিয়্যাহর (আল-ফাতাওয়া ৭/৩১২) বক্তব্যকে মানি: “এটি সালাফদেরই উক্তি যে ‘একজন ব্যক্তি ইমান ও নিফাক্ব উভয় ধারণ করতে পারে।’ একইভাবে তাঁদের [সালাফদের] বক্তব্য, ‘একজন ব্যক্তি ইমান ও কুফর উভয় ধারণ করতে পারে।’ কেননা এটা এমন কুফর নয় যা দীন থেকে বহিষ্কৃত করে দেয়, যেমনটি ইবনু আব্বাস (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা) এবং তাঁর সাথীগণ মহান আল্লাহর বাণী সম্পর্কে বলেছেন, ‘আর যে ব্যক্তি আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান দিয়ে বিচার করে না, সে কাফের।’[34] এ সম্পর্কে তাঁরা বলতেন: “তারা এমন কুফরী করেছিল যা তাদেরকে দীন থেকে বহিষ্কৃত করেনি।” এই ফাহমের উপর তাঁরা অনুসৃত ছিলেন ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল (রাহিমাহুল্লাহ) এবং তিনি সহ অন্যান্য সুন্নাহর ইমামদের দ্বারা।”
৪২. যদি মুসলিম শাসকরা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান ব্যতীত অন্য কিছু দিয়ে বিচার করে এরপরও আমরা তাদেরকে কাফের বলে ঘোষণা দেই না যতক্ষণ না তারা [আল্লাহর বিধান ব্যতীত অন্য কোনো বিধান দিয়ে বিচার করাকে] নিজের জন্য হালাল বলে ঘোষণা দেয়, যেমন ইমাম আব্দুল-‘আযীয ইবনু বায (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন: “সে যদি আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান ছাড়া অন্য কিছু দিয়ে বিচারকার্য পরিচালনা করে আর তা হালাল বানিয়ে নেয় (ইস্তিহলাল), তবে সে বড় কুফরী করল (এবং ইসলাম ত্যাগ করল)। পক্ষান্তরে, সে যদি নিছক লৌকিকতার জন্য বা অনুরূপ কোনো কারণে তা করে, তখন সেটা বড় কুফরের চেয়ে কম তথা ছোট কুফর বলে বিবেচিত হবে, যা তাকে ইসলাম থেকে বের করে দিবে না।” পূর্বোল্লিখিত পয়েন্টে ইবনু আব্বাস (রাদ্বিয়াল্লাহু ‘আনহুমা)-এর কথার সাথে এটি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
৪৩. আমরা বিশ্বাস করি এই মুসলিম উম্মাহ অসংখ্য দলে বিভক্ত হবে, ঠিক যেভাবে নবী (ﷺ) বলেছেন: “…আমার উম্মাহ ৭৩ দলে বিভক্ত হবে। একটি (দল) ব্যতীত তারা সকলেই জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” সাহাবায়ে কেরাম তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন: “সেটি কোন দল হে আল্লাহর রাসূল?” তিনি উত্তর দিলেন: “যারা সেই (দীনের) উপর থাকবে যার উপর আমি ও আমার সাহাবীগণ প্রতিষ্ঠিত আছি।” যেই দলটি রাসূল (ﷺ) ও তাঁর সাহাবাদের মানহাজকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরবে শুধু তাঁরাই নাজাত লাভ করবে আর তাঁরা শুধু একটি মাত্র দল হবে। তাঁদেরকে বলা হয়: আহলুস-সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ; আহলুল-হাদীস; সালাফী; আল-জামাআহ; আত-ত্বাইফাতুল-মানসূরাহ (সাহায্যপ্রাপ্ত দল); আল-ফির্কাতুন-নাজিয়াহ (মুক্তিপ্রাপ্ত দল); আস-সু’আদুল আ’যাম (প্রধানতম জামাআত); এবং তাঁরা হলেন আল-গুরাবা (আগন্তুক/অপরিচিত)। এই সমস্ত শিরোনাম বিশেষ একটি দলকেই নির্দেশ করে।
৪৪. আমরা বিশ্বাস করি, আহলুস সুন্নাহ বলে দাবিদার প্রত্যেকেই সত্যিকার অর্থে সুন্নাহর উপর প্রতিষ্ঠিত নয়- বরং নিজের ব্যাপারে যে যাই দাবি করুক না কেন, ব্যক্তি তার বাহ্যিক অবস্থার উপরই বিবেচিত হবে। এমন অনেক লোক আছে যারা সুন্নাহ’র দাবিদার, অথচ তারা প্রকাশ্যে সুন্নাহ’র মূলনীতিগুলোর বিরোধিতা করে বেড়ায়। সুতরাং, নিছক এই সমস্ত দাবির প্রতি ভ্রূক্ষেপ করা হয় না৷
৪৫. আমরা বিশ্বাস করি, আহলুস-সুন্নাহর পাপিষ্ঠরা আহলুল-বিদ‘আহর পরহেযগারদের চেয়ে উত্তম কারণ বিদআত পাপের চেয়েও নিকৃষ্ট। ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল (মৃ.২৪১ হি) বলেছেন: “আহলুস-সুন্নাহর কবীরা গুনাহকারীদের কবর হলো জান্নাতের বাগান আর আহলুল-বিদ’আহর পরহেযগারদের কবর হলো [জাহান্নামের] গর্ত। আহলুস-সুন্নাহর গুনাহগারেরা আল্লাহর বন্ধু আর আহলুল-বিদ‘আহর পরহেযগারেরা আল্লাহর শত্রু।” সুতরাং, বিদআতী আক্বীদাহ পোষণ করার কারণে, তাক্বওয়া ও পরহেযগারিতার বাহ্যিক অবয়ব তাদের কোনো উপকারে আসবে না।
৪৬. আমরা বিশ্বাস করি, ইমান (বিশ্বাস) হলো কথা ও কাজ: যা বাড়ে ও কমে। এর অর্থ: “ইমান হলো অন্তরের উক্তি যা অন্তরস্থ আক্বীদাহ ও দীনের বিভিন্ন জ্ঞানের স্বীকারোক্তিকে বুঝায়। ইমান হলো অন্তরের আমল যেমন ভালোবাসা, আশা ও ভয় করা। ইমান হলো মুখের উচ্চারণ যেমন শাহাদাতাইনের সাক্ষ্য প্রদান করা, কুরআন তিলাওয়াত করা, আল্লাহর প্রশংসা করা এবং যিকরের মাধ্যমে তাঁর মহিমা ঘোষণা করা। ইমান হলো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কর্ম যেমন নামায, রোজা, যাকাত, হাজ্জ, জিহাদ এবং পিতামাতার আনুগত্য করা। আহলুস-সুন্নাহ এতে বিশ্বাস করেন যে, আল্লাহর আনুগত্য করলে ইমান বাড়ে আর আল্লাহর নাফরমানি করলে ইমান কমে। ইমাম আল-বারবাহারী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, “যে ব্যক্তি বলে, ‘ইমান হলো কথা ও কাজ, তা বাড়ে ও কমে’, সে ইরজা নামক বিদআতের শুরু এবং শেষ থেকে মুক্তি পেয়েছে।”[35]
৪৭. ইমানের ফাহম (বুঝ) এবং এর সংজ্ঞার দিক দিয়ে মুর্জিয়া ও খাওয়ারিজ এই উভয় দলই পথভ্রষ্ট হয়েছে। মুর্জিয়ারা মনে করে, ইমান আমলকে অন্তর্ভুক্ত করে না এবং তা বাড়ে বা কমে না। খাওয়ারিজরা মনে করে, কবীরা গুনাহ করলে ও ফরজ কাজকে পরিত্যাগ করলে সেটা কারো ইমানকে শুধু কমিয়েই দেয় না, বরং, কবীরা গুনাহ ইমানকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেয়। এই উভয় দলই পথভ্রষ্ট।
৪৮. আমরা বিশ্বাস করি, বিশ্বের যে কোনো স্থানে বিক্ষোভ করা, রাস্তাঘাটে আন্দোলন ও রাজনৈতিক বৈঠক করা, ইসলামী শরীয়ত কর্তৃক অনুমোদিত দিক নির্দেশনার বিরোধী। সেগুলো সুন্নাহ থেকে [প্রমাণিত] নয় এবং এই উম্মাহকে সংশোধন করার অনুমোদিত কোনো মাধ্যম হিসেবেও প্রমাণিত নয়। বরং, সেগুলো সমাজকে নৈরাজ্য ও বিশৃঙ্খলার দিকে ঠেলে দেয়; আর ঐ সবই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে খুরূজ (বিদ্রোহ) হিসেবে বিবেচিত। সাহাবাদের থেকে এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না যা আন্দোলন, রাজনৈতিক বৈঠক ও বিক্ষোভকে অনুমোদন দেয় (যদিও তা শান্তিপূর্ণ হয়)।
৪৯. আমরা বিশ্বাস করি স্রষ্টার অবাধ্যতায় সৃষ্টির আনুগত্য হতে পারে না, যা নবী (ﷺ) থেকে বর্ণিত হয়েছে।
৫০. আমরা বিশ্বাস করি, শাসক যদি জনগণকে আল্লাহর নাফরমানি করার আদেশ দেয়, সেক্ষেত্রে শাসকের আনুগত্য করা যাবে না, যেভাবে পিতা তার সন্তানদেরকে আল্লাহর নাফরমানি করার আদেশ দিলে, তারা তা মানতে বাধ্য থাকে না। যাই হোক, সামগ্রিকভাবে শাসকের প্রতি (জনগণের) যে আনুগত্য ও কর্তব্য আছে তা অপসারণ করা যাবে না; ভালো কাজে তার আনুগত্য করা হবে আর অসৎ কাজের নির্দেশ দিলে তাকে অমান্য করা হবে। কিন্তু তার গুনাহের কারণে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা যাবে না।
৫১. আমরা বিশ্বাস করি, মুসলিম শাসক যদি কুফরী বা শিরকী কাজ করে, এরপরও তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা যাবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না সালাফী ‘উলামাগণ শরীয়তের নীতিমালার আলোকে তাকে কাফের বলে ঘোষণা দিবেন; এবং তাঁরা এটি বিবেচনা করবেন যে, তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে তার চেয়ে আরও উত্তম কাউকে প্রতিস্থাপন করার সক্ষমতা জনগণের আছে কি নেই- অতঃপর তাঁরা আরও দেখবেন যে, তার অপসারণ রক্তপাত বা হত্যাকাণ্ড ঘটাবে কি ঘটাবে না কেননা তখন তার হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার তুলনায় তার অপসারণ আরও বৃহত্তর ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। সুতরাং, যদি কাফের শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার পরিণতি হয় বৃহত্তর ক্ষতি, তবে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা নিষিদ্ধ। এই বিষয়টি শরীয়তের সুমহান নীতিমালা হিসেবে সুপরিচিত যা ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) সহ অন্যান্য (আলিম) ব্যাখ্যা করেছেন।
৫২. আমরা বিশ্বাস করি, কোনো মুসলিমকে হত্যা করা হারাম। তার জান, মাল ও মানসম্মান সুরক্ষিত। কেউ যদি এই অধিকারকে লঙ্ঘন করে তবে সে গুনাহগার হবে আর তাকে আল্লাহর তরফ থেকে কঠিন শাস্তির হুমকি দেওয়া হয়েছে।
৫৩. আমরা বিশ্বাস করি, অন্যায়ভাবে কোনো কাফেরকে হত্যা করা যাবে না যেমনিভাবে কোনো মুসলিমকে হত্যা করা যাবে না। মুসলিমদের ভূখণ্ডে অবস্থানরত কাফেররা মুসলিম সরকার কর্তৃক অঙ্গীকার ও চুক্তি দ্বারা সুরক্ষিত। নবী (ﷺ) বলেছেন: “যে ব্যক্তি চুক্তির অধীনে থাকা কোনো কাফেরকে হত্যা করবে সে জান্নাতের ঘ্রাণ পাবে না।”[36]
৫৪. আমরা বিশ্বাস করি, বর্তমান সময়ের সমস্ত অভ্যুত্থান নিকৃষ্ট খাওয়ারিজ ও শিয়াদের একটি উদ্ভাবন, যারা মুসলিম ভূখণ্ডে অরাজকতা সৃষ্টি করতে চায় এবং এর দ্বারা তারা কর্তৃত্ব লাভের আশা করে।
৫৫. আমরা বিশ্বাস করি, জঙ্গি কর্মকাণ্ডগুলো সম্পূর্ণরূপে ইসলামী শিক্ষার পরিপন্থি, তা মুসলিম ভূখণ্ডে সংঘটিত হোক বা কাফের ভূখণ্ডে। কুরআন, সুন্নাহ এবং সালাফ আস-সালেহ থেকে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না যা এই ধরনের নির্বোধ ও নির্মম সহিংসতাগুলোকে অনুমোদন দেয়।
৫৬. আমরা বিশ্বাস করি, আক্রমণাত্মক জিহাদ শুধু একজন মুসলিম শাসকের অধীনে সম্পাদন করতে হবে, যিনি তার দেশের ক্ষমতা ও শাসন ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করেন এবং এর সশস্ত্র বাহিনীকে আদেশ প্রদান করেন। জঙ্গি আস্তানা গঠন করা আর বিস্ফোরণ ঘটানো জিহাদের অন্তর্ভুক্ত নয়; তা মুসলিম সমাজে সংঘটিত হোক বা কাফের সমাজে। এই ধরনের লোকদের ইসলামে মুজাহিদীন হিসেবে গণ্য করা হয় না, বরং তারা কবীরা গুনাহকারী, খাওয়ারিজ ও শিয়াদের নিকৃষ্ট আক্বীদাহ ও বিদআতের উপর প্রতিষ্ঠিত।
৫৭. আমরা বিশ্বাস করি, শত্রুর আক্রমণ থেকে নিজের জীবন, পরিবার ও সম্পদকে রক্ষা করা একজন মুসলিমের জন্য জিহাদস্বরূপ আর এমন পরিস্থিতিতে, শাসকের অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। কারণ এই আগ্রাসনগুলো এমন ধরনের হয়, যা একজন ব্যক্তিকে কর্তৃপক্ষের কাছে বার্তা পৌঁছানোর সময় দেয় না। তবে, দেশের শাসক বা তার নিযুক্ত কেউ যদি তাকে লড়াই বন্ধ করার আদেশ দেয়, তবে তাকে অবশ্যই বিরত হতে হবে।
৫৮. আমরা বিশ্বাস করি, সংকটকালীন সময়ে যখন মুসলিমদের উপর বিপর্যয়গুলো আঘাত হানে আর জিহাদ নিয়ে প্রশ্ন উঠে, তখন মুসলিমদেরকে অবশ্যই কিবারুল উলামাদের (প্রবীণ, বিচক্ষণ ও নেতৃস্থানীয় সালাফী উলামাদের) কাছে প্রত্যাবর্তন করতে হবে আর তাদের কাছ থেকে এর সংশ্লিষ্ট সমাধান ও ফাতাওয়া জেনে নিতে হবে। এই ক্ষেত্রে অনভিজ্ঞ শাইখ বা ত্বলিবুল ইলমদের দ্বারস্থ হওয়া যাবে না। আর বিদআতীদের ফাতাওয়া তো গণনায় নেওয়া হয় না।
৫৯. আমরা বিশ্বাস করি, জঙ্গিদের দ্বারা পরিচালিত আত্মঘাতী হামলাগুলোর কোনো ভিত্তি [ইসলামী] শরীয়তে নেই। এমন কোনো প্রমাণ নেই যে, নবী (ﷺ) নিজেকে নিজে হত্যা করার মতো কাজকে অনুমোদন দিয়েছেন।
৬০. যে কোনো সংঘাতের সময়ে (নিরস্ত্র) বেসামরিক জনগণ এবং বিশেষ করে নারী ও শিশুদের প্রতি লক্ষ্য করে আক্রমণ চালানোকে আমরা হারাম বলে বিশ্বাস করি।
৬১. আমরা বিশ্বাস করি, খাওয়ারিজ বিদ্রোহীরা যদি পৃথিবীর বুকে বিপর্যয় সৃষ্টি করে, তখন তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে ও তাদেরকে পরাজিত করতে হবে, এবং তাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সহযোগিতা করতে হবে। নবী (ﷺ) তাদের সম্পর্কে বলেছেন, “আমি তাদেরকে [সেভাবে] হত্যা করতাম যেভাবে আদ সম্প্রদায়কে হত্যা করা হয়েছিল।”[37] এই প্রসঙ্গে ইবনু তাইমিয়্যাহ (রাহিমাহুল্লাহ) আহলুস-সুন্নাহর ইজমার উদ্ধৃতি দিয়েছেন যা বিদ্রোহী [খাওয়ারিজদের] বিরুদ্ধে লড়াই করার বৈধতাকে প্রমাণ করে।
৬২. আমরা বিশ্বাস করি, দীন ইসলামে আহলুল-কিতাব তথা ইহুদি ও খ্রিস্টানদের একটি বিশেষ স্থান রয়েছে কারণ নবী মুহাম্মাদকে (ﷺ) প্রেরণের পূর্বে তাদের প্রতি আসমানী কিতাব নাযিল করা হয়েছিল। মহান আল্লাহ, মুসলিমদেরকে তাদের জবাইকৃত গোশত খাওয়ার ও তাদের সতী নারীদেরকে বিয়ে করার অনুমতি দিয়েছেন। যাই হোক, এরপরও তারা কাফের বলে বিবেচিত কারণ তারা আল্লাহর প্রতি, তাঁর নাযিলকৃত কিতাবের প্রতি ও তাঁর প্রেরিত রাসূলদের প্রতি অবিশ্বাসী। সুতরাং, তাদেরকে ইসলামের দিকে আহ্বান করতে হবে, সেই একমাত্র রবের ইবাদতের দিকে [আহ্বান করতে হবে], যিনি সমস্ত নবীর রব, আর তিনিই হলেন আল্লাহ, সেই একমাত্র ইলাহ, বাকি সমস্ত [ইলাহদের ইবাদতকে] বাতিল সাব্যস্ত করে [তাদেরকে শুধু তাঁরই ইবাদতের দিকে আহ্বান করতে হবে], কেননা তিনিই হলেন সমস্ত ইবাদত পাওয়ার প্রকৃত হকদার।
৬৩. আমরা বিশ্বাস করি, কাফেরদের অধিকার লঙ্ঘন করা, বা তাদের উপর অবিচার করা হারাম, কারণ আল্লাহ সর্বাবস্থায় জুলুমকে হারাম করেছেন।
৬৪. আমরা বিশ্বাস করি, ঐ সমস্ত গুনাহগার মুসলিম যারা একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করত, তারা জাহান্নামের আগুনে শাস্তি পাওয়ার পর অবশেষে মুক্তি পাবে। আর কোনো মুওয়াহহিদ (আল্লাহর তাওহীদে বিশ্বাসী) মুসলিম চিরকাল জাহান্নামে থাকবে না, যদিও কিনা সে বহু কবীরা গুনাহ করেছে।
৬৫. আমরা বিশ্বাস করি, মানবজাতি কিয়ামতের দিন তাদের পালনকর্তার সম্মুখে দাঁড়াবে। তারা হবে নগ্নপদ, বস্ত্রহীন, খৎনাবিহীন ও সূর্যকে এক মাইল দূরত্বে নিয়ে আসা হবে। অতঃপর, রাসূল (ﷺ) সমগ্র সৃষ্টির পক্ষ থেকে তাঁর পালনকর্তার কাছে সুপারিশ করবেন যাতে বিচারকার্য শুরু করা হয়। এই সুপারিশ কেবল রাসূল মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর জন্য নির্দিষ্ট।
৬৬. আমরা বিশ্বাস করি, কেয়ামতের দিন দাঁড়িপাল্লা (মীযান) স্থাপন করা হবে ও তাতে ভালো ও মন্দ কাজগুলোকে ওজন করা হবে, ঠিক যেমনটি আল্লাহ বলেছেন: “সুতরাং যাদের পাল্লা ভারী হবে, তারাই সফলকাম হবে।”[38] এবং তিনি, সুবহানাহু ওয়া তা’আলা বলেছেন: “আর যাদের পাল্লা হালকা হবে তারাই নিজেদের ক্ষতি করেছে…”[39]
৬৭. আমরা সেই হাওযে কাওসারের উপর বিশ্বাস করি যা কেয়ামতের দিন নবী (ﷺ)-কে দেওয়া হবে। এর পানি দুধের চেয়েও সাদা ও মধুর চেয়েও মিষ্টি। এর পাত্রগুলোর সংখ্যা আকাশের তাঁরার চেয়েও বেশী হবে। যে (একবার) তা থেকে পান করবে সে আর কখনো তৃষ্ণার্ত হবে না। এটি শুধু মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর উম্মতের জন্য (বিশেষ একটি নেয়ামত), এবং প্রত্যেক নবীর নিজস্ব হাওয থাকবে। এই উম্মত যখন রাসূল (ﷺ)-এর হাওযের দিকে ধাবিত হবে তখন খাওয়ারিজ, শিয়া, জাহমিয়্যাহ, মু‘তাযিলা, সূফী ও আশআরীদের মত বিদআতীদেরকে দীনের মধ্যে বিদআত চালু করার কারণে পেছনে ঠেলে দেওয়া হবে।
৬৮. আমরা বিশ্বাস করি জাহান্নাম এবং জান্নাতকে ইতোমধ্যেই সৃষ্টি করা হয়েছে এবং [উভয়ই] অস্তিত্ববান, এবং এরা কখনই অস্তিত্বহীন হবে না। মু’তাযিলা সম্প্রদায় এই আক্বীদাহ’র বিরোধিতা করে।
৬৯. রাসূল মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর বংশধর থেকে আল-মাহদীর আবির্ভাব হওয়ার বিষয়টিকে আমরা বিশ্বাস করি। দাজ্জাল (মাসীহুদ-দাজ্জাল)-এর আবির্ভাব ও ঈসা ইবনু মারইয়াম (আলাইহিস সালাম)-এর আকাশ থেকে অবতরণের পূর্বে তিনি মুসলিমদের উপর শাসন করবেন।
৭০. মুসলিমদের কনস্ট্যান্টিনোপল জয়ের পর দাজ্জাল (মাসীহুদ-দাজ্জাল)-এর আবির্ভাব ঘটবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। সে হবে একজন মানুষ, একচোখা মিথ্যুক, যে মানুষকে তার ইবাদতের প্রতি আহ্বান জানাবে। তাকে [আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ] ক্ষমতা দেওয়া হবে যেটা দিয়ে সে মানুষকে ধোঁকা দিবে এবং তার আনুগত্য ও উপাসনার প্রতি আহ্বান জানাবে। সে হবে মানবজাতির জন্য এক মহাবিপর্যয় এবং চল্লিশ দিনের জন্য সে (পৃথিবীব্যাপী) সর্বনাশ ঘটাবে: যার প্রথম দিন হবে এক বছরের সমান, দ্বিতীয়টি হবে এক মাসের সমান, তৃতীয়টি হবে এক সপ্তাহের সমান ও বাকি সাঁইত্রিশ দিন থাকবে স্বাভাবিক। সে হবে কেয়ামতের একটি আলামত। আল্লাহর সমস্ত নবী তার বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন এবং নবী মুহাম্মদ (ﷺ) মুমিনদেরকে তার থেকে [আল্লাহ’র কাছে] আশ্রয় প্রার্থনা করতে বলেছেন এবং যখন সে আবির্ভূত হবে তখন তার নিকটে যাওয়া থেকে নিষেধ করেছেন।
৭১. আমরা ঈসা ইবনু মারইয়াম (‘আলাইহিস সালাম)-এর অবতরণে বিশ্বাস করি। দুই ফেরেশতার ডানায় হাত রেখে, দামেস্কের পূর্বে অবস্থিত একটি সাদা মিনারের উপর তিনি অবতরণ করবেন এমন সময়ে, যখন আল-মাহদী মুসলিমদেরকে নিয়ে সালাতে ইমামতি করছেন। তিনি দাজ্জালকে হত্যা করবেন এবং ন্যায় ও শান্তির সহিত পৃথিবী শাসন করবেন। যখন তিনি মৃত্যুবরণ করবেন, তখন মুসলিমরা তার জানাযার সালাত পড়বেন। ঈসা (‘আলাইহিস সালাম)-এর জীবদ্দশায় ইয়াজূজ ও মাজূজ আবির্ভূত হবে ও চরম বিপর্যয় ঘটাবে। ঈসা (‘আলাইহিস সালাম) এবং মুমিনগণ আল্লাহর কাছে দুআ করবেন এবং তিনি (আল্লাহ) তাদেরকে (ইয়াজূজ ও মাজূজকে) ধ্বংস করবেন ও পৃথিবীকে পবিত্র করবেন।
৭২. আমরা বিশ্বাস করি, ব্যক্তির জন্য তওবার দরজা ততক্ষণ খোলা থাকবে যতক্ষণ না তার দেহ থেকে তার রূহ অপসারিত হবে ও সূর্য পশ্চিম দিক থেকে উদিত হবে (কেননা তা কেয়ামতের বড় আলামত)।
৭৩. আমরা বিশ্বাস করি মুহাম্মাদ (ﷺ) হলেন সর্বশেষ রাসূল, যাঁর পর আর নতুন করে কোনো রাসূল আসবে না আর নতুন কোনো কিতাবও নাযিল হবে না। ঈসা ইবনু মারইয়াম (আলাইহিস সালাম) তাঁর প্রত্যাবর্তনের পর কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা বিচার করবেন।
৭৪. আমরা আল্লাহর নাম ও গুণাবলির সেই অপব্যাখ্যা ও বিকৃতিকে প্রত্যাখ্যান করি যা আশআরী ও মাতুরীদীরা করে থাকে এবং তারা নিজেদেরকে আহলুস সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত বলে মিথ্যা দাবি করে। বরং, তারা আহলুল-বিদ’আহ, পথভ্রষ্ট সম্প্রদায়গুলোর অন্তর্ভুক্ত। তারা জাহমিয়্যাহ সম্প্রদায়ের একটি উপদল যারা প্রত্যাখ্যান ও অপব্যাখ্যার মাধ্যমে আল্লাহর গুণাবলিকে নাকচ করে।
৭৫. বর্তমান সময়ে যে ফিরকাহগুলো আছে তাদের হিযবিয়্যাহ (দলাদলিকে) আমরা প্রত্যাখ্যান করি যা মুসলিমদের ভিতর আরও বিভাজন সৃষ্টি করেছে, কিতাব ও সুন্নাহর বিরুদ্ধাচরণ করে হলেও প্রতিটি ফিরকাহ নিজের প্রতি আনুগত্য কামনা করে। সুতরাং, আমরা জামাত আত-তাবলীগ (১৯২০-এর দশকে ভারতে প্রতিষ্ঠিত), আল-ইখওয়ান আল-মুসলিমূন (১৯২০-এর দশকে মিশরে প্রতিষ্ঠিত), হিযবুত-তাহরীর ও সাম্প্রতিক কালের বিভিন্ন ফিরকাহ থেকে সতর্ক করি। পথভ্রষ্টতার দিক দিয়ে এই সমস্ত ফিরকাহ ও পুরোনো ফিরকাহগুলো এক ও অভিন্ন। তারা আহলুল-বিদ’আহ ও তাদের সাথে অংশগ্রহণ করা বা দাওয়াহ ও তাবলীগের কাজে তাদের সহযোগিতা করা নিষিদ্ধ।
৭৬. আমরা ঐ গোঁড়ামিকে প্রত্যাখ্যান করি, যা প্রতারণামূলকভাবে তাক্বলীদ নামে নামকরণ করা হয়, যা চার সুপ্রসিদ্ধ মাযহাবের অন্ধ অনুসারীরা করে থাকেন। বিশিষ্ট ইমামগণ, আবূ হানীফাহ, মালিক, আশ-শাফিঈ এবং আহমাদ ইবনু হাম্বাল (رحمهم الله) সুন্নাহকে বর্জন করে তাদের মতামত বা মাযহাবকে প্রাধান্য দেওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেননি বা এর আদেশ দেননি। আর এই মাযহাবগুলো এমন অসংখ্য বিচ্যুতি আড়াল করার একটা মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয় যেসব [বিচ্যুতির] উপর মাযহাব প্রবর্তনকারী ইমামগণেরা (رحمهم الله) কখনই প্রতিষ্ঠিত ছিলেন না। এই মাযহাবগুলোর বহু অনুসারীরা কবর পূজায় লিপ্ত হয়, তারা কবরের বাসিন্দাদের কাছে সাহায্য চায় এবং তারা আশআরী ও মাতুরীদী আক্বীদাহর অনুসরণ করে। এ সবই হলো কিতাব, সুন্নাহ ও সালাফদের মাযহাবের বিরুদ্ধাচরণ।
৭৭. আমরা আহলুস সুন্নাহর আলিমদেরকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করার প্রতি আহ্বান জানাই। তাদেরকে ভালোবাসা আহলুস-সুন্নাহর একটি স্বতন্ত্র আলামত ও তাদেরকে ঘৃণা করা আহলুল-বিদ’আহর একটি স্বতন্ত্র আলামত। একজন সুন্নাহর আলিম যদি তার ইজতিহাদে ভুল করেন, তিনি একটি সওয়াব পাবেন, আর তিনি যদি সঠিক হন, তিনি দু’টি সওয়াব পাবেন।
৭৮. আমরা আহলুল-বিদ’আহর আলিমদের শ্রদ্ধা বা প্রশংসা করি না। বরং আমরা তাদের বিরুদ্ধে সতর্ক করি এবং তাদের ভালো কাজের কথা উল্লেখ করি না। তাদের প্রতি ইনসাফ করার নামে, তাদের বিদআতের সাথে তাদের ভালো (কাজের কথা) উল্লেখ করা হলো আরেক বিদআত যাকে আল-মাওয়াযানাত বলা হয়। নবী (ﷺ) বলেছেন: “আমি তোমাদের জন্য যা সবথেকে বেশি ভয় করি তা হলো আল-আইম্মাতুল মুদ্বিল্লীন (পথভ্রষ্টকারী আলিম ও শাসক গোষ্ঠী)।”[40] এবং তিনি (ﷺ) পথভ্রষ্ট ৭২টি দল সম্পর্কে বলেছেন, “তারা সকলেই জাহান্নামে।” আর তিনি (ﷺ) আহলুল-বিদ’আহর বিভিন্ন পথ সম্পর্কে বলেছেন, “প্রতিটি পথের মুখেই রয়েছে একটি শয়তান যে এর দিকে আহ্বান করে।” সুতরাং, তিনি (ﷺ) তাদের (আহলুল-বিদ’আহর) ভালো কাজের প্রশংসা করেননি এবং সেগুলোর উল্লেখও করেননি।
৭৯. আমরা বিশ্বাস করি, আহলুস-সুন্নাহর [সালাফিয়্যাহর] কোনো আলিম যদি ভুল করেন, তাহলে তার ভুল শুধরে দেওয়া হবে ও তার সম্মান রক্ষা করা হবে। তার ভুল যদি দীন ও আক্বীদাহর মৌলিক বিষয়ের বিরোধী হয়, তাহলে উলামারা তার ভুল সংশোধন করবেন ও তাকে সদুপদেশ দিবেন। কিন্তু তিনি যদি তার বিদআতের উপর অনড় থাকেন, তাহলে উলামারা তাকে তাবদী করবেন (বিদআতী বলে ঘোষণা দিবেন) ও তাকে তাহযীর (তার থেকে সতর্ক) করবেন।
৮০. আমরা বিশ্বাস করি যেমনটি ইমাম আল-বারবাহারী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন: “ভালো বা মন্দ আমলের ভিত্তিতে কারো পক্ষে (বা বিপক্ষে) সাক্ষ্য দিও না [যে সে জান্নাতী বা জাহান্নামী] কারণ তুমি জানো না মৃত্যুর পূর্বে তার শেষ আমল কী ছিল। সুতরাং, তার জন্য আল্লাহর রহমতের আশা রাখো এবং [তার গুনাহের কারণে] তার জন্য ভয় করো। তুমি জানো না মৃত্যুর সময় আল্লাহর প্রতি অনুশোচনার অনুভূতি থেকে (অবশেষে) তার জন্য কী নির্ধারিত হয়েছে, এবং সে যদি ইসলামের উপর মৃত্যুবরণ করে থাকে, সেই ক্ষেত্রে আল্লাহ তার জন্য কী নির্ধারণ করেছেন। সুতরাং, তার জন্য আল্লাহর রহমতের আশা রাখো আর তার গুনাহের কারণে তার জন্য ভয় করো। আর এমন কোনো গুনাহ নেই যার জন্য বান্দার তাওবার পথ খোলা নেই।”
৮১. আমরা বিশ্বাস করি, আল্লাহর সৎকর্মশীল আউলিয়াদের মধ্যে কেউই ইবাদত পাওয়ার অধিকার রাখেন না। কেউ মৃত ব্যক্তির কাছে কিছু চাইতে পারে না, কারণ তারা নিজেরাই জীবিতদের দু‘আর মুখাপেক্ষী এবং আল্লাহর রহমতের উপর নির্ভরশীল।
৮২. কেউ যদি মৃত আউলিয়াদের কাছে সাহায্য, সুপারিশ, সহযোগিতা, বিপদ থেকে উদ্ধার, রিযিক বৃদ্ধি, ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা ইত্যাদি চায় তাহলে সে শিরক করেছে।
৮৩. একজন জীবিত, সৎকর্মশীল মুমিনকে অনুরোধ করা যেতে পারে যেন তিনি কোনো অভাবী ব্যক্তির জন্য আল্লাহর কাছে দুআ করেন। তা বৈধ ও শরীয়ত সম্মত; কেননা সাহাবায়ে কেরাম রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-কে তাঁর জীবদ্দশায় তাঁদের জন্য দু‘আ করতে বলতেন, কিন্তু তাঁর মৃত্যুর পর তাঁরা কখনও তাঁকে দু‘আ করতে বলেননি।
৮৪. আমরা বিশ্বাস করি, রাসূল (ﷺ)-এর স্ত্রীগণ হলেন উম্মাহাতুল মু’মিনীন [মু‘মিনদের মাতাগণ।] তাঁরা পবিত্র, আল্লাহভীরু আর তাঁদেরকে নিজ মা হিসেবে ভালোবাসা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য বাধ্যতামূলক।
৮৫. রাসূলুল্লাহ (ﷺ)-এর ইন্তেকালের পর সাহাবায়ে কেরামের মাঝে যে সকল ফিতনা সংঘটিত হয়েছিল সে সম্পর্কে আমরা নীরবতা অবলম্বন করি কারণ তাঁরা ছিলেন মুজতাহিদূন (সত্য সন্ধানী, সচেষ্ট, বিজ্ঞ দীনের আলিম)। তাঁদের মধ্যে যিনি সঠিক ছিলেন তাঁকে দুটি সওয়াব দেওয়া হবে এবং যিনি সঠিক ছিলেন না তাঁকে একটি সওয়াব দেওয়া হবে। আর ইতঃপূর্বেই আল্লাহ বলেছেন: “আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট আর তাঁরা তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট।”[41]
৮৬. সাহাবায়ে কেরামকে বিদআতী বা গুনাহগার বলে অভিহিত করা বৈধ নয়। যে ব্যক্তি এমন কাজ করল তবে সে আল্লাহর রাসূল (ﷺ)-এর এই উক্তির বিরোধিতা করল: “যখন আমার সাহাবীদের ব্যাপারে কিছু বলা হয়, চুপ থাকো।” যারা সাহাবায়ে কেরামের প্রতি কোনো ত্রুটি আরোপ করে তারা পথভ্রষ্ট ও আহলুল-বিদ’আহর অন্তর্ভুক্ত।
৮৭. আমরা বিশ্বাস করি, নাম ধরে বিদআতীদের ব্যাপারে সতর্ক করার অনুমতি রয়েছে, এবং একে দোষারোপযোগ্য গীবত হিসেবে গণ্য করা হয় না বলে আহলুস-সুন্নাহ ও আহলুল-হাদীসদের ইজমা (ঐকমত্য) রয়েছে। আমরা দেখতে পাই যে, এই উম্মাহর সালাফী উলামাদের লিখিত কিতাবের মধ্যে পথভ্রষ্ট সম্প্রদায়, দুর্বল বর্ণনাকারী ও হাদীস জালকারীদের বিরুদ্ধে প্রচুর তিরস্কার বিদ্যমান।
৮৮. আমরা বিশ্বাস করি যে, অত্যাচারী শাসককে গালি দেওয়া ও তাকে তিরস্কার করা হারাম, কিন্তু বিদআত ও পথভ্রষ্টতার দিকে আহ্বানকারীদেরকে তিরস্কার করা ও তাদের ব্যাপারে সতর্ক করা অনুমোদিত। যায়িদাহ ইবনু ক্বুদামাহ বলেন, আমি মানসূর ইবনু মু’তামিরকে জিজ্ঞেস করলাম, “আমি কি রোজা থাকা অবস্থায় শাসকের নিন্দা করতে পারবো? তিনি উত্তর দিলেন, “না।” আমি তখন জিজ্ঞেস করলাম, “আমি কি তাহলে প্রবৃত্তির অনুসারী ও বিদআতীদের নিন্দা করতে পারবো?” তিনি উত্তর দিলেন, “হ্যাঁ।”
৮৯. আমরা বিশ্বাস করি তাসফিয়্যাহ (শুদ্ধীকরণ) ও তারবিয়্যাহ (শিক্ষাদান)-এর দ্বারা এই উম্মাহ সংশোধিত হবে। তাসফিয়্যাহ ঐ সমস্ত বানোয়াট ও বিজাতীয় আক্বীদাহ ও আমল থেকে যা বহু শতাব্দী ধরে দীনের ভিতর অনুপ্রবেশ করেছে। আর পরবর্তী প্রজন্মের তারবিয়্যাহ ঐ আক্বীদাহ, মানহাজ ও দীনি অনুশীলন দিয়ে যা হবে কুরআন, সহীহ সুন্নাহ ও প্রাথমিক যুগের সালাফদের ফাহম (উপলব্ধি/বুঝ)-এর ভিত্তিতে। কেননা এই ভিত্তি ব্যতীত উম্মাহর সংশোধন সম্ভব নয়, যেমন ইমাম মালিক ইবনু আনাস রাহিমাহুল্লাহ (মৃ.১৭৯ হি) বলেছেন: “এই উম্মাহর পরবর্তী অংশ কখনই সংশোধিত হবে না ঐ বিষয়কে বাদ দিয়ে যে বিষয়টি দ্বারা এর পূর্ববর্তী অংশ সংশোধিত হয়েছিল।”
এবং সকল প্রশংসা বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর। অতঃপর, আল্লাহর পক্ষ হতে শান্তি, রহমত ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের রাসূল মুহাম্মাদ (ﷺ)-এর উপর, তাঁর পরিবারবর্গ, তাঁর সাহাবা ও তাঁর প্রকৃত অনুসারীদের উপর।
লেখক: আবূ খাদীজাহ ‘আব্দুল-ওয়াহিদ
- সূরাহ আন-নাহল ১৬:৩৬
- সহীহ আল-বুখারী
- সূরাহ আন-নাজ্ম ৫৩:৩-৪
- সহীহ বুখারী
- সুনান ইবনি মাজাহ
- সহীহুল জামি’
- সুনান আবি দা’উদ
- সূরাহ আল ‘ইমরান ৩:১০৩
- সূরাহ আল ‘ইমরান ৩:১০৫
- সূরাহ আন-নিসা ৪:৫৯
- জামি’ আত-তিরমিযী
- সূরাহ আল-মা’ইদাহ
- সূরাহ আশ-শূরাহ
- সুনান আন-নাসায়ী
- সহীহ আল-বুখারী
- সূরাহ আশ-শূরাহ ৪২:১১
- সূরাহ আল-আ’রাফ ৭:১৮০
- সূরাহ মারইয়াম ১৯:৭১
- সহীহ আল-বুখারী
- সূরাহ ত্ব-হা ২০:৫
- সূরাহ মারইয়াম ১৭:৮৭
- সুনান আবি দা’উদ
- জামি’ আত-তিরমিযী
- সূরাহ ইঊনুস ১০:১০৬-১০৭
- সূরাহ আল-আহক্বাফ ৪৬:৫
- সূরাহ গাফির ৪০:৬০
- সুনান আবী দাঊদ
- সূরাহ আন-নাহল ১৬:১২৫
- সহীহ মুসলিম
- সহীহ আল-বুখারী
- মুসনাদ আহ্মাদ ১৫৩৬৯, ইবনু আবী আসিম ১০৯৮
- সুনান ইবনি মাজাহ
- সূরাহ আন-নিসা ৪:৪৮
- সূরাহ মা’ইদাহ ৫:৪৪
- শারহুস-সুন্নাহ
- সহীহ আল-বুখারী
- সহীহ আল-বুখারী
- সূরাহ আল-আ’রাফ ৭:৮
- সূরাহ আল-মুমিনুন ২৩:১০৩
- সুনান আবি দা’উদ
- সূরাহ আত-তাওবাহ ৯:১০০
Share this:
- Share on X (Opens in new window) X
- Share on Facebook (Opens in new window) Facebook
- Email a link to a friend (Opens in new window) Email
- Share on Pinterest (Opens in new window) Pinterest
- Share on Telegram (Opens in new window) Telegram
- Share on WhatsApp (Opens in new window) WhatsApp
- Print (Opens in new window) Print
- Share on LinkedIn (Opens in new window) LinkedIn
- Share on Tumblr (Opens in new window) Tumblr
- Share on Pocket (Opens in new window) Pocket

















